সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

রয়টার্সের প্রতিবেদনে মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞের বিবরণ

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮
news-image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইনে গত বছরের ২রা সেপ্টেম্বর দেশটির সৈন্যরা ও স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী গ্রামবাসী মিলে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। এই ঘটনার তথ্য, সাক্ষ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময়ই রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে আটক করে মিয়ানমার পুলিশ।

অবশেষে রয়টার্স পুরো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। হত্যা করার আগে ওই ১০ দুর্ভাগা রোহিঙ্গার হাত বেঁধে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়। তাদের চোখের সামনেই তৈরি করা হয় গর্ত। হত্যার পর তাদের সবাইকে ওই গর্তে ফেলা হয়।

অন্তত দুই জনকে জবাই করে গ্রামবাসীরা। বাকিদের গুলি করে সেনাবাহিনী। গর্ত খুঁড়েছে এমন দুই জন এ তথ্য জানিয়েছেন।

লাশ পুঁতে ফেলার গর্ত খুঁড়েছে যারা, তারা এসবের কথা স্বীকারও করেছেন। সো চায় (৫৫) নামে এমন একজন ব্যক্তি স্থানীয় ইন দিন গ্রামের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। তিনি জানান, তিনি কবর খুঁড়তে সহায়তা করেন। পাশাপাশি, হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষও করেছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে দুই তিনবার করে গুলি করেছে সৈন্যরা। যখন তাদের গর্তে মাটিচাপা দেয়া হচ্ছিল, দুয়েকজনের গলা থেকে গোঙানির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। বাকিরা ততক্ষণে মারা গেছেন।

রাখাইনে এই দফায় সেনা অভিযানে কমপক্ষে সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে এসেছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা তাদের ওপর চালানো বীভৎস নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহারে মানুষ মেরেছে। ধর্ষণ করেছে। পুড়িয়ে দিয়েছে বাড়িঘর। জাতিসংঘ বলেছে, সেনাবাহিনী হয়তো গণহত্যা (জেনোসাইড) সংঘটন করেছে। তবে মিয়ানমার বলছে, তাদের ‘পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদেরকে টার্গেট করে চালানো হয়েছে।

যেই ১০ জন রোহিঙ্গাকে উপকূলীয় গ্রাম ইন দিনে হত্যা করা হয়েছে, তার আগের ঘটনাও জানতে পেরেছে রয়টার্স। হত্যার সময় ও পরের ধারণকৃত ভয়াল সব ছবি হাতে এসেছে বার্তা সংস্থাটির। এমনকি জানা গেছে হত্যার শিকার ১০ জনের পরিচয়ও।

এতদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কথা শুধুমাত্র ভুক্তভোগীদের বয়ানে শুনেছে বিশ্ব। মিয়ানমার সরকার রাখাইনে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি থাকায় নিরপেক্ষ কোনো সূত্রের কাছ থেকে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু রয়টার্সের এই প্রতিবেদন তার অবসান ঘটালো। এই প্রতিবেদনে, স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও স্বীকার করে নিয়েছে যে, তারা রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের হত্যা করে মাটিচাপা দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়। খোদ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও বলেছেন, সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা এসব নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত। আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরাও ইন দিন থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তারা নিশ্চিত করে বলেছেন, সামরিক বাহিনী এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিল।

নিহত রোহিঙ্গাদের পরিবার এখন বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বাস করে। তাদেরকে হত্যা করার আগে নিহতদের ছবি দেখানোর পর তারা নিজ স্বজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এদের কেউ কেউ জানতেন, তাদের স্বজন নিখোঁজ। রয়টার্সের কাছ থেকেই স্বজনদের মারা যাওয়ার কথা জানতে পারেন তারা। নিহত রোহিঙ্গাদের কেউ ছিলেন জেলে, আর কেউ দোকানদার। দুইজন ছিলেন শিক্ষার্থী। একজন ধর্মীয় শিক্ষক।

ইন দিন গ্রামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক মুরব্বি রয়টার্সকে ওই হত্যাযজ্ঞের ছবি তিনটি সরবরাহ করেন। একটিতে দেখা যায়, ১লা সেপ্টেম্বর ওই ১০ জনকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরেরদিন সকাল ১০টার দিকে তাদের সারিবদ্ধ করার ছবি হলো দ্বিতীয়টি। তৃতীয় অর্থাৎ শেষটি হলো রক্তাক্ত মৃতদেহ গর্তে ফেলে রাখার ছবি।

ইন দিন হত্যাযজ্ঞের তদন্ত করার সময়ই রয়টার্সের দুই সাংবাদিক আটক হন। অবৈধভাবে গোপনীয় নথিপত্র হস্তগতের অভিযোগ আনা হয় দুই মিয়ানমার নাগরিককে।

রয়টার্সের তদন্তের কথা জানতে পেরে, ১০ই জানুয়ারি মিয়ানমার সরকার নিজেই ওই হত্যাযজ্ঞের কথা আংশিক স্বীকার করে। স্বীকার করে যে, ১০ জনকে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, তলোয়ার হাতে কিছু লোক দুই জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। বাকিদের গুলি করা হয়। বিবৃতিতে হত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, নিয়মবহির্ভূত আচরণ করায় জড়িত সেনাসদস্য ও গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে। একই দিন রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগ আদালতে সত্য প্রমাণিত হলে তারা সর্বোচ্চ ১৪ বছরের দণ্ড পেতে পারেন।

তবে সামরিক বাহিনীর বিবৃতির অনেক কিছু যে সত্য নয়, তা-ও বলা হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০ ‘সন্ত্রাসী’র একটি গ্রুপ আক্রমণ করায় সেনাবাহিনী ওই ১০ জনকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, তীব্র লড়াই চলার কারণে ওই ১০ রোহিঙ্গাকে পুলিশের হেফাজতে তুলে দেয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু খোদ বৌদ্ধ গ্রামবাসীরাই জানায়, ওইদিন বা আগে পরে এ ধরনের কোনো আক্রমণ বা লড়াই হয়নি। আর রোহিঙ্গারা বলছেন, পার্শ্ববর্তী একটি সৈকতে আশ্রয় নেয়া শ’ শ’ রোহিঙ্গা (যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল) থেকে এই ১০ জনকে হত্যার উদ্দেশ্যে বাছাই করা হয়।

রাখাইনের বৌদ্ধ গ্রামবাসী, সেনাসদস্য, আধাসামরিক পুলিশ, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ শেষে আরো ভয়াল পরিস্থিতির বিবরণ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ওই দিন সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক পুলিশ বাহিনী ইন দিন গ্রামের বৌদ্ধ বাসিন্দাদের একত্রিত করেন। এরপর তারা কমপক্ষে দুইটি রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে ফেলে। এই কথা বলেছেন এক ডজনেরও বেশি বৌদ্ধ গ্রামবাসী। স্থানীয় এক ক্লিনিকে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কর্মরত অং ম্যাত তুন (২০) বলেছেন, তিনিও রোহিঙ্গা বাড়িঘর পোড়ানোয় অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, তাদের বাড়িঘর পোড়ানো খুব সহজ ছিল। কারণ, ঘরের চাল ছিল খড়ের। ফলে চালে আগুন ছুড়ে দিলেই পুরো ঘর মুহূর্তেই জ্বলে যেত।

তিনি আরো বলেন, স্থানীয় বয়োবৃদ্ধরা ভিক্ষুদের পোশাক ও কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন। আমরা ফোন নিতে পারিনি। পুলিশ বলেছে, কেউ ছবি তোলার চেষ্টা করলে তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।

১১ জন গ্রামবাসী স্বীকার করেছেন, স্থানীয় বৌদ্ধরা হত্যা সহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন। অথচ, সরকার রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পোড়ানোর জন্য তাদেরকেই দায়ী করেছে।

আধাসামরিক পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য রোহিঙ্গাদের অনেক সম্পদ লুট করেন। গরু ও মোটরসাইকেল লুট করে বিক্রি করে দেয়া হয়। এই কথা জানিয়েছেন, স্থানীয় গ্রাম প্রশাসক মং থেইন চায় ও আধাসামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা।

ইন দিন গ্রামের ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিল সেনাবাহিনীর ৩৩ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন। সহায়তায় ছিল অষ্টম সিকিউরিটি পুলিশ ব্যাটালিয়ন। এই ব্যাটালিয়নের চার পুলিশ কর্মকর্তা এই কথা স্বীকার করেছেন।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিভিন্ন মামলায় লড়েছেন মার্কিন আইনজীবী মাইকেল জি কার্নাভাস। তিনি বলেন, যেসব প্রমাণ ও দলিলাদি পাওয়া গেছে, তাতে গণহত্যা সংঘটনের উদ্দেশ্য প্রমাণ করা সম্ভব। এ ছাড়া হেফাজতে থাকা অবস্থায় বন্দিকে হত্যা করায়, সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তি পাওয়া গেল। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক কেভিন জন হেলের। তিনি সাবেক বসনিয়ান সার্ব নেতা রাদোভান কারাজিক সহ মানবতাবিরোধী অভিযোগে অভিযুক্ত অপরাধীদের আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন। তিনি এসব তথ্য প্রমাণ দেখে বলেন, ‘একটি গ্রামকে নির্মূল করতে সামরিক বাহিনীর একটি আদেশই ছিল একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।’

এসব অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় বৌদ্ধ গ্রামের বয়োবৃদ্ধরা। এদের একজন বলেন, তারা এই স্বীকারোক্তি ও প্রমাণ সাংবাদিকদের দিয়েছেন, কারণ তারা চান না এই ধরনের ঘটনা আর ঘটুক। নিজের কাছে স্বচ্ছ থাকতেই তারা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, কীভাবে সেনাবাহিনী স্থানীয়দের সহায়তায় রোহিঙ্গাদের গ্রাম পোড়ানোয় নেতৃত্ব দিয়েছে। কীভাবে তাদের হত্যা করেছে। লুট করেছে।

এ প্রতিবেদন নিয়ে সেনাবাহিনী কোনো মন্তব্য করেনি। স্থানীয় এক পুলিশ কমান্ডার বলেছেন, এসব সম্ভব নয়। সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, তারা অস্বীকার করছেন না যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে তারা তদন্ত করবেন। যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। তবে তিনি এরপরও সেনা অভিযানের পক্ষাবলম্বন করেন।

এ জাতীয় আরও খবর