রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮

Beta Version

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে বিয়ে এবং জীবনের প্রতিচ্ছবি

POYGAM.COM
ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭
news-image

জীবন যেমন ডেস্ক: কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ১১ই ডিসেম্বরের দিনটি ছিল আর দশটি সাধারণ দিনের মতোই। তবে রোহিঙ্গা সাদ্দাম হোসাইন (২৩) এবং শফিকা বেগমের (১৮) জন্য দিনটি একেবারেই আলাদা। এ দিন তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। তাদের বিয়ের দিন।

২৫শে আগস্ট থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হওয়া নারকীয় অভিযানের জেরে সাদ্দাম এবং শফিকার মতো অসংখ্য রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। নিজ মাতৃভূমি, ঘরবাড়ি হারিয়ে আজ তারা বাস্তুচ্যুত, আশ্রিত।

তবে জীবন থেমে নেই। এর মধ্যেই রোহিঙ্গারা বেঁচে থাকার সংগ্রামে রত। জীবনের কথা ভাবছেন। ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন। যেমনটি ভেবেছেন সাদ্দাম এবং শফিকা। ১১ই ডিসেম্বর তারা কক্সবাজারের কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। চমকপ্রদ ব্যাপারটি হলো, এটি প্রেমের বিয়ে! যে প্রেমের সূচনা মিয়ানমার থেকেই।

সাদ্দাম এবং শফিকা দু’জনেই রাখাইনের মংডু শহরের খা মাউন শিইক গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের কাছে ওই গ্রামটি ফয়রার বাজার নামে পরিচিত। একই গ্রামের বাসিন্দা এই দুই তরুণ-তরুণীর মন দেয়া নেয়া সেখান থেকেই। তারা চেয়েছিলেন মিয়ানমারে একটি সুখের সংসার পাতবেন। দু’চোখ ভরা ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্নে। তখনো তারা জানতেন না যে অচিরেই তাদের ওই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নেবে।

২৫শে আগস্টের হামলার পর থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। অবশ্য পূর্বেও যে তারা খুব সম্মানের সঙ্গে বেঁচে ছিলেন, তা নয়। তবে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নারকীয় অভিযান শুরু হবার পর থেকে রোহিঙ্গাদের জীবন যেন পরিণত হয়েছে ঠুনকো ঝরাপাতায়। যা পায়ে দলে চূর্ণ করে দিতে একবিন্দু বাঁধছে না মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিংবা বৌদ্ধ উগ্রপন্থিদের। সেই হামলার জেরে জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষমদের মধ্যে ছিলেন সাদ্দাম এবং শফিকাও।

সাদ্দামের পরিবার মিয়ানমারে দোকানদারি পেশায় জড়িত। সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় তার পুরো পরিবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সাদ্দাম জানিয়েছেন, এ সময় তার শফিকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে ভাগ্যের ফেরে সপ্তাহ দুয়েক পরে তিনি তার ভালোবাসা শফিকাকে কক্সবাজারের কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে খুঁজে পান। তার পর পার হয়েছে তিন মাস। ভালোবাসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আর ঝুঁকি নিতে চাননি কুতুপালংয়ে আশ্রিত এই প্রেমিক যুগল। ১১ই ডিসেম্বর তারা বাঁধা পড়েন বিয়ের বন্ধনে।

ওই দিন দেখা যায়, বাঁশ এবং ত্রিপলের তৈরি দুটি পৃথক তাঁবুতে বর-বধূ সেজে বসে আছেন সাদ্দাম এবং শফিকা। লাল কাপড়ে বউ সেজেছেন শফিকা। শার্টের ওপর আচকানের মতো সাদা কাপড় জড়িয়ে বর সেজেছেন সাদ্দাম। কাজী এসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সমপন্ন করার পরে শুরু হয় ভূরিভোজ। অতিথিদের আপ্যায়ন করতে জবাই করা হয় একটি গরু। কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা এই দুই রোহিঙ্গা শত বিপত্তির পরও ভুলে যাননি একে-অপরকে। ভালোবাসাকে বিয়ের পরিণতি দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎটা হাত ধরাধরি করে শামাল দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। যদিও এই নবদমপতির সামনের পথ চলাটা বিপদশঙ্কুল। তারা কি আদৌ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবেন কিনা, তা অনিশ্চিত। বাংলাদেশেই থেকে যেতে হবে কিনা, আর হলেই বা কিভাবে, কেমন করে— তাও অনিশ্চিত।

তবুও জীবন থেমে থাকে না। নানান অনিশ্চয়তার দোলাচালে দুলতে থাকা এই দুই তরুণ-তরুণী ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার বোঝা মাথায় নিয়েই শুরু করেছেন জীবনের নতুন অধ্যায়। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে পাশে নিয়ে সাদ্দাম বলছিলেন, আমরা সন্তান নিতে বিলম্ব করবো। সহসাই নেবো না। কারণ জানাতে গিয়ে সাদ্দাম বলেন, আমাদের আগে নিশ্চিত হতে হবে আমরা কি এখানেই (বাংলাদেশে) থাকছি নাকি মিয়ানমারে ফেরত যাচ্ছি। যদি মিয়ানমারে ফিরে যেতেই হয়, তবে তখনই যাবো, যখন মিয়ানমার আমাদের পূর্ণ নাগরিক স্বীকৃতি দেবে। আর তা না হলে মিয়নমারে ফিরে যেতে চাই না আমরা।

[রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে]