সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

পশ্চিমা ইসলাম-বিরোধী রাজনীতিকরা কেন মুসলিম হচ্ছেন?

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৮
news-image

গেল বছর আর্থার ওয়াগনার ছিলেন বিশেষ এক অর্জনের অংশ। তিনি যে ইসলাম ও অভিবাসী বিরোধী রাজনৈতিক দলের অংশ ছিলেন, সেই ‘অলটারনেটিভ ফর ডাচেসল্যান্ড’ (এএফডি) প্রথমবারের মতো জার্মানির সাধারণ নির্বাচনে খুবই ভালো ফল করে এবং আইনসভা বুন্ডেসটাগে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে। সেটিই ছিল পঞ্চাশের দশকের পর জার্মান আইনসভায় প্রথম কোনো উগ্র ডানপন্থী দলের প্রবেশ। এই বছর ওয়াগনার আরও বড় কিছু ঘটিয়ে ফেলেছেন। তিনি এবার ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেছেন!

এএফডির ব্রান্ডেনবার্গ রাজ্য শাখার শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন ওয়াগনার। ২০১৫ সাল থেকে তিনি আইনসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে কৌতুকভরে এ-ও জানাতে ভুলেনি যে, ওয়াগনার ছিলেন রাশিয়ান বংশোদ্ভূত। খবরে আরও বলা হয়েছে, তিনি এএফডি’র রাজ্য কমিটিতে চার্চ ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। দলটির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন। তার ধর্মান্তর নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে দলের কোনো আপত্তি নেই।’

কিন্তু, ওয়াগনারের নতুন ধর্মীয় পরিচয় যে তার সাবেক দলীয় সহকর্মীদের জন্য কিছুটা অস্বস্তির, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, এএফডি এতটাই মুসলিম-বিরোধী যে, দলটি একবার নিজেদের স্লোগানে লিখেছিল, ‘জার্মানিতে ইসলামের কোনো স্থান নেই।’

আরও অবাক করার মতো তথ্য হলো, ইউরোপে উগ্র ডানপন্থী ও ইসলাম-বিরোধী দল থেকে পদত্যাগ করে মুসলিম হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। নেদারল্যান্ডের বহুল সমালোচিত ডানপন্থী নেতা গার্ট উইল্ডার্সের ডাচ ফ্রিডম পার্টির সদস্য ছিলেন আরনোড ভ্যান ডুর্ন। ফ্রিডম পার্টিও ইউরোপের অন্যতম কুখ্যাত উগ্র ডানপন্থী ও ইসলাম-বিরোধী দল। অথচ, ২০১১ সালে এই দল থেকে পদত্যাগ করেন আরনোড ভ্যান ডুর্ন। পরের বছরই তিনি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। কয়েকদিন পর তিনি হজ্বও পালন করেন।

২০১৪ সালে ইউরোপের আরেক কুখ্যাত উগ্র ডানপন্থী দল ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্টের কাউন্সিলর ম্যাক্সেন্স বাটি ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হন। তাকে পরে দলীয় কমিটি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে আরও ভয়াবহ এক ঘটনা। ফ্লোরিডার টাম্পায় ১৮ বছর বয়সী সাবেক এক নব্য নাৎসি তার দুই নব্য নাৎসি রুমমেটকে হত্যার কথা স্বীকার করে। হত্যার আগে ওই ব্যক্তি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। ঘটনাটা বেশ অদ্ভুত। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, হত্যার সময় সন্দেহভাজন এই ব্যক্তি চিৎকার দিতে থাকেন, যা ইসলাম বা মুসলমান সম্পৃক্ত কিছু ছিল না।

কিন্তু মুসলিম-বিরোধী থেকে খোদ মুসলিম হয়ে যাওয়ার এসব ঘটনা গতানুগতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে মেলে না। একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া খুব সহজ। শুধু কালেমা শাহাদাহ উচ্চারণ করেই একজন নিজেকে মুসলিম বলে ঘোষণা করতে পারেন। ব্যাপ্টিজম বা খ্রিস্টান হতে যে ধরনের ধরাবাধা নিয়ম আছে, কিংবা ইহুদী ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে যেই সনদপত্রের দরকার হয়, সেরকম কিছু ইসলামে নেই। কোনো ধরনের বিশেষ ধর্মীয় আরাধনা, শর্ত পালন বা ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও, কেউ চাইলেই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে পারেন। এই কথা বলার মানে এই নয় যে, ধর্মান্তরিত হতে তেমন আন্তরিকতার দরকার হয় না। অবশ্যই অনেক চিন্তাভাবনার পরই কেবল কেউ একজন নিজের বংশীয় ধর্ম পাল্টানোর সাহস অর্জন করেন। কিন্তু কেউ একজন ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, এতেই যে সব উত্তর পাওয়া গেল, তা নয়।

এটি সত্যি যে, ইউরোপে ইসলাম-বিরোধী রাজনীতিকদের কেউ কেউ মুসলিম হয়ে যাচ্ছেন। এটি কিন্তু এখনও ব্যতিক্রমের পর্যায়ে রয়েছে। এখনও একে চলতি প্রবণতা বলা যায় না। কিন্তু অন্তত এটা নিয়ে কৌতুহল জন্মানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কী কারণে তীব্র ইসলাম-বিদ্বেষী দল থেকে সোজা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে একজন মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন?

ফ্রান্সের সেই ধর্মান্তরিত কাউন্সেলর বাটি এক্ষেত্রে উত্তর দিয়েছিলেন যে, উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে, যেটা এই আন্দোলনের অনেক সদস্যই এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। লা পার্টিসান পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষকেই (মুসলিম ও ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী আন্দোলন) গণমাধ্যমে খুবই নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়। কিন্তু গণমাধ্যমে তাদেরকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তার চেয়ে তারা বাস্তবে অনেক আলাদা।’

তিনি আরও যুক্তি দেখান যে, ‘ইসলামের মতো, ন্যাশনাল ফ্রন্টও সমাজের সবচেয়ে দুর্বলতম শ্রেণির পক্ষাবলম্বন করে। দলটি গলাকাটা সুদের হারের নিন্দা জানায়। আর ইসলাম খোদ সুদ ব্যবহারেরই বিরোধী।’ প্রায় কাছাকাছি কথা বলেছেন খোদ ওয়াগনারও। তিনি বলেছেন, তিনি চান এএফডি ও ইসলামের মধ্যে আরও সংযোগ ঘটাতে।

ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জার্মানির প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা এখন সমকামী বিয়েকে সমর্থন দেয়। তিনি মনে করেন, জার্মানির খ্রিস্টান চার্চ এখন এতটাই পরিবর্তিত যে, একে তিনি আর বুঝে উঠতে পারেন না।

ইসলাম ও উগ্র ডানপন্থীদের সাদৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে, আমরা যদি এটি বের করার চেষ্টা করি যে, কী কারণে ইসলাম ও উগ্র ডানপন্থা মানুষকে আকৃষ্ট করে, তাহলেই আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে।

কিছু মানুষ সবসময়ই থাকে যারা কোনো কিছুতে যোগ দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। তারা চায় কোনো গোষ্ঠীতে যোগ দিতে। প্রায় সবাই এমন কাউকে না কাউকে নিশ্চয়ই চেনেন, যিনি প্রতিনিয়ত নতুন সামাজিক গোষ্ঠী বা সংগঠন খুঁজে বেড়ান।

মাইকেল হগের অনিশ্চয়তা-পরিচয় তত্ত্ব মতে, মানুষ নিজের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন যথাসম্ভব কমাতে চায়। তিনি বলেন, ‘এই আগ্রহ পূরণের একটি উপায় হলো নিজেকে কোনো গোষ্ঠীর (দল, সংগঠন, ধর্ম, নৃজাতি বা রাষ্ট্র) সঙ্গে জড়ানো। এটি শুধুমাত্র সামাজিক জগতে একজনের পরিচয়ই নির্ধারণ করে দেয় না, এর মাধ্যমে বলা হয়ে যায়, মানুষটির কেমন আচরণ করা উচিত, অন্যদের সঙ্গে কীভাবে কথাবার্তা চালানো উচিত।’ নিজের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নিয়ে যারা সবসময় মাথা ঘামায়, তারাই উগ্র ডানপন্থী বা বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠির সঙ্গে জড়ায়।

হগ ও জেনিস অ্যাডেলম্যান লিখেছেন, উগ্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে এমনসব উপাদান আছে, যা আত্ম-অনিশ্চয়তাকে কমিয়ে দেয়। ওয়াগনার, ভ্যান ডুর্ন বা বাটির মতো মানুষজন কেন ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী দলগুলোয় ভিড়েছে, তার একটা ব্যাখ্যা এ থেকে পাওয়া যেতে পারে। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এবার তারা যেহেতু ইসলাম গ্রহণ করেছেন, সেটিও নিশ্চয়ই খুব উগ্র ঘরানার হবে। এমনকি সহিংস জিহাদের পথে প্রথম ধাপও হতে পারে।

২০১৭ সালের আগস্টে আমেরিকার ভার্জিনিয়ার শার্লোটসভিলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সহিংসতার পর জুলিয়া আয়োফ লিখেছিলেন, যেসব কারণে মানুষ বিভিন্ন ধরনের চরমপন্থী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তা রাজনৈতিক কারণে ভিন্ন ভিন্ন দেখালেও, আদতে একই।

দ্য হেগের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কাউন্টার টেরোরিজম নামে থিংকট্যাংকের ফেলো জেএম বার্গার বলেছেন, ‘বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনে উগ্রপন্থা ও চরমপন্থার প্রক্রিয়া ও কাঠামো একই। যদিও চরমপন্থী বিশ্বাসের আধেয় আলাদা, যেমন, নব্য নাৎসি বা জিহাদী।’

কিন্তু এমনটা যে সবসময়ই ঘটে, তা নয়। আগেই বলা হয়েছে, অনেক মানুষ বিভিন্ন দলে বা গোষ্ঠীতে যোগ দিতে পছন্দ করে। কিন্তু এসব গোষ্ঠীতে যোগ দিলে অনেক অসুবিধাও আছে।

মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা খুবই ব্যাপক না হলে ও তাদের সামনে বিকল্প থেকে থাকলে, মানুষ এসব আন্দোলনের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট হয় না। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অসহিংস মূলধারার ইসলামী সমাজে যোগ দিয়েও মানুষ তার অনিশ্চয়তার অনেক সমাধান পেতে পারে। আবার চরমপন্থী গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার অসুবিধাও তাদেরকে পোহাতে হয় না।

হগ ও আডেলম্যান যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মানুষের অনিশ্চয়তা দূর করার সেরা পন্থা হলো, সুনির্দিষ্ট ও শক্ত কাঠামোগত গোষ্ঠিতে যোগ দেওয়া, যাদের সীমানা স্পষ্ট। সদস্যতার নিয়মাবলী স্পষ্ট।

পশ্চিমা বিশ্বে খ্রিস্টান সাংস্কৃতিক পরিচয় শতকের পর শতক ধরে প্রভাব বিস্তার করেছে। সেখানে ইসলামের কিছুটা প্রান্তিকীকরণ হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ঠিক তেমনই একটি গোষ্ঠী। ইসলাম বেশ আলাদা। ইসলামের সদস্য তথা মুসলমান হতে হলে, কী করণীয় এবং ইসলামে কী করা যাবে ও কী করা যাবে না, সেই সীমারেখা সুনির্দিষ্টভাবে টেনে দেওয়া আছে। মুসলমানদের কী ধরনের আচরণ করতে হবে, তারও নির্দেশনা আছে।

একটি রাজনৈতিক দল বা মূলধারার খ্রিস্টবাদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ইসলামে তুলনামূলকভাবে উঁচুনিচুর প্রভেদ নেই। আবার এক্ষেত্রে বলা যায়, খুব মৌলবাদী খ্রিস্টবাদেও এমন বৈশিষ্ট্য পেতে পারে অনেকে।

ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী ইসলাম-বিরোধী দলগুলোর কোনো কোনো সদস্য যে ইসলামে ধর্মান্তরিত হচ্ছেন, তা ইতিহাসে নতুন। এর একটি কারণ হলো, উগ্র ডানপন্থী ও ইসলাম-বিরোধী রাজনৈতিক দলের হালে পানি পাওয়ার নজিরও বেশি পুরোনো নয়। অতীতে হলে, ইউরোপের রাজনীতি কমবেশী ইসলাম-বিরোধীই হতো। তবে সেক্ষেত্রে প্রকৃত মুসলিমদের নৈকট্য বা মিশ্রণও থাকতো। কিন্তু ইন্টারনেটের উত্থান, যার দরুন উগ্রপন্থা বিকশিত হয়, তার ফলেও নতুন কোথাও যোগ দিতে উন্মুখ লোকজন নতুন ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে জানতে পারছে। অতীতে কুরআনের সমালোচকরা পরে ইসলামে যোগ দিয়েছে, এমন নজির আছে। যেমন, ফ্রান্সের মরিস বুকাইল। বুকাইল পরে এ-ও দাবি করেন, কুরআন বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি সঠিক।

তবে নতুন করে যারা ইসলামে ধর্মান্তরিত হচ্ছেন, তারা যে নতুন মুসলমান পরিচয়ের পাশাপাশি এক নতুন ব্যক্তিত্বও ধারণ করছেন, এমনটা না-ও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভ্যান ডুর্ন আগে উগ্র ডানপন্থী থাকাকালে ইসলামের সমালোচনা করলেও, ইসলাম গ্রহণের পর এবার তিনি ইহুদীদের সমালোচনা করা শুরু করেছেন। ২০১৪ সালে অল্পবয়সীদের কাছে মাদক বিক্রি ও অন্যান্য অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। অন্য কথায় বলতে গেলে, তার সারবত্তা আগের মতোই আছে, শুধু তার রূপ বদলেছে। এ থেকে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ডুর্ন, ওয়াগনার বা বাটি যে ধর্ম পাল্টাচ্ছেন, তা থেকে তাদের উগ্র ডানপন্থা বা ইসলাম প্রিয়তা যতটা বোঝা যায়, তার চেয়ে বেশি বোঝা যায় তাদের ব্যক্তিত্বকে। সেটা হলো, তারা নতুন পরিচয়ের সন্ধানে নতুন কোথাও যোগ দিতে উন্মুখ।

মাহমুদ ফেরদৌস

(দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ডেভিড এ গ্রাহামের লেখার অনুবাদ। কিছুটা সম্পাদিত।)

এ জাতীয় আরও খবর