রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮

Beta Version

খ্রিস্টধর্মে প্রশ্নের জবাব পাননি, পেয়েছেন ইসলামে

POYGAM.COM
জানুয়ারি ৭, ২০১৮
news-image

জীবন ডেস্ক:: মস্কো: ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ২৩ বছর বয়সী রাশিয়ান নারী কাতিয়া কোতোভা প্রথমবারের মতো মস্কোর ক্যাথেড্রাল মসজিদে প্রবেশ করেন। তার মিশন হচ্ছে ইসলাম গ্রহণ করা।

এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো কাতিয়া কোনো মসজিদের ভিতর পা রাখেন। প্রথমটি ছিল সেই শৈশবেই। সেই সময় তার নানী ৩ বছর বয়সী কাতিয়াকে তাদের স্থানীয় বাশকোরটোস্টানের একটি মসজিদে নিয়ে গিয়েছিলেন।

অতীত সেই স্মৃতি স্মরণ করে কাতিয়া বলেন, ‘আমি এখনো স্পষ্টভাবে সেই দৃশ্যটি স্মরণ করতে পারি। নারীরা উপরের তলায় প্রার্থনা করছিল এবং আমি সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর গ্রাউন্ড ফ্লোরে মুসলিম পুরুষদের নামাজ আদায় দেখছিলাম।’

বাশকোরটোস্টানের অর্ধেকেরও বেশি ‘জাতিগত’ মুসলিম জনগোষ্ঠীর। এর অর্থ হচ্ছে তারা ঐতিহাসিক কারণেই সর্বদা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। আধুনিক রাশিয়ার সোভিয়েত যুগের অতীত নাস্তিকতার আলোকে এটি একটি সাধারণ পরিস্থিতি।

কাতিয়ার বাবা-মা দু’জনেই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। তার বাবা রাশিয়ান এবং ‘জাতিগত’ অর্থডক্স এবং তার মা তাতার জনগোষ্ঠীর ‘জাতিগত’ মুসলিম। তাদের দু’জনের কেউই ধর্মীয় আচারনিষ্ঠ নন।

তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম অনেক বেশি ধর্মীয় মনস্তাত্বিক ছিল। কাতিয়ার মুসলিম নানী তাকে ইসলামিক রীতিনীতির বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেন। অন্যদিকে, তার খ্রিস্টান দাদী তাকে খ্রিস্টান রীতির বিভিন্ন বিষয়ে দীক্ষা দেন। কাতিয়া নামাজের আয়াতসমূহ মুখস্থ বলতে পারেন। যদিও তিনি এসবের অর্থ না বুঝেই মুখস্থ করেছিলেন।

এ সম্পর্কে কাতিয়া বলেন, ‘শৈশবে যখন কোনো কারণে আমি ভয় পেতাম, তখন আমি নামাজের আয়াতসমূহ স্মরণ করতাম।’

শৈশবজুড়ে কাতিয়ার ঘুমের সময় কেটেছে উভয় ধর্মের প্রার্থনার বাণী পড়ে বা শুনে। এটি যে সাধারণ রীতি নয় সেসম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন না।

১৩ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পারেন যে, তিনি যা করেছেন তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়াও, কাতিয়াকে অর্থডক্স খ্রিস্টান হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই তিনি মুসলিম প্রার্থনা পরিত্যাগ করার এবং ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি পরিধান করার সিদ্ধান্ত নেন। কাতিয়ার বড় ভাইও অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ওই দিনগুলোতে খ্রিস্টান বিশ্বাসের রীতি দৃঢ়ভাবে মেনে চলেন।

এসময় কাতিয়ার মনে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়, কিন্তু কেউ তার সেসব প্রশ্নের সুষ্ঠু জবাব দিতে পারত না। উদাহরণস্বরূপ, যিশু বা ঈসা মসিহ কোনো নবী নন, তিনি হলেন স্বয়ং ঈশ্বর—খ্রিস্ট ধর্মের এই ধারণাকে তিনি স্বীকার করতে পারেননি এবং পবিত্র আত্মার উপাসনার মতো অর্থোডক্সের কিছু রীতিনীতির সঙ্গে একমত হননি। কারণ এ সম্পর্কে সন্তোষজনক কোনো জবাব তিনি পাননি।

কিন্তু এসব বিষয় তার চিন্তাধারায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ১৮ বছর বয়সী কাতিয়া মস্কোতে আসেন। একজন আইনজীবী বা একজন তদন্ত কর্মকর্তা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ‘অল রাশিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটি অব জাস্টিস’-এ ভর্তি হন।

একজন মুসলিম তরুণীর সঙ্গে কাতিয়া তার হোস্টেল কক্ষ শেয়ার করেন এবং তারা প্রায়ই ধর্ম সম্পর্কে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হতেন। নিজের পক্ষে উপযুক্ত যুক্তি দাঁড় করাতে কাতিয়া অর্থোডক্স এবং ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। একসময় তিনি ইসলামকে জীবন বিধান হিসাবে গ্রহণের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে থাকেন।

স্নাতক শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে কাতিয়া ‘তদন্ত কমিটি’ বিষয়ে একটি ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন এবং সেখানে কাজ শুরু করার আগেই কাতিয়া ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে সবাইকে অবাক করে দেন।

হিজাব পরে তদন্ত কমিটিতে কাজ করার বিষয়টি প্রশ্নের বাইরে ছিল না। তাই কাতিয়া তার ভবিষ্যতের অপশনগুলো বিবেচনা করার জন্য একটি ছোট বিরতির সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল তার জীবনের কঠিন মুহূর্ত।

বর্তমানে তিনি দাগেস্তানের একটি হালাল ক্যাফেতে একজন ওয়েট্রেস হিসাবে কাজ করছেন। দাগেস্তানে রাশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। বাড়ি ফিরে যাবেন কিনা— এমন প্রশ্নে তিনি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান।

কাতিয়া বলেন, ‘মস্কোতে আমি নিরাপদ বোধ করি। হিজাব পরিধান নিয়ে আমি ভীত নই। এটা ঠিক যে হিজাবের কারণে প্রায়ই আমাকে মৌখিক অপব্যবহারের শিকার হতে হচ্ছে, তবে কোনো ধরনের শারীরিক আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। আপাতত মস্কো ছেড়ে যাবার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই। ভবিষ্যতে যদি মস্কো ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেই, তবে আমি তাতারস্থানে যেতে চাই; যেখানে অনেক বেশি মুসলমানের বাস। সেখানে অনেক বেশি হিজাবি নারী এবং অনেক হালাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে।’

তিনি দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী স্বাধীন নারীদের গল্পে অনুপ্রাণিত হন। আলাপকালে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আইরিনা সেন্ডলারের কথা বলেন। আইরিনা সেন্ডলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ওয়ারশ ঘেটো’ থেকে প্রায় ২,৫০০ জন শিশুকে রক্ষা করেন।

এছাড়াও, প্রথম নারী মহাকাশচারী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভালেন্তিনা তেরেশকোভা এবং পাকিস্তানি তরুণী মানবাধিকার কর্মী মালালা ইউসুফজাই-এর গল্প তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। নারী ও শিশুদের সাহায্য এবং পরিবারের সঙ্গে কাজ করার জন্য অদূর ভবিষ্যতে তিনি মানবাধিকার কর্মকাণ্ডে ফিরে যাবার আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘রুশ মানসিকতা বলে যে, প্রকাশ্যে আপনার নোংরা লিনেন কাপড় ধোয়া উচিত নয়। এর অর্থ হচ্ছে— পারিবারিক সহিংসতাসহ পারিবারিক সমস্যাসমূহ যা লোকজন প্রকাশ্যে বা অকপটভাবে বলতে চায় না। এটা নারীদের জন্য একটি সমস্যা। আমি বিশ্বাস করি পারিবারিক সংঘাতের বিষয়টি উভয় দিকেই জড়িত থাকা উচিত।’

কাতিয়া বলছেন যে, ইসলামে নারীরা মুক্ত। গৎবাঁধা চিন্তাধারা মুসলিম নারীদেরকে দুনিয়ার সমৃদ্ধি থেকে আলাদা করে রেখেছে। তাদেরকে বাড়িতে পাখির খাঁচার মতো আবদ্ধ করে রাখছে। আর এটি করছে প্রথমত তাদের বাবা-মা এবং তারপর তাদের স্বামীরা।

তিনি বলেন, ‘ইসলাম অনুযায়ী, একজন স্ত্রী যদি চায় তবে, সে বাইরে কাজ করতে পারে এবং তা অবশ্যই হালালের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। সেক্ষেত্রে তার স্বামী তাকে সমর্থন করতে বাধ্য। আমি মনে করি একজন নারীর উদ্দেশ্য হল তার পরিবারে শান্তি আনয়ন করা।’

এই মুহূর্তে কাতিয়ার প্রধান কাজটি হচ্ছে তার পরিবারকে শান্ত করা। তার ইসলামে ধর্মান্তর এবং হিজাব পরিধান করার সিদ্ধান্তে তার বাবা-মা আনন্দিত নয় এবং এজন্য কাতিয়াকে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করতে হতে পারে বলে তাদের ভয়।

তিনি বলেন, ‘ইসলাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমার বাবা-মা অবগত আছেন। আমার রক্ষণশীল পোশাক পরিধান এবং তাতার নারীদের মতো হিজাব পরিধান— এর সবকিছুই তারা জানেন।’

কাতিয়ার বাবা-মা বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। ছুটিতে তিনি তার বাবা-মা’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করছেন।

সূত্র: রাশিয়া বিয়ন্ড