সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

উম্মাতে মুহাম্মাদীর নাজাতপ্রাপ্ত দল কোনটি?

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৮
news-image

মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষের জন্য পথনির্দেশ হিসাবে কিতাব পাঠিয়েছেন। আর পাঠিয়েছেন কিতাবের অনুসরণ কিভাবে করতে হবে— তা শিখিয়ে দেবার জন্য নবী ও রাসূলগণকে। আল্লাহর মনোনীত নবী-রাসূলগণ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাঁর উম্মাতকে পরিচালিত করেছেন। যারা সত্যিকার মুমিন ছিলেন, তারা নবীর শিক্ষায় পথ চলে আল্লাহর ক্ষমা ও পুরস্কার লাভ করে জান্নাতের পথে ধাবিত হয়েছেন। কুফরের চোখ রাঙানিকে পদদলিত করে, শয়তানের প্ররোচনায় নিপতিত না হয়ে বুনইয়ানুম মারসুসের মতো সত্যের পতাকা উড্ডীন রেখেছেন।

কিন্তু প্রত্যেক নবীর তিরোধানের কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর তাঁর উম্মাতের মধ্যে বিকৃতি শুরু হয়। নানা মত ও পথের সৃষ্টি হয়। মনগড়াভাবে একেক দল একেকভাবে দীন-ধর্ম পালন করতে থাকে। শির্‌ক-বিদ‘আতে লিপ্ত হয়ে তারা বহু দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে আল্লাহর মনোনীত নবী-রাসূলদের দেখানো হেদায়াতের পথ থেকে দূরে সরে গিয়ে শান্তির নিশানা হারিয়ে ফেলে। এবং হারিয়ে ফেলে আল্লাহর নির্ধারিত মুক্তির পথ তথা চির শান্তির জান্নাত লাভের পথ।

এই হচ্ছে ইতিহাসের বাস্তবতা। অতীতের নবী-রাসূলগণের অনুসারীদের মধ্যে এভাবে শয়তানের প্ররোচনায় নেমে এসেছিল বিভ্রান্তি, বিকৃতি, পথভ্রষ্টতা। সত্য থেকে বিচ্যুতি। আর এতোসব ভ্রান্তির ধূম্রজালের মধ্যে আল্লাহর খুব কম বান্দাই সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকতেন। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত কিছু সত্যসন্ধানী ব্যতিত অধিকাংশ লোকই সত্যবিচ্যুত হয়ে পড়তো। সেরকরম দুর্দশাগ্রস্ত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস থেকে আমরা জানি যে, কিয়ামতের পূর্বে মুসলিমদের মধ্যে ৭৩টি দলের আবির্ভাব হবে। তার মধ্যে একটি দল জান্নাতি হবে। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে সোনার মানুষ সাহাবাগণকে নিয়ে যে সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দীনের অনুসারী মুসলিমগণ কয়েকশত বছর পর্যন্ত একটি দল বা ফেরকা হিসাবে পরিচিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আকীদাগত ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে মুসলিম জাতি বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিয়া, সুন্নী, রাফেজী, খারেজী, মোতাযেলা ইত্যাদি মোট ৭৩ দলে বা ফেরকায় বিভক্ত হয়। এসব ফেরকার চিন্তা-চেতনা ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতায় দল-উপদলগুলো নানারূপে নানা চেহারায় আভির্ভূত হয়।

অবশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিভক্তির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আমরা এ সংক্রান্ত বিবরণ দেখতে পাই।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— ‘আমার উম্মাত তা-ই করবে যা করেছে বনী ইসরাঈলের লোকেরা। এক জুতা অপর জুতার সমান হওয়ার মতো। এমনকি যদি ওদের মাঝে কেউ মায়ের সাথে প্রকাশ্যে জিনা করে থাকে, তাহলে এই উম্মাতের মাঝেও এ রকম ব্যক্তি হবে যে এ কাজটি করবে। আর নিশ্চয় বনী ইসরাঈল ছিল ৭২ দলে বিভক্ত। আর আমার উম্মাত হবে ৭৩ দলে বিভক্ত। এই সবগুলো দলই হবে জাহান্নামী, একটি দল ছাড়া।’

সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন— সেই (সত্যপন্থী) দলটি কারা?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— ‘যারা আমার ও আমার সাহাবাদের মত ও পথ অনুসরণ করবে।’ [সুনান তিরমিযী, হাদীস-২৬৪১, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস-৭৬৫৯, আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস-৪৮৮৯, কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফআল, হাদীস-১০৬]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘নিশ্চয় আমার উম্মাতের মধ্যে এমন দলসমূহের উদ্ভব হবে যে, তাদের মধ্যে দুষ্ট-আকীদা, প্রবৃত্তির অনুগামিতা এমনভাবে সংক্রমিত হবে যেমন পাগলা কুকুরের বিশ সংক্রমণ হয় দংশিত ব্যক্তির মধ্যে। খারাপ আকীদা ও কু-রিপুসমূহ ঐ গোমরাহ লোকদের প্রতিটি নাড়ী-নক্ষত্র ও প্রত্যেক গ্রন্থিতে সংক্রমিত হবে। (আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত)

এ হাদীসের বিশ্লেষণে আবদুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ ‘গুনিয়াতুত ত্বালেবীন’ গ্রন্থে বলেন, ৭৩ ফেরকা মূলতঃ মূল দশটি ফেরকার শাখা-প্রশাখা। সেই দশটি ফেরকা হলো: (১) আহলে সুন্নাত, (২) খারেজী (৩) শিয়া বা রাফেজী, (৪) মোতায়েলা, (৫) মারযিয়া, (৬) মুশাব্বাহা, (৭) জাহমিয়া, (৮) জারারিয়া, (৯) নাজ্জারিয়া, (১০) কালাবিয়াহ।

আহলে সুন্নাত বা সুন্নাহর অনুসারীদের কোন শাখা-প্রশাখা নাই। ৪টি মাযহাব কোনো দল নয় বরং এটা ফিকাহ ভিত্তিক স্কুল বা একেকটা ফিকাহ-র স্কুলের মত। তাদের সবার আকীদা একই। কিন্তু অপরাপর ৯টি দলেরই শাখা-প্রশাখা বর্তমান এবং তারা ভিন্ন আকীদায় বিশ্বাসী। আবদুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, খারেজী দলের শাখা ১৪টি, শিয়া বা রাফেজী ৩৩টি, মোতাযেলার ৬টি, মারজিয়ার ১২টি, মুশাব্বাহার ৩টি, জারারিয়া, কালাবিয়াহ, নাজ্জারিয়া, জাহমিয়ার একটি করে মোট ৭২টি ফেরকা বর্তমান।

আল্লামা কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর প্রণীত তাফসীরে কুরতুবীতে লিখেন—

‘যেই ফেরকাটি উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে নতুন দেখা দেবে তারা হলো— যারা ওলামাদের সাথে শত্রুতা করবে, আর ফকীহগণের প্রতি রাখবে বিদ্বেষ। এ ধরনের দল পূর্ব উম্মাতের মাঝে ছিল না।’ [তাফসীরে কুরতুবী, সূরা আনআম-এর তাফসীর দ্র.]

এই উম্মাতের মাঝে বর্ধিত বাতিল ফেরকাটি হলো— ফিক্‌হ ও ফুকাহাদের দুশমন, তথা ইজতিহাদ ও মুজতাহিদদের দুশমন দল। কারণ পূর্ববর্তী উম্মাতদের কেবল নবীর আনীত দীনের উপর আমল করতে হতো, নতুন করে নীতিমালার আলোকে কোন ফায়সালা উদ্ভাবনের সুযোগ ছিল না। যেহেতু ইজতিহাদই ছিল না, তাই ইজতিহাদ ও মুজতাহিদ তথা ফিক্‌হ ও ফকীহ অস্বীকারকারী কোন বাতিল ফেরকাও ছিল না। আর এই উম্মাতের মধ্যে যেহেতু ফিক্‌হ ও ফকীহ রয়েছে, অর্থাৎ ইজতিহাদ ও মুজতাহিদ আছে, তাই এর দুশমনও আছে।

ফিক্‌হে হানাফী, ফিক্‌হে শাফেয়ী, ফিক্‌হে মালেকী, ফিক্‌হে হাম্বলী অস্বীকারকারী দল হলো এই উম্মাতের বর্ধিত বাতিল ফেরকা।

মুরজিয়া, কারিমিয়্যা, জাবরিয়া, কাদিয়ানী ইত্যাদি বাতিল ফেরকা এই উম্মাতের বর্ধিত বাতিল ফেরকা নয়। পূর্ব থেকেই এই ধরনের দলের নজির রয়েছে। কিন্তু ফকীহদের দুশমন বাতিল ফিরকার নজির পূর্ব থেকে নেই। যেহেতু পূর্বে ফিক্‌হ ও ফকীহই ছিল না।

নাজাতপ্রাপ্ত দল কারা?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলা্হি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টতই সেই নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় দিয়ে গেছেন। নাজাতপ্রাপ্ত হলো সেই দল— যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ তথা সেই জামাতের মত ও পথের অনুসারী। এক কথায় যারা সুন্নাহর অনুসরণকারী, সেই সাথে সাহাবাদের মত ও পথের অনুসারী এবং তাঁদের আকীদায় বিশ্বাসী। এই জামা‘আতই ‘আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত’ হিসাবে পরিচিত। তবে এই নামে কোনো গোষ্ঠী নিজেদেরকে নামকরণ করলেই তা হয়ে যাবে না। বরং তাদের আমল-আখলাক এবং অনুসৃত নীতিই পরিচয় করিয়ে দেবে।

‘আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত’ কোন রেজিষ্ট্রিকৃত দলের নাম নয়, এটি একটি আদর্শের নাম। যারা আল্লাহর বাণী আল-কুরআন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সু্ন্নাহ আঁকড়ে থাকবে, সেইসাথে সাহাবাদের মত ও পথের অনুসারী হবে তারাই হবে সত্যপন্থী দল, জান্নাতী দল।

তাদের আকীদা হবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের অনুরূপ। অপরাপর দলগুলো মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্গত হলেও বিকৃত আকীদা পোষণের কারণে যেমন দোষযুক্ত ও কুলষিত, তেমনি পথভ্রষ্ট হিসাবে পরিগণিত।

বর্তমান বিশ্বের সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশই মাযহাবের অনুসারী। শত শত বছর ধরেই মুসলিমদের মধ্যে মাযহাব বিষয়ে ইজমা রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় আরও কয়েকটি হাদীসে দিয়েছেন,

‘তোমাদের অবশ্যই তাদের অনুসরণ করতে হবে। বস্তুত আল্লাহ তা‘আলা কখনই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের বৃহদাংশকে ভুলের উপর প্রতিষ্ঠিত করবেন না।’ [ইবন আবী শায়বা এই হাদীসের পরম্পরাকে ‘সঠিক এবং নিরিবচ্ছিন্ন’ বলেছেন, হাদীস-৩৫৪]

এতোগুলো ফেরকা বা দল-উপদলে মুসলিমগণ বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও আমরা দেখি যে, আম মুসলিম বা ব্যাপকভাবে মুসলিম সমাজ প্রান্তিক দলগুলোতে যুক্ত হননি। তারা স্বাভাবিকভাবে রাসূলের সুন্নাহর প্রতিই অনুরক্ত। অন্যদিকে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী বিশেষ বিশেষ ধরন ও বিশেষ বিশেষ চেহারা লাভ করে দীনকে বিনষ্ট করছে। আর নিজের দীন ও আমলকে বরবাদ করে দিচ্ছে।

মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাঁর কিতাব আল-কুরআন ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহকে সেভাবে আঁকড়ে ধরার তাওফীক দিন যেভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন রাসূলের মহান সাহাবীগণ।

—কামরুল ইসলাম হুমায়ুন