সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

বইমেলা উদ্বোধন: নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৮
news-image

নিজেদের ভাষা সংস্কৃতির মর্যাদা দিন

পয়গাম ডেস্ক: অমর ভাষা আন্দোলন স্মরণে মাসব্যাপী বইমেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা একাডেমি চত্বরে মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা প্রদানে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ভাষা, নিজেদের শিল্প-সাহিত্যকে যদি আমরা মর্যাদা দিতে না পারি, তার উৎকর্ষ সাধন করতে না পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে আরো উন্নত হতে পারবো না। মনে রাখতে হবে— অশুভ পথে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা কখনো ভাষা বা সংস্কৃতির চর্চা করতে জানে না। কারণ, এদের মানসিকতা একটু ভিন্ন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক, যে বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ, যে বাংলাদেশে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ তাদের ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও তাদের ভাষার চর্চা করতে পারবে।

তাছাড়া আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি। যেখানে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি এবং ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বক্তৃতা করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেন খান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটনও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের কবি ও লেখক এগনিস মিডোস, ক্যামেরুনের কবি ও সৃষ্টিশীল লেখক অধ্যাপক ড. জয়েস অ্যাসউনটেনটং, মিশরের লেখক ও প্রখ্যাত টেলিভিশন সাংবাদিক ইব্রাহিম এলমাসরি এবং সুইডেনের কবি ও সাহিত্য সমালোচক অরনে জনসন বক্তৃতা করেন।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এবারের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ১২ জন কবি, সাহিত্যিক ও প্রবন্ধকারের হাতে পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট, সম্মাননা স্মারক এবং নগদ অর্থের চেক তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘আলোকচিত্রে বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক দু’টি বই উপহার দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে একুশের গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়।

এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন—  কবিতায় কবি মো. সাদিক ও কবি মারুফুল ইসলাম, কথাসাহিত্যে মামুন হোসেন, প্রবন্ধে অধ্যাপক মাহবুবুল হক, গবেষণায় অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খান, অনুবাদে লেখক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে মুক্তিযোদ্ধা কামরুল হাসান ভূঁইয়া ও সুরমা জাহিদ, ভ্রমণ কাহিনীতে শাকুর মজিদ, নাটকে অধ্যাপক মলয় ভৌমিক, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে মোশতাক আহমেদ এবং শিশু সাহিত্যে ঝর্ণা দাস পুরকায়স্থ।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, এই বাংলা একাডেমিতে আজকে বইমেলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে- পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার বই বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে, আমাদের বাংলা ভাষার লেখাগুলোও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিবার যখন বইমেলা হয় তখন কোনো না কোনো দেশের কবি-সাহিত্যিকরা এখানে উপস্থিত হন। যাদের অনেকেই বাংলা ভাষার চর্চা করেন, তারা আমাদের উৎসাহিত করেন এবং বাংলাভাষার মর্যাদা বিশ্বে আরো বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৪ সালে বিশ্বের খ্যাতনামা কবি-লেখক-পণ্ডিতগণের অংশগ্রহণে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম বাংলা সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধু এর উদ্বোধন করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালের অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়াসহ ছাত্র-জনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি ইউনেস্কোর মাধ্যমে অমর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার কথাও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা কিন্তু কেবল বই কেনাবেচার জন্য নয়। বইমেলা কিন্তু আকর্ষণ করে। আমাদের সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রটা প্রসারিত করে। অজানাকে জানার সুযোগ করে দেয়। কাজেই আমরা নিজেরাই এই বইমেলাকে বলি এটা আমাদের প্রাণের মেলা। তিনি বলেন, প্রত্যেক ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অনুষ্ঠিত এই বইমেলা দেশের অনেক নবীন লেখককে তাদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশের সুযোগ করে দেয় আবার অনেক পাঠক সৃষ্টি করে।

পরে প্রধানমন্ত্রী বইমেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখেন এবং প্রকাশক ও বিক্রেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মেলায় বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৫ লাখ বর্গফুট এলাকায় ৪৫৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৭১৯টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার ৫৩৬ বর্গফুট আয়তনের ২৫টি প্যাভেলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ১৩৬টি লিটল ম্যাগাজিনকে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ছুটির দিন ব্যতীত বইমেলা প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং ছুটির দিনে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকালেই সেমিনার এবং সন্ধ্যায় মেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি চত্বরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।