সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের দাওয়াত

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৮
news-image

ইসলামের দাওয়াতকে যেসব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে হবে তার মধ্যে বণিক, ব্যবসায়ী ও অর্থ লগ্নিকারী গোষ্ঠীও গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্প্রদায়ের লোকজন অর্থ ও পুঁজি, লাভ ও লোকসান, একচেটিয়া কারবার ও প্রতিযোগিতার জগতে বাস করে। এ সম্প্রদায়ের মানুষ সাধারণত হালাল-হারামের বিধিনিষেধের কথা ভুলে যায়, আল্লাহর যিক্‌র, সালাত ও যাকাত আদায়কে উপেক্ষা করে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে অশুভ ও ঝুঁকির দিক রয়েছে, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের দিকনির্দেশনা ও নসিহত দেয়ার ক্ষেত্রে সজাগ ছিলেন।

তিনি প্রতারণার বিরুদ্ধে তাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছেন ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়’। একচেটিয়া কারবারের বিরুদ্ধে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে পণ্যের একচেটিয়া ব্যবসা করল, সে অন্যায় করল’ অর্থাৎ সে পাপী। তিনি ব্যবসায়ীদের আল্লাহর নামে অতিরিক্ত কসম খাওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। তারা যেন আল্লাহর কসম না খেয়ে বেচাকেনা করতে পারে না। তিনি মিথ্যা শপথের বিরুদ্ধেও সতর্ক করে দিয়েছেন, যে শপথের কারণে হয়তো লেনদেন বাড়বে, কিন্তু বিক্রেতা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি সুদের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘যারা সুদ নেয়, যারা দেয়, যারা এর চুক্তিপত্র লেখে এবং যারা এর সাক্ষী হয়, আল্লাহ তাদের লা’নত দেন’। তিনি যে পণ্য মজুদ নেই (গারার) তা বিক্রয়ের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। কেননা পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাকে অজ্ঞ রাখা হয় এবং যখন মাল হাজির করা হয়, তখন অনিবার্যভাবেই বিবাদ সৃষ্টি হয়।

পবিত্র কুরআনে পরিমাণ ও ওজনে প্রতারণা করার বিরুদ্ধেও ভর্ৎসনা করে বলা হয়েছে— ‘দুর্ভোগ রয়েছে মাপে ও ওজনে কম দাতাদের (যারা অন্যের অধিকার খর্ব করল), যখন তারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয় তখন পুরোপুরি নেয়, আর যখন মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে তাদের পুনরুত্থিত করা হবে এক মহান দিবসে, যেদিন সমস্ত মানুষ বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হবে।’ (সূরা মুতাফফিফিন: ১-৬)

অন্যদিকে, আল কুরআন সেসব ব্যবসায়ীর প্রশংসা করেছে, যারা আল্লাহর প্রতি তাদের কর্তব্য এবং ফরজসমূহ পালনে গাফেল নয়। পবিত্র কুরআনে নামাজ আদায়ে তাদের নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে— (তারা রয়েছে) এমনসব গৃহে বা মসজিদে যা আল্লাহ পবিত্রতা ও মর্যাদায় উন্নীত করার জন্য আদেশ দিয়েছেন, এতে সকাল ও সন্ধ্যায় এমনসব লোক আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে, যাদের ক্রয় ও বিক্রয় গাফেল করে রাখতে পারে না আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামাজ আদায় করা ও যাকাত প্রদান থেকে, তারা সেদিনের ভয় করতে থাকে, যেদিন বহু অন্তর ও চোখ উল্টে যাবে।’ (সূরা নূর: ৩৬-৩৭)

ব্যবসায়ী-বণিকরা জাতির সম্পদের বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা জনগণের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভোগ্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। এভাবে তারা জাতীয় অর্থনীতি ও আর্থিক নীতির ওপরে প্রভাব খাটায়। সুতরাং ব্যবসায়ীদের সতর্ক করতে হবে যা তাদের করা উচিত নয়, তা যেন কখনোই না করে এবং তাদের সম্পদের যাকাত আদায় এবং যাকাত ছাড়াও দানখয়রাত করে।

বণিক সম্প্রদায় ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের আওতায় পড়ে না এবং তারা কেবল দুনিয়াদারি নিয়ে ব্যস্ত, তাই তাদের মধ্যে কাজ করা নিরর্থক মনে করা উচিত নয়। তারাও অন্যদের মতো মানুষ। উপদেশ ও হুঁশিয়ারি তাদের নাড়া দেয়, বিচক্ষণ বচন, সহিষ্ণু ও সঠিক উপস্থাপনায় তারাও মুগ্ধ হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতের প্রাথমিক দিকগুলোতে বহু ব্যবসায়ী আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.)-এর ওপর ঈমান আনেন। এমনকি তাদের ব্যবসা ও পুঁজি ধ্বংস বা ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তারা তাওহীদের দাওয়াতে সাড়া দেন। দেখা যায় যারা একেবারে প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর (রা.), ওসমান (রা.) ও আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)। তারা সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত লাভের আশায় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার জন্য তারা ঘরবাড়ি, সহায়সম্পদ ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। তারা আল্লাহর জন্যই ভাগ্যের এ পরিবর্তন সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেন।

আমাদের এ যুগে, আমরা দেখছি বহু সৎ ব্যবসায়ীকে দুনিয়ার জীবনের চেয়ে পরকালের জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে দীনী কাজে স্বেচ্ছায় অর্থ ব্যয় করছেন। আল্লাহর রহমতের নিদর্শন হিসেবে প্রাপ্ত ধনসম্পদ তারা আঁকড়ে ধরে রাখেন না। কেননা তারা নিজেদের জান ও মাল ইসলামী দাওয়াহ ও আন্দোলনেরই সম্পদ বলে মনে করেন।

পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান পুঁজিপতিরা তাদের ধর্ম প্রচারের জন্য সারা বিশ্বের খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোটি কোটি ডলার প্রদান করছে। ইহুদি পুঁজিপতিদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের কৃপণতা ও অর্থপূজার স্বভাব সত্ত্বেও তারা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে ইহুদি স্বার্থে অকাতরে অর্থ ব্যয় করে চলেছে। মুসলিম বিত্তশালীদের তো কম করলে চলবে না। কারণ তারা জানেন, সম্পদের মালিক আল্লাহ। সুতরাং তাদের আল্লাহর পথে এ ধনসম্পদ ব্যয় করতে হবে। আর এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তাদের পুরস্কৃত করবেন।

ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের বিস্তার এবং মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য ও যথাযথভাবে ইসলামের খেদমত করার অন্যতম পয়লা কর্মসূচি। আর এ পথে অর্থ ব্যয় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য এবং এ মহতি কর্মের মাধ্যমে একজন মুসলমান নিঃসন্দেহে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। এ ধরনের কেন্দ্র মুসলিম তরুণদের কাছে খাঁটি ইসলামী আদর্শের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া এবং তাদের ধ্যান-ধারণার পরিশুদ্ধি ও আচার-আচরণ সংস্কারে সহায়ক হবে। এ কেন্দ্র শিক্ষাশিবির, কর্মশালা, আলোচনা অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন উপায় ও কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে তরুণ মানসে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ ও উদ্দীপনা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

ইসলামী আন্দোলনের উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, সুদক্ষ, ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ শিক্ষিত মার্জিত কর্মীবাহিনী যাদের জীবিকার সঙ্গতি আছে, তারা পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে। এ কর্তব্যে অবহেলাকে তারা পাপ মনে করবে এবং এ মহৎ কর্ম সম্পাদন আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার এবং জনগণের প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। বস্তুত এ কর্মসূচির জন্য দরকার অর্থ ও সময়ের পাশাপাশি কর্মসূচির রূপায়ণে নিরন্তর প্রচেষ্টা।

ড. ইউসুফ আল কারযাভী
অনুবাদ: মুহাম্মদ সানাউল্লাহ