রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮

Beta Version

লিভার সিরোসিস কতটা মারাত্মক? করণীয় কী

POYGAM.COM
ডিসেম্বর ৯, ২০১৭
news-image

স্বাস্থ্যকথা ডেস্ক: লিভার সিরোসিস একটি জটিল সমস্যা। এ রোগ খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে—এটা প্রায় সর্বজনবিদিত। তবে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে লিভার সিরোসিস থেকে অনেকটা দূরে থাকা যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে লিভার সিরোসিসের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকারের দিকগুলো তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: লিভার সিরোসিস বলতে আমরা কী বুঝি?

উত্তর: লিভারে যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রদাহ হয় তাহলে এর কারণে লিভারে যে ফাইব্রোসিস এবং নুডিউল বা গুটি গুটি জিনিস তৈরি হয়, এটিকেই আমরা লিভার সিরোসিস বলি।

প্রশ্ন: লিভার সিরোসিসের কারণ কী?

উত্তর: সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে লিভার সিরোসিস হয়। কিছু ভাইরাস যেমন হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি-এর কারণে প্রধানত লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে। এ ছাড়া কিছু নন ভাইরাল কারণে এ সমস্যা হতে পারে। যেমন: কারো লিভারের চর্বিজনিত প্রদাহের কারণে এ  সমস্যা হতে পারে।

এ ছাড়া কিছু জন্মগত অসুখের কারণেও এই সমস্যা হয়ে থাকে। যেমন : ওইলসন ডিজিজ, হেমোক্রোমেটাসিস ইত্যাদি।

অ্যালকোহলজনিত কারণেও লিভার সিরোসিস হতে পারে। তবে আমাদের দেশে কম দেখা যায়। পশ্চিমা বিশ্বে অনেক বেশি দেখা যায়।

প্রশ্ন: এর কী কী লক্ষণ আছে?

উত্তর: একজন ব্যক্তি যদি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন তবে অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে। একটা পর্যায়ের পর তার কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: তার মানে রোগটি যখন কিছুটা এগিয়ে যায় তখন লক্ষণ দেখা দেয়। এর আগে কি বোঝার উপায় নেই?

উত্তর: যদি তার কখনো কোনো জন্ডিস দেখা দেয়, সেই সময় তার যদি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তাহলে লিভার সিরোসিস ধরা পড়তে পারে।

প্রশ্ন: লক্ষণ হিসেবে যখন প্রকাশ পায়, তখন কীভাবে প্রকাশ পায়?

উত্তর: যখন এটি একটি পর্যায় অতিক্রম করে, যেটাকে আমরা ডিকমপেনসেটেট বলি (এর আগ পর্যন্ত হচ্ছে কমপেনসেটেট) তখন দেখা যায়, কারো পেটে পানি চলে আসে। তার কথাবার্তার মধ্যে কোনো এলোমেলো ভাব দেখা দিচ্ছে। কারো কারো খাদ্যনালির শিরা-উপশিরা থেকে রক্তপাত হলে রক্তবমি হতে পারে। এসব হচ্ছে সিরোসিসের শেষ স্তর।

প্রশ্ন: এই যে কমপেনসেটেট এবং ডিকমপেনসেটেট এই দুই ধরনের লিভার সিরোসিসের কথা বললেন। এ দুটোর মধ্যে কীভাবে পার্থক্য করা হয়?

উত্তর: লক্ষণগুলো প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কমপেনসেটেট থাকে। লিভারের কিছু কিছু কাজ রয়েছে। যেমন: লিভার আমাদের শরীরের জন্য আমিষ তৈরি করে। আমরা যেসব ওষুধ খেয়ে থাকি সেগুলো শরীর থেকে বের করে দেয়। যে কোনো ধরনের টক্সিং, ছোট ছোট বিষক্রিয়া থাকে, এগুলো লিভার মুক্ত করে দেয়। এই জাতীয় কাজগুলো যখন লিভার মোটামুটি করতে পারে সেটাকে আমরা কমপেনসেটেট বলি। এ অবস্থায় রোগী চলাফেরা, কাজকর্ম হয়তো মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে করতে পারে।

তবে এর পরবর্তী পর্যায়ে যখন চলে যায়, লিভার আর ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এর ফলে শরীরে সমস্যাটির লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়, তখন ডিকমপেনসেটেট বলা হয়।

প্রশ্ন: চিকিৎসাও কি নির্ভর করে এই দুই প্রকারের ওপর? কোন চিকিৎসা কখন দিচ্ছেন সেটি নির্ভর করে কীভাবে?

উত্তর: যদি হেপাটাইটিস বি বা হেপাটাইটিস সি-এর কারণে তার সিরোসিস হয়ে থাকে। তাহলে যে চিকিৎসা আমরা হেপাটাইটিস সির জন্য দিয়ে থাকি সেটি কমপেনসেটেট স্তর পর্যন্ত সাধারণত দেওয়া হয়। ডিকমপেনসেটেট স্তরে চলে গেলে আর দেওয়া হয় না।

আর হেপাটাইটিস বি-এর ক্ষেত্রে কমপেনসেটেট এবং ডিকমপেনসেটেট দুটো ক্ষেত্রেই চিকিৎসা আছে। তবে যেটা ইনজেকটেবল চিকিৎসা সেটা কমপেনসেটেট স্তর পর্যন্ত দেওয়া হয়। আর পরবর্তী কালে ডিকমপেনসেটেট আরো চিকিৎসা দেওয়া হয় তবে সেটি লক্ষণ অনুসারে।

প্রশ্ন: কী কী ধরনের সমস্যা নিয়ে রোগীরা ডাক্তারের কাছে যান? কী ধরনের জটিলতা হয় তাদের?

উত্তর: লিভার সম্পর্কিত কোনো সমস্যায় যদি রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখা যায় লিভারের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তখন চিকিৎসকেরা সন্দেহ করেন রোগীর লিভার সিরোসিস থাকতে পারে। তখন আবার কিছু রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এভাবে একটি রোগ ধরা পড়ে। যদি কোনো কারণে রোগটি ধরা না পড়ে তখন অনেক জটিল অবস্থা তৈরি হয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে রোগটি হয়তো তখন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে।

লিভার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগীর পেটে পানি চলে আসতে পারে। এর সাথে পায়ে পানি চলে আসে। জন্ডিস থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। এ ছাড়া কারো যদি অনেক পরিমাণ রক্তবমি হয় বা কালো পায়খানা হয়। তখন বিষয়টি জটিল। এসব সমস্যায় রোগী সাধারণত ডাক্তারের কাছে যান।

প্রশ্ন: এই জটিলতায় যাতে যেতে না হয়, সে ক্ষেত্রে আপনার  পরামর্শ কী থাকে?

উত্তর: যেসব কারণে লিভার সিরোসিস হয়, সেগুলো যদি আগেই ধরা পড়ে, তাহলে অবশ্যই তাকে সঠিকভাবে চিকিৎসা করতে হবে; যাতে ভবিষ্যতে তার লিভার সিরোসিস না দেখা দেয়। আসলে প্রতিরোধই মূল চিকিৎসা। সিরোসিস একবার হয়ে গেলে তারপর যদি চিকিৎসা করা হয়, তারপরও শরীর পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। সুতরাং কারণ যদি ধরা পড়ে এর সঠিক চিকিৎসা করতে হবে।

প্রশ্ন: এ রোগে কোনো সার্জারি করা হয় কি না?

উত্তর: লিভার সিরোসিস হয়েছে এমন কেউ যখন প্রাথমিক অবস্থা থেকে কিছুটা খারাপ অবস্থায় আসে। অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ে যায় তখন লিভার প্রতিস্থাপনের কিছু বিষয় থাকে। লিভার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ডিকমপেনসেটেট অবস্থায় চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে এই লিভার প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্লেন্ট) কীভাবে হচ্ছে? আপনারা কতটুকু সফল হচ্ছেন?

উত্তর: বাংলাদেশে এরই মধ্যেই কয়েকটি লিভার প্রতিস্থাপন সার্জারি হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে কিছু সমস্যার কারণে আমরা এই সার্জারি করতে পারছি না। ভবিষ্যতে আশা করছি আবার এটি শুরু হবে।

প্রশ্ন: কী কী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে লিভার সিরোসিস হওয়া থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারব?

উত্তর: লিভার সিরোসিস চিকিৎসার মূল বিষয় হচ্ছে প্রতিরোধ। যেসব কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে, বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-এর যেহেতু প্রতিষেধক আছে। তাই আমাদের উচিত প্রত্যেকেরই এই প্রতিষেধক নেওয়া। পাশাপাশি কিছু সচেতনতা জরুরি। দূষিত কোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে অপারেশন, কোনো দূষিত রক্ত পরিসঞ্চালন প্রতিরোধ করা। পাশাপাশি সেলুনে সেভ করাসহ যেকোনো কাটাকাটি বা সেলাইয়ের সময় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। রোগীদের কাছ থেকে সরাসরি এই ভাইরাস সংক্রমিত হয় না।

প্রশ্ন: জটিলতা আসলে কী হতে পারে?

উত্তর: রক্তপাত হওয়া, বমি হওয়া, পেটে পানি চলে আসা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া— এগুলো এ রোগের জটিলতা। এ জাতীয় সমস্যা হলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

ডা. ফারুক আহম্মদ
সহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

সৌজন্য: এনটিভি