সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮
news-image

জুমু‘আর খুতবা, মসজিদে নববী, মদীনা মুনাওয়ারা
খুতবার তারিখ: ১৮ রবিউস সানী ১৪৩৯ হিজরী; ৫ জানুয়ারি ২০১৮ ঈসায়ী

সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি। তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। তাঁর কাছেই ক্ষমা চাই। তাঁর ওপরই ভরসা করি।

হে আল্লাহর বান্দাহগণ! আল্লাহকে যথাযথ ভয় করুন। ইসলামকে মজবুত অবলম্বন হিসাবে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন।

হে মুসলিমগণ! তাওহীদ বান্দাদের ওপর আল্লাহর অধিকার। তাওহীদ দিয়ে তিনি নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন।

তাওহীদ হলো আল্লাহকে ইবাদাতে একক মর্যাদা দেয়া। ইবাদাত শুধু তাঁর জন্য করা। ইবাদাত একটি ব্যাপক শব্দ। প্রকাশ্য ও গোপনীয় এমনসব কথা ও কাজ হলো ইবাদাত যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন।

অন্তরেরও ইবাদাত রয়েছে। আর অন্তরের ইবাদাত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে সম্পন্ন ইবাদাতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইবাদাতের পূর্বশর্ত হলোÑ হৃদয়ে ঈমানের প্রবেশ। একজন ব্যক্তির দীনের মূল কেন্দ্র হলো তার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত ঈমান। ঈমান হলো মূল ভিত্তি, প্রকাশ্য আমল হলো ঈমানের পূর্ণতাদানকারী।

অন্তরের আমল তথা ঈমান ও বিশ্বাস ছাড়া আনুষ্ঠানিক আমল গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তাই ঈমান হলো আমলের প্রাণ। ঈমান ছাড়া প্রকাশ্য আমল প্রাণহীন দেহের মতো।

দৈহিক সুস্থতা নির্ভর করে হৃদয়ের সুস্থতার ওপর। এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘দেহের অভ্যন্তরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, যদি সেটি সুস্থ থাকে তাহলে দেহ সুস্থ থাকবে। যদি সেটি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে দেহ অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর সেটি হলো কালব তথা অন্তর।

মানুষের মর্যাদার পার্থক্য ও কর্মের পার্থক্য নির্ভর করে তার অন্তরে ধারণা করা বিষয়ের ওপর। আল্লাহ মানুষের অন্তরের দিকে তাকান।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকার-আকৃতির দিকে তাকান না। বরং তিনি তাকান তোমাদের হৃদয় ও আমলের দিকে।’ (সহীহ মুসলিম)

অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট আমল বা কর্মের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা। এটি তাওহীদের একটি দাবী।

আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা হলো— তাঁর নাম ও গুণাবলীর সাথে উপযোগী ধারণা ও বিশ্বাস। তাঁর রহমত-করুণা, ক্ষমা, দান-অনুগ্রহ, ক্ষমতা, জ্ঞানের প্রশস্ততা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন। এ জ্ঞান অর্জিত হলে বান্দা তার রবের ব্যাপারে অবশ্যই ভাল ধারণা পোষণ করবে।

যার অন্তরে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সে আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করবে। আল্লাহর পরিপূর্ণতা, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, বান্দার ওপর তাঁর অফুরন্ত অনুগ্রহ— তাঁর ব্যাপারে উত্তম ধারণা সৃষ্টিতে সহায়ক।

ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহি.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করো।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পূর্বে এ বিষয়ে অতি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করা ব্যতিত মৃত্যুবরণ করো না।’— এ কথাটি তিনি তার মৃত্যুর তিন দিন আগে বলেছেন। (সহীহ মুসলিম)

আল্লাহ তাঁর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণকারীদের প্রশংসা করেছেন। তিনি তাদের জন্য ইবাদাত সহজের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। সালাত একটি কঠিন কাজ, তবে বিনয়ীদের জন্য কঠিন নয়; যারা এ ধারণা পোষণ করে যে, তারা তাদের রবের সাথে সাক্ষাত করবে এবং তারা তাঁর দিকেই ফিরে যাবে।’

আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণের কারণেই নবী-রাসূলগণ উঁচু মর্যাদা অর্জন করেছেন। আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা নিয়ে তাদের সকল বিষয় তাঁর প্রতিই ন্যাস্ত করেছেন।

ইবরাহীম (আ.) স্ত্রী হাজেরাহ ও পুত্র ইসমাঈলকে মক্কায় রেখে গেলেন। তখন মক্কায় না ছিল লোকজন আর না ছিল পানি। ইবরাহীম (আ.) চলে যাওয়ার সময় হাজেরা আলাইহাস সালাম বললেন, ‘হে ইবরাহীম! তুমি আমাদেরকে রেখে যাচ্ছ কোথায়? এখানে কোনো মানুষ-জন নেই। জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নেই।’ তিনি এ কথাটি বারবার বললেন। ইবরাহীম (আ.) জবাব দিলেন না, এমনকি তাঁর দিকে ফিরেও তাকাননি। এবার হাজেরা আলাইহাস সালাম বললেন, ‘আল্লাহই কি তোমাকে এ আদেশ করেছেন?’ তিনি বললেন, হ্যাঁ। এবার হাজেরা (আ.) বললেন, ‘যদি তাই হয়, তাহলে তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।’ (সহীহুল বুখারী)

আল্লাহর প্রতি তার এ উত্তম ধারণার পরিণামেই সেখানে পুনঃনির্মিত হলো আল্লাহর ঘর। গড়ে উঠলো একটি জনপদ। তাঁর স্মরণ স্থায়ী হয়ে গেলে মানুষের মাঝে। তার সন্তান ইসমাঈল হলেন নবী আর তাঁর বংশেই আসলেন সর্বশেষ নবী এবং রাসূলগণের নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

ইয়াকূব (আ.) দুই ছেলেকে হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করে বিষয়টি আল্লাহর দায়িত্বে ন্যাস্ত করে বলেছিলেন, ‘আমি আমার অভিযোগ ও দুশ্চিন্তাকে আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিলাম।’ আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণায় অন্তরকে পূর্ণ করে দিয়ে বললেন, ‘আর আল্লাহই সবচেয়ে উত্তম রক্ষাকারী।’

তিনি আরো বললেন, ‘আমি আশা করি আল্লাহ তাদেরকে একসাথে আমার কাছে নিয়ে আসবেন।’ তিনি তার ছেলেদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হে আমার ছেলেরা! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে খোঁজ করো, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। তাঁর অনুগ্রহ থেকে তো নিরাশ হয় কেবল কাফিররা।’

বনু ইসরাঈল এমন কষ্ট ও সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল যে, তারা তা আর সইতে পারছিল না। মূসা (আ.) আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করে তার জাতিকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে চাও, এবং ধৈর্যধারণ করো। এ জমিন আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান, এর কর্তৃত্ব দেন। আর চূড়ান্ত পরিণাম ও পরিণতি মুত্তাকীদের জন্য।’ তারা বললো, আমরা তোমার আসার আগেও দুঃখ-কষ্টের শিকার ছিলাম, তুমি আসার পরও। তিনি বললেন, ‘শীঘ্রই তোমাদের রব তোমাদের দুশমনদের ধ্বংস করে দিবেন এবং জমিনে তোমাদেরকে কর্তৃত্ব দিবেন। অতঃপর দেখবেন তোমাদের কর্ম কেমন হয়।’ (আল-আ‘রাফ: ১২৮-১২৯)

মূসা (আ.) ও তাঁর সাথীগণের অবস্থা খুবই ভয়াবহ হয়ে পড়েছিল। সামনে সমুদ্র আর পিছনে ফিরআওন ও তার বাহিনী। বিষয়টির বিবরণ কুরআনে এভাবে দেয়া হয়েছে. ‘মূসার সাথীগণ বললো, শত্রুবাহিনী তো আমাদেরকে পেয়ে গেলো! তিনি বললেন, কক্ষণো নয়, আমার সাথে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে সঠিক পথ দেখাবেন। অতঃপর আমি মূসাকে আদেশ করলাম তুমি তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো। আঘাতের পর তা দু’ভাগ হয়ে গেলো এবং প্রতিটি ভাগ ছিল উঁচু পাহাড়ের মতো। এবার আমি অপর দলটিকে কাছে নিয়ে আসলাম। আমি মূসা ও তার সকল সাথীকে উদ্ধার করলাম। অতঃপর আমি অপর দলটিকে সাগরে ডুবিয়ে দিলাম।’ (আশ-শু‘আরা: ৬১-৬৬)

আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ব্যাপারে সবসময় উত্তম ধারণা পোষণ করতেন। তার জাতি নানাভাবে তাঁর ওপর অত্যাচার করেছিলো। তিনি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও সাহায্যের ব্যাপারে ছিলেন আস্থাশীল। একবার পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা এসে তাঁকে বললো, ‘আপনি চাইলে দু’দিক থেকে দুটি পাহাড় চাপা দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিতে পারি।’ তিনি বললেন, ‘বরং আমি আশা করি, তাদের ঔরসে এমন সন্তান আসবে যে আল্লাহর ইবাদাত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

অতি কঠিন সময়েও তাঁর সাথী ছিল আল্লাহর ব্যাপারে উত্তম ধারণা। তিনি মক্কা ছাড়তে বাধ্য হলেন। পথে একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। মক্কার কাফিররা ওই গুহা পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। এ সময় তিনি তাঁর সাথী আবু বাক্‌রকে বললেন, ‘চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ আবু বাক্‌র (রা.) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, তাদের কেউ যদি তার পায়ের নিচে তাকায়, তাহলে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবু বাক্‌র! তোমার ধারণা কি আমরা দু’জন? আমাদের সাথে তৃতীয়জন হলেন— আল্লাহ।’ (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

অব্যাহত অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেও তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে এ দীনকে পৌঁছে দিবেন। তিনি বলতেন, ‘অবশ্যই এ দীন পৌঁছবে রাত-দিনের সীমানায়। শহর বা গ্রামের এমন ঘর থাকবে না যেখানে আল্লাহ এই দীনকে প্রবেশ করাবেন না।’

নবী-রাসূলগণের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ আল্লাহর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উত্তম ধারণা পোষণ করতেন। তাদের এ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন বলছে, ‘লোকেরা তাদেরকে বললো, তোমাদের বিরুদ্ধে একদল লোক সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছে, তোমরা তাদেরকে ভয় করো। এ কথাটি তাদের ঈমানকে আরো বাড়িয়ে দিলো। তারা বললো, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক।’ (আলে ইমরান: ১৭৩)

খাদিজা রাদি‘আল্লাহু আনহা আল্লাহর ওপর কতটাই না আস্থাশীল ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম ওয়াহী প্রাপ্ত হয়ে ঘরে ফিরে এসে বললেন, আমি আমার জীবন নিয়ে শঙ্কিত। খাদিজা (রা.) দৃঢ়তার সাথে বললেন, কক্ষণো নয় আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আপনাকে অসম্মানিত করবেন না। আপিন জরায়ুর সম্পর্ক রক্ষা করেন, বিপদগ্রস্তদের বোঝা বহন করেন, মেহমানদারী করেন, সমস্যাগ্রস্তদের সাহায্য করেন।’ (সহীহুল বুখারী)

উম্মাতের অতীতের সৎকর্মশীলগণ একইভাবে সুধারণার ভিত্তিতে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতেন। সা‘ঈদ বিন জুবাইর (রাহি.) আল্লাহর কাছে এ বলে দু‘আ করতেন, ‘হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে তোমার ওপর যথাযথ নির্ভরতার জন্য প্রার্থনা করি। তোমার ব্যাপারে উত্তম ধারণার জন্য প্রার্থনা করি।’

মুমিনদের দায়িত্ব হলো, সকল সময়, সকল অবস্থায় তাদের রবের ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করা।

তাওবাহ কবূলের জন্য আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দাহ অপরাধ করলো; সে জানে যে, তার একজন রব আছেন যিনি অপরাধ ক্ষমা করেন, আবার অপরাধের জন্য পাকড়াও করেন, আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো।’ (সহীহ মুসলিম)

কুরআন মাজীদে একদিকে কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে না।

মুশরিক ও মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের শাস্তি দিবেন; তারা আল্লাহর ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণকারী।’

অপর দিকে মুমিনদের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা যখন শত্রুবাহিনীকে দেখলো তখন তারা বলে উঠলো— এ তো হচ্ছে তা-ই যার ওয়াদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের কাছে করেছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য ওয়াদাই করেছেন। এরা তাদের ঈমান ও আনুগত্যের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলো।’

মুমিন যখনি কোনো সংকটে পড়বে, উত্তম ধারণা নিয়ে আল্লাহর প্রতি নির্ভশীল হবে। এটিই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়। আল্লাহ বান্দার প্রতি করুণাময়। তাঁর রাগ ও ক্রোধের চেয়ে করুণা অগ্রগামী। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার রাহমাত ও করুণা আমার রাগ ও ক্রোধের ওপর অগ্রগামী।’ (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

অভাব অনটনে যে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে আল্লাহ তাকে জীবিকার প্রশস্ততা দিবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি যদি তার অভাবকে মানুষের দ্বারস্থ করে, তার অভাব মিটবে না। আর যে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি অভাবকে আল্লাহর দায়িত্বে ন্যাস্ত করবে, আল্লাহ তাকে জীবিকা দিবেন— শীঘ্র অথবা বিলম্বে। (সুনান তিরমিযী)

সাহাবী যুবাইর বিন আল-আওয়াম (রা.) ছেলে আবদুল্লাহ (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি তুমি আমার ঋণ পরিশোধে অক্ষম হও তাহলে আমার মনিবের সাহায্য নাও। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমার পিতা মনিব বলে কাকে বুঝিয়েছেন, আমি বুঝতে পারিনি। আমি বললাম, বাবা! আপনার মনিব কে? তিনি বললেন, আল্লাহ। আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রা.) বলেন, আমি যখন আমার পিতার ঋণ পরিশোধে কষ্টে পড়তাম, বলতাম, ‘হে যুবাইরের মনিব! তার ঋণ পরিশোধ করে দাও। তিনি তা পরিশোধ করে দিতেন।’ (সহীহুল বুখারী)

বান্দা সব সময় আল্লাহর ব্যাপারে ভাল ধারণা পোষণ করবে, বিশেষ করে যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করা ছাড়া তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুবরণ না করে।’ (সহীহ মুসলিম)

মুমিন আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করবে। এ ধারণা অনুযায়ী সে আল্লাহকে পাবে। একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, আমি বান্দার কাছে তার ধারণা অনুযায়ী। এবং আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে।’ (সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

আল্লাহর পক্ষ থেকে যে তার ব্যাপারে উত্তম ধারণার তাওফীক অর্জন করে, তার জন্য কল্যাণের দরোজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেন, ‘শপথ তাঁর, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। একজন মুমিনকে আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণার চেয়ে উত্তম আর কিছু দেয়া হয়নি।’

যে আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করে আল্লাহ তাকে হতাশ ও নিরাশ করেন না।

কিয়ামত দিবসে আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণকারী বলবে, ‘এই দেখো, আমার কর্ম-প্রতিবেদন পড়ে দেখো। আমি ধারণা করেছিলাম, আমি হিসাবের দিনের সম্মুখীন হবো।’ তার অবস্থান হবে সুউচ্চ জান্নাতে।

বারাকাল্লাহু….

দ্বিতীয় খুতবা

আল্লাহর প্রশংসা তাঁর অসীম অনুগ্রহের জন্য।

হে মুসলিমগণ! আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণের প্রকাশ ঘটবে উত্তম আমলের মাধ্যমে। মানুষের মধ্যে আল্লাহর ব্যাপারে সর্বোত্তম ধারণাকারী সে, যে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগত। আল্লাহর প্রতি বান্দার ধারণা ভাল হলে, তার আমলও ভাল হবে। ধারণা খারাপ হলে আমল খারাপ হবে। আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা, উত্তম ও কল্যাণকর আমলের প্রতি উৎসাহ ও প্রেরণা দেয়।

আসুন আমরা আমাদের নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করি। আল্লাহ এ বিষয়ে আদেশ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত পেশ করেন। হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা তাঁর ওপর সালাত ও সালাম পেশ করো।’

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক ‘আলা নাবীয়্যিনা মুহাম্মাদ, ওয়া আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমা‘ঈন।

হে আল্লাহ! চার খলীফা আবু বাক্‌র, উমার, উসমান, আলীসহ সকল সাহাবী, তাবি‘ঈ এবং তাদের নিষ্ঠাবান অনুসারীদের প্রতি তুমি সন্তুষ্ট হও। তোমার অপরিসীম অনুগ্রহে তাদের সাথে আমাদের প্রতিও সন্তুষ্ট হও।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের তুমি শক্তি ও সম্মান দাও। (৩ বার) শির্ক ও মুশরিকদের তুমি অপমানিত করো।

হে আল্লাহ! আমাদের এই দেশ ও মুসলিমদের সকল দেশকে নিরাপদ ও শান্তির দেশ বানাও।

হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ দাও, আখিরাতেও কল্যাণ দাও।

হে আল্লাহ! তুমিই আল্লাহ। তুমি মুখাপেক্ষীহীন। আমরা অভাবী।

হে আল্লাহ! আমরা আমাদের ওপর অবিচার করেছি। তুমি যদি আমাদেরকে ক্ষমা ও দয়া না করো তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।

হে আল্লাহ! আমাদের নেতাকে সংশোধন করে দাও, তাকে এমন কাজ করার তাওফীক দাও যাতে তুমি সন্তুষ্ট। সকল মুসলিম শাসককে তোমার কিতাব অনুযায়ী আমল ও তোমার শরীয়াহ অনুযায়ী শাসন পরিচালনার তাওফীক দাও!

মূল খুতবা: শাইখ আবদুল মুহসিন আল-কাসিম
অনুবাদ: মুরাদ আশরাফী