সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮
news-image

মহান রাব্বুল আলামিন যুগে যুগে মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে পরিচালিত করার জন্য মহাপুরুষ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যাদের কাজ ছিল পবিত্র কুরআনুল কারিমের শিক্ষা ও সর্বকালের সর্বসেরা মানব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ সবার কাছে পৌঁছে দেয়া। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সীমাহীন দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু তার পরও তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হননি। তারা জানতেন, মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন। আর যারা ধৈর্যশীল, তাদের মহান আল্লাহ সম্মানিত করে থাকেন।

পৃথিবীতে এমন কিছু মহাপুরুষ জন্ম নিয়েছিলেন, যারা মানুষকে আলোর পথে নিয়ে গেছেন। যেমনÑ ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহি.), ইমাম আবু হানিফা (রাহি.), ইমাম মালিক (রাহি.), ইমাম শাফি (রাহি.)সহ অগণিত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ। পৃথিবীতে এই চার মহাপুরুষের ফিকহী সিদ্ধান্তসমূহ নিয়ে চারটি মাযহাব তৈরি হয়েছে। মূলত কুরআনুল কারিম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখোনো পরিপূর্ণ জীবন দর্শন বিশ্লেষণের ধারাকেই বলা হচ্ছে মাযহাব। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহি.)-এর মাযহাব অনুসরণ করা হয়। যে কারণে আরব অঞ্চলের বাসিন্দারা হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহি.) ১৬৪ হিজরি মোতাবেক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি আইন, হাদীস ও অভিধানশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি কিছু দিনের জন্য ইমাম আবু হানিফা (রাহি.)-এর প্রধান ছাত্র ও সে সময়ের প্রধান বিচারপতি ইমাম আবু ইউসুফের শিক্ষালয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। বাগদাদে তিনি ছিলেন ইমাম শাফেয়ী (রাহি.)-এর বিশ্বস্ত ছাত্র। এরপর তিনি হাদীস শাস্ত্রের দিকে মনোযোগ দেন।

বিশুদ্ধ হাদীসের সন্ধানে তিনি ছিলেন পাগলপারা। হাদীস সংগ্রহের লক্ষ্যে তিনি কুফা, বসরা, মক্কা, মদীনা, মরক্কো, সিরিয়া, ইয়েমেন, আলজেরিয়া ও ইরানে ভ্রমণ করেন। এসব স্থান থেকে তিনি প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেন। সুফিয়ান ইবনু ইয়াইনা, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ কাত্তান ও ওয়াকি ইবনুল জাররাহ প্রমুখ বিখ্যাত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সহীহ হাদীস পাঠ করেন।

ইমাম আহমাদের কাছ থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনু ইদরিস শাফেয়ী, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম ও ইমাম আবু দাউদের নাম উল্লেখযোগ্য। সে সময়ের শাসকেরা তার ওপর সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছিলেন। একই ঘটনা সব ইমামের জীবনী পাঠ করলে দেখতে পাওয়া যায়। কারণ যারাই মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন, তাদেরই মানবসৃষ্ট সমাজ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। তিনি ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে একজন সাধক। জ্ঞান আহরণ ছাড়া অন্য কিছু তিনি ভাবতেই পারতেন না।

এই মহাপুরুষকে নিয়ে ইমাম আবু দাউদ সিজিস্তানী (রাহি.) বলেন— ‘আমি দুই শতাধিক বিজ্ঞ মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, তবে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহি.)-এর মতো আর কাউকে দেখিনি। তিনি সেসব আলোচনায় যোগ দিতেন না, যেখানে জ্ঞানচর্চার কোনো আলোচনা না হয়। তিনি তৎকালীন শাসকদের সব ধরনের উপহার-উপঢৌকন সবসময় প্রত্যাখ্যান করতেন। কায়িক পরিশ্রম দ্বারা যে অর্থ উপার্জন হতো এবং লেখালেখি করে যেটুকু অর্থ তিনি পেতেন, তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি উপহার নেয়ার চাইতে দেয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। সকাল-সন্ধ্যায় পরম করুণাময়ের দরবারে সিজদা করাকে জীবনের সবচেয়ে বড় বিষয় মনে করতেন।

তিনি একাধিক পুস্তক রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে— আল-মুসনাদ, আর-রাদ্দু আলাজ-জানদিকাহ, কিতাবুজ জুহ্‌দ। এর মধ্যে ‘আল-মুসনাদ’ হাদীস শাস্ত্রের বিশ্বকোষ হিসাবে স্বীকৃত। এ বিশ্বকোষটিতে তিনি প্রায় ২৯ হাজার হাদিস সঙ্কলন করেছেন।

ইমাম আহমাদ ছিলেন একজন সুবক্তা। হাদীস শাস্ত্রের সাথে সাথে তিনি আইনের জটিল বিষয়ের ওপর নিয়মিত নানা প্রশ্নের জবাব দিতেন। তিনি ছিলেন চলমান জ্ঞানসাগর। তিনি সবসময় রাসূলের মাহন সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি বাক্য—  ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা, আর কাফিরের জন্য জান্নাতস্বরূপ’— আওড়াতেন।

২৪১ হিজরি মোতাবেক ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে চলে যান। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে এই মহাপুরুষের কবর রয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে এই মহাপুরুষকে পরিচিত করার জন্য সবচেয়ে বেশি যিনি অবদান রেখেছেন, তিনি হলেন আরেক মহাপুরুষ ইমাম তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ।

সৈয়দ রশিদ আলম
প্রবন্ধকার