সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Beta Version

পানি আল্লাহর একটি বড় নিয়ামাত

POYGAM.COM
জানুয়ারি ২০, ২০১৮
news-image

জুমু‘আর খুতবা, মসজিদে নববী, মদীনা মুনাওয়ারা
খুতবার তারিখ: ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী; ০১ ডিসেম্বর ২০১৭ ঈসায়ী

সকল প্রশংসা আল্লাহর, আমরা তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। তাঁর কাছেই ক্ষমা চাই। তাঁর ওপরই নির্ভর করি।

হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তাঁর বান্দাহদেরকে প্রকাশ্য ও গোপনীয় প্রচুর নিয়ামাত দিয়েছেন। রাত ও দিনে নিয়ামাত প্রদানে তাঁর হস্তদ্বয় প্রসারিত।

মানুষকে প্রদত্ত তাঁর অনুগ্রহ ও নিয়ামাতের সীমা নেই। এ নিয়ামাতসমূহ থেকে বান্দাদের বিমুখ হওয়ার সুযোগ নেই।

আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামাত তাঁর বান্দাদের চোখের সামনে উন্মোচিত করে রেখেছেন, যেন তারা এসব দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। তিনি ফেরেশতাদেরকে আদেশ করেন তারা যেন বাতাসকে প্রবাহিত করে, মেঘমালাকে ভাসিয়ে নেয় এবং তা থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে। আর এর দ্বারা যেন বান্দারা উপকৃত হতে পারে।

আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহ এ মেঘমালা সঞ্চালিত করেন, অতঃপর তিনি তাকে তার টুকরোগুলোর সাথে জুড়ে দেন, তারপর তাকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে পুঞ্জিভূত করে রাখেন।’ (আন-নূর: ৪৩)

আল্লাহ পানির এ নিয়ামাতকে আকাশ থেকে বর্ষণ করেন যেন মানুষ তার নিজ চোখ দিয়ে তা প্রত্যক্ষ করে, যা তার অন্তরকে আন্দোলিত করবে এবং তাকে আল্লাহর শোক্‌র ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে প্রেরণা যোগাবে। বৃষ্টি ও বৃষ্টির পানি আল্লাহর রুবুবিয়্যাত তথা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার একটি দলীল।

আল্লাহ বলেন, ‘ওরা কি লক্ষ্য করে দেখে না, আমি কিভাবে উর্বর ভূমির ওপর পানি প্রবাহিত করি এবং তার সাহায্যে সেই ভূমি থেকে শস্য ও ফসল বের করে আনি যা থেকে তাদের গৃহপালিত জন্তুগুলো এবং তারা নিজেদের খাবার গ্রহণ করে। এটি কি তারা দেখতে পায় না?’ (আস-সাজদা: ২৭)

পানির মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে তাঁর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা কখনো কি সেই পানি সম্বন্ধে চিন্তা করে দেখেছো যা তোমরা পান করো? মেঘমালা থেকে এ পানি কি তোমরা নিজেরা বর্ষণ করো, না আমি এর বর্ষণকারী?’ (আল-ওয়াকিয়াহ: ৬৮-৬৯)

আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের সময়, পরিমাণ ও কল্যাণকারিতা একটি গায়েব তথা অদৃশ্য বিষয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় কিয়ামাতের সময় আল্লাহর কাছে নির্দিষ্ট। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তিনিই জানেন জরায়ূসমূহে কী আছে।’ (লোকমান: ৩৪)

বৃষ্টির পানি বর্ষণ আল্লাহর উলুহিয়্যাত তথা আল্লাহকে এককভাবে মানারও দলীল। তিনি বলেন, ‘তিনি আকাশ থেকে পানিবর্ষণ করেন, তার সাহায্যে তিনি নানা ধরনের ফলমূল উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেন; অতএব তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না।’ (বাকারাহ: ২২)

পানি পুনরুত্থান ও পরকালের বিষয়েও দলীল। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর একটি নিদর্শন হলো, তুমি যমীনকে দেখতে পাচ্ছো শুষ্ক, অতঃপর তার ওপর আমি যখন পানি বর্ষণ করি তখন তা শস্য-শ্যামল হয়ে স্ফীত হয়ে ওঠে। অবশ্যই যিনি এ মৃত যমীনকে জীবন দান করেন তিনি মৃত মানুষকেও জীবিত করবেন। নিঃসন্দেহে তিনি সর্ববিষয়ের ওপর একক শক্তিমান।’ (হামীম সাজদাহ: ৩৯)

এ পানি দিয়ে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন, ‘লোকেরা যদি সত্য ও সুদৃঢ় পথের ওপর অটল থাকতো, তাহলে আমি তাদেরকে প্রচুর পানি পান করাতাম।’ (জিন: ১৬)

পানি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সম্মান ও মর্যাদার বিষয় যে, তাঁর আরশ পানির ওপর। তিনি বলেন, ‘তাঁর আরশ পানির ওপর।’ (হূদ: ৭)

পানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হন, যখন সে খাবার খেয়ে তাঁর প্রশংসা করে এবং যখন পানি পান করে তাঁর প্রশংসা করে।’ (সহীহ মুসলিম)

আল্লাহ পানিকে সৃষ্টি করেছেন রঙ, স্বাদ ও গন্ধবিহীন করে। রঙ, স্বাদ ও গন্ধহীন একই পানি একই যমীনে বর্ষিত হয়। কিন্তু তার মাধ্যমে উৎপাদিত হয় নানা ধরনের ফসল ও ফল।

কোথাও আঙুরের বাগান, কোথাও খেজুর বাগান আবার কোথাও শস্যক্ষেত। আবার এগুলোর স্বাদে রয়েছে ভিন্নতা। কোনটি মিষ্টি আবার কোনটি তিতা। কোনটি রোগ সৃষ্টি করে আবার কোনটি রোগের প্রতিষেধক।

এ পানি আল্লাহর এক ব্যতিক্রম সৃষ্টি। এটি তরল ও নরম কিন্তু এটি প্রচণ্ড শক্তিতে প্রবাহিত হয়। উচ্চতায় কখনো পাহাড়সম হয়।

এটি আল্লাহর মহান এক সৃষ্টি। যদি এটি আল্লাহর শাস্তিতে পরিণত হয়, তখন আল্লাহ ছাড়া তা থেকে বাঁচানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। নূহ ও তার পুত্র সম্পর্কে কুরআনে বিবৃত হয়েছে—  ‘সে (নূহপুত্র) বললো, আমি কোনো পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেবো এবং তা আমাকে পানি থেকে বাঁচিয়ে দেবে। তিনি (নূহ) বললেন, আজ তো কেউই আল্লাহর শাস্তির আদেশ থেকে কাউকে বাঁচাতে পারবে না। ঢেউ তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। ফলে সে নিমজ্জিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।’ (হূদ: ৪৩)

মানুষের জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা অনেক। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পানি প্রয়োজন। মানুষ পানি পান করে। পানির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে। পানির মাধ্যমে ফসলাদির চাষ করে।

পানি দিয়ে ওযু করে। ওযুর মাধ্যমে পাপ ও ভুলত্রুটি মার্জনা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুসলিম বান্দা যখন ওযু করে তখন তার চেহারা থেকে পাপ বেরিয়ে যায়। এভাবে সকল অঙ্গ থেকে পাপ বের হতে হতে সে পাপমুক্ত হয়ে যায়।’ (সহীহ মুসলিম)

পানির ক্ষেত্রে আল্লাহর শক্তি, ক্ষমতা ও হিকমাতের প্রকাশ হলো— পৃথিবীতে তিনি পরিমাণ মতো পানি দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি পরিমাণ মতো।’

ইমাম ইবনু কাসীর (রাহি.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহ বান্দার চাষবাস, পান ও জীবজন্তুর পানের পরিমাণ অনুযায়ী পানি দিয়েছেন।

আল্লাহ পানির যে পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তার বেশি হলেই তা আযাব বা শাস্তিতে পরিণত হয়।

পানি নামক নিয়ামাতের পূর্ণতা হলো—  তিনি ভূমির অভ্যন্তরে পানি সংরক্ষণ করে রেখেছেন। যেন বান্দা তা সহজে ব্যবহার করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, তারপর আমিই তোমাদেরকে তা পান করাই। তোমরা নিজেরা তো তার এমন কোনো ভাণ্ডার জমা করে রাখোনি।’ (আল-হিজর: ২২)

পানি সবচেয়ে সহজলভ্য আল্লাহর একটি নিয়ামাত। পাথরের ফাঁক দিয়ে তা বেরিয়ে আসে। মাটি খুড়লেই তা পাওয়া যায়। তবে বান্দাহ যদি আল্লাহর অবাধ্যতা করে তখন তিনি পানির স্তর দূরে সরিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছো, তোমাদের পানি যদি কখনো উধাও হয়ে যায়, তাহলে কে তোমাদের জন্য এ পানির প্রবাহধারা পুনরায় বের করে আনবে?’ (আল-মুল্‌ক: ৩০)

আবার এ পানিই আল্লাহর আদেশে আযাব ও শাস্তির কারণ হয়ে যায়। আল্লাহ ও তাঁর বিধান থেকে বিমুখ হওয়ার কারণে আল্লাহ কয়েকটি সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছেন। নূহ (আ.)-এর জাতিকে আল্লাহ পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছেন। ফিরআওন ও তার অনুসারীরা পানিতে ডুবে মারা গিয়েছে। সাবা সম্প্রদায়কে বন্যার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে।

পানি দুনিয়াতে যেমন বড় ধরনের নিয়ামাত, পরকালেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামাত হিসাবে বিবেচিত হবে। জান্নাতের একটি বড় নিয়ামাত হবে মিষ্টি পানির ঝর্ণধারা।

সকল সময়ে সকল স্থানে পানি আল্লাহর বড় ধরনের অনুগ্রহ। আমাদের দায়িত্ব হলো, এ নিয়ামাতের শোকর আদায় করা। এর স্রষ্টা আল্লাহর আনুগত্য করা এবং এর অপচয় না করা।

দ্বিতীয় খুতবা

আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও দানের জন্য তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা।

হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তাঁর সকল বান্দা ও সৃষ্টির জীবিকার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যমীনে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব তাঁর ওপর নয়।’

আকাশ তার দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। যমীন তার সকল কল্যাণকে প্রকাশ করে দিয়েছে। আল্লাহর জীবিকা তাদের জন্য সহজলভ্য যারা যথাযথভাবে তাঁর আনুগত্য করে।

আল্লাহ বলেন, ‘কোনো জনবসতি যদি ঈমান আনে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিবো।’

আল্লাহর নিয়ামাত বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের অন্যতম উপায় হলো—  শোকর ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। আল্লাহ বলেন, যদি তোমরা শোকর করো, তাহলে অবশ্যই আমি বাড়িয়ে দিবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে জেনে রাখো যে, আমার শাস্তি খুবই কঠিন।’

আসুন আমরা আমাদের নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করি। আল্লাহ এ বিষয়ে আদেশ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত পেশ করেন। হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা তাঁর ওপর সালাত ও সালাম পেশ করো।’

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক ‘আলা নাবীয়্যিনা মুহাম্মাদ, ওয়া আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমা‘ঈন।

হে আল্লাহ! চার খলীফা আবু বাকর, উমার, উসমান, আলীসহ সকল সাহাবী, তাবি‘ঈ এবং তাদের নিষ্ঠাবান অনুসারীদের প্রতি তুমি সন্তুষ্ট হও। তোমার অপরিসীম অনুগ্রহে তাদের সাথে আমাদের প্রতিও সন্তুষ্ট হও।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের তুমি শক্তি ও সম্মান দাও। (৩ বার) শির্‌ক ও মুশরিকদের তুমি অপমানিত করো।

হে আল্লাহ! আমাদের এই দেশ ও মুসলিমদের সকল দেশকে নিরাপদ ও শান্তির দেশ বানাও।

হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ দাও, আখিরাতেও কল্যাণ দাও।

হে আল্লাহ! তুমিই আল্লাহ। তুমি মুখাপেক্ষীহীন। আমরা অভাবী।

হে আল্লাহ! আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করো।

হে আল্লাহ! আমরা আমাদের ওপর অবিচার করেছি। তুমি যদি আমাদেরকে ক্ষমা ও দয়া না করো তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।

হে আল্লাহ! আমাদের নেতাকে সংশোধন করে দাও, তাকে এমন কাজ করার তাওফীক দাও যাতে তুমি সন্তুষ্ট। সকল মুসলিম শাসককে তোমার কিতাব অনুযায়ী আমল ও তোমার শরীয়াহ অনুযায়ী শাসন পরিচালনার তাওফীক দাও!

মূল: শাইখ আবদুল মুহসিন আল-কাসিম
অনুবাদ: মুরাদ আশরাফী