সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা

POYGAM.COM
ডিসেম্বর ৩, ২০১৭
news-image

মুমিনরা নিজের জীবন দিয়ে হলেও নবীর প্রতি ভালোবাসা সমুন্নত রাখে। রাসূলের প্রতি যদি ভালোবাসা না থাকে, তবে তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও নেতৃত্ব পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়া ও বাস্তবায়ন কখনই সম্ভব না। সবচেয়ে বড় কথা, রাসূলের প্রতি ভালোবাসা কোন সাধারণ বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানের অপরিহার্য অংশ। একজন বান্দা পরিপূর্ণ ঈমানের স্বাদ পাবে তখনই, যখন তার মাঝে রাসূলের প্রতি ভালোবাসা বিদ্যমান থাকবে।

আনাস ইবন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

তিনটি জিনিস এমন, যার মধ্যে সেগুলো পাওয়া যাবে, সে ঈমানের স্বাদ পাবে।

১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছু থেকে প্রিয় হওয়া;

২. কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং

৩. জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে যেভাবে অপছন্দ করে, তেমনি পুনরায় কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করাকে অপছন্দ করে। [বুখারী]

সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউই ঈমানদার হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তার নিজ পিতা, পুত্র ও অন্যান্য লোক অপেক্ষা আমার প্রতি অধিক ভালোবাসা পোষণ না করবে। [বুখারী ও মুসলিম]

তিনি আরও বলেছেন, মানুষ যতক্ষণ না আমার সাথে তার স্ত্রী-পুত্র এবং অন্যান্য যাবতীয় ধনসম্পত্তি অপেক্ষা অধিক ভালোবাসা জন্মাবে, ততক্ষণ তারা ঈমানদার হতে পারবে না। (মুসলিম)

ইমাম বুখারী (রাহি.) বর্ণনা করেছেন। উমার (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি নিজের প্রাণ ব্যাতীত অন্যান্য সকল বস্তু থেকে আপনার প্রতি বেশি মহব্বত রাখি অর্থাৎ, নিজের প্রাণের যতটুকূ মহব্বত অনুভব করি, আপনার জন্য ততটুকু মহব্বত অনুভব করি না। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই পবিত্র সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, কেউই প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজের প্রাণ অপেক্ষাও আমার সাথে অধিক ভলোবাসা না রাখবে। উমার (রা.) কিছুক্ষণ চিন্তা করে অন্তরকে ঠিক করে বললেন, এখন আপনার প্রতি ভালোবাসা নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি অনুভব করছি। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উমার! এখন তুমি পূর্ণ ঈমানদার হলে।

হাদীসটির গূঢ়ার্থ  অনুসারে উমার (রা.)-র কথাটা এভাবে বুঝে নেয়া যায় যে, প্রথমে উমার (রা.) চিন্তা না করেই ভেবেছিলেন যে, নিজের কষ্টে যেমন কষ্ট লাগে, অন্যের কষ্টে তেমন কষ্ট লাগে না। অতএব বুঝা যায় যে, নিজের জীবনকেই বেশি ভালোবাসেন। তারপর চিন্তা করে দেখলেন যে, যদি জীবন দেয়ার সময় আসে, তবে নিশ্চয় মুসলমান মাত্রই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিতে হবে। একইভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দীনের জন্যও প্রাণ দিতে কোন মুসলমানই দ্বিধাবোধ করবে না। এ থেকে বোঝা যায় যে, নবীজীর প্রতি নিজের জীবন অপেক্ষাও বেশি মুহাব্বাত পোষণ করতে হবে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—

‘বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান যাকে তোমরা পছন্দ কর, আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার নিজ ফয়সালা প্রকাশ করেন। আর আল্লাহ অবাধ্যদের পথ প্রদর্শন করেন না।’ (আত-তাওবা: ২৪)

এখানে, ফয়সালা দ্বারা শাস্তির ফয়সালা বোঝানো হয়েছে। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, অর্থ-সম্পদ, ঘর-বাড়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই আল্লাহর নিয়ামাত। তবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না এইগুলো আল্লাহ তা‘লার হুকুম পালনে বাধা হবে। যদি বাধা হয়ে যায় তবে এসব জিনিসই মানুষের জন্য আযাবে পরিণত হবে। তারা সঠিক পথ ও আল্লাহর হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এরূপ অবস্থা থেকে হেফাজত করুন।

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, একদিন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিয়ামত কখন হবে?’ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি কিয়ামতের জন্য কী সঞ্চয় করেছ?’ (যে কিয়ামত আসার ব্যাপারে এতো আগ্রহ) লোকটি বলল, ‘আমি এর জন্য বহু নামায রোযার সম্বল তো করতে পারি নাই, কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে আমার গভীর ভালোবাসা আছে।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যে যার সাথে ভালোবাসা রাখবে, কিয়ামতের দিন সে তার সাথে থকবে।’ অতএব তুমি আমার সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সাথে সে আল্লাহরও সাথে। আনাস (রা.) বললেন, ‘আমি মুসলিমদের ঈমান আনার পর এত খুশি হতে আর দেখিনি। [বুখারী ও মুসলিম]

এই হাদীসে কত বড় সুসংবাদ দেয়া হয়েছে! কেউ যদি অনেক ইবাদত-বন্দেগি নাও করে থাকে, তবু শুধু আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণেও এত উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে।

আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুপম চারিত্রিক সৌন্দর্য, সত্যবাদিতা ও মহত্বের নিদর্শন হিসেবে বিশ্ব মানবতার কল্যাণের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। নবীর প্রতি ভালোবাসার দাবি হচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে তাঁর প্রতি আনুগত্যের তথা তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ এবং আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ইত্যাদি। তিনি মানুষের প্রতি সবচেয়ে বড় ইহসানকারী।

মুসলমানদের জন্য বড়ই লজ্জার বিষয়, নবীকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে অনুসরণ করা। বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে অবাক হয়ে যেতে হয়। আজকে নবীর প্রতিটি সুন্নাহকে নিজের মাঝে ধারণ করা দূরে থাক, সুন্নাহ নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করতেও আমাদের বাধে না। রাসূলের প্রতি সহস্র উপহাস ও অপমানেও আমাদের হৃদয়ে একটুও রক্তক্ষরণ হয় না।

অথচ তিনি মহান আল্লাহর সেই মহান রাসূল, যিনি সারারাত উম্মাতের মাগফিরাতের জন্য ক্রন্দনরত অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। যিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যাকুল ছিলেন উম্মাতের মুক্তির চিন্তায়।

আমিন উদ্দিন