সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিরই হার্ট অ্যাটাক

POYGAM.COM
ডিসেম্বর ৩, ২০১৭
news-image

ডা. জন ওয়ার্নার

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এএইচএ) প্রেসিডেন্ট এবং নামডাকওয়ালা কার্ডিওলজিস্ট ৫২ বছর বয়সী ডা. জন ওয়ার্নারের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে! নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংগঠনের বার্ষিক সম্মেলনে ভাষণ দেয়ার সময় হঠাৎ এই ঘটনা ঘটে। এই নিয়ে তোলপাড় চলছে বিভিন্ন দেশের হার্টের চিকিৎসকদের মধ্যে। ঘটনার পরপরই ডা. ওয়ার্নারের ধমনিতে স্টেন্ট বসাতে হয়েছে। তিনি অনেকটাই ভালো আছেন।

তবে পৃথিবীজুড়ে হার্টের চিকিৎসার গাইডলাইন যারা ঠিক করে, চিকিৎসকেরা হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে বলতে গিয়ে কথায় কথায় যে সংগঠনের সমীক্ষার কথা সভা-সম্মেলনে উল্লেখ করেন, তামাম দুনিয়ার হার্টের চিকিৎসক তথা কার্ডিওলজিস্টদের একটা বড় অংশ যার নাম শুনলেই সম্ভ্রমে মাথা নিচু করেন— সেই সংগঠনের শীর্ষকর্তার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় বিতর্ক শুরু হয়েছে।

হার্ট অ্যাটাক যে কারো যেকোনো সময় হতে পারে। কতগুলি ঝুঁকি থাকলে, সেই আশঙ্কা আরো বেড়ে যায়। সে দিক থেকে বলতে গেলে ডা. ওয়ার্নারও রক্ত মাংসের মানুষ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বলে তার হার্ট অ্যাটাক হবে না, সেই মাথায় দিব্যি কেউ দেয়নি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোড়িত চিকিৎসক সমাজ। মুখে না স্বীকার করলেও বহু চিকিৎসকই ভালো বোঝেন, তারা নিজেরা যতদিন না পর্যন্ত রোগীদের কাছে উদাহরণস্বরূপ হয়ে উঠবেন, যতই নাম আর পয়সা করুন না কেন, রোগীদের কেউ কেউ ঠিক তার জীবনশৈীল দেখে মুখ টিপে হাসবেন। পাঁচতারা হোটেলের কনফারেন্সে গিয়ে মাটন আর মিষ্টির লম্বা লাইনে দাঁড়ানো কার্ডিওলজিস্টদের কথা রোগীরা জানলে, হার্ট বাঁচাতে তাদের পরামর্শের কথা মন দিয়ে শুনবেন? বোধহয় নয়। একইভাবে, যে সংগঠন হার্ট সুস্থ রাখতে তামাম বিশ্বকে পরামর্শের নানা কথা শোনায়, তাদেরই শীর্ষকর্তার হার্ট অ্যাটাক হলে, বিতর্ক উঠতে বাধ্য।

ডালাসের ইউটি সাউথ ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন হসপিটালের সিইও ডা. ওয়ার্নার। ক্যালিফোর্নিয়ায় সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার সময় এই ঘটনা ঘটে। শুনলে অনেকে অবাক হতে পারেন, হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঠিক আগে নিজের ভাষণে হার্টের অসুখের বিষয়ে তিনি নিজে যে হাই রিস্ক গ্রুপে রয়েছেন, সেকথা ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিয়েছিলেন ডা. ওয়ার্নার।

ভাষণে বলেছিলেন, হার্টের অসুখের জন্য আমাদের পরিবারে কোনো বয়স্ক সদস্য আর জীবিত নেই। আমাদের ‘ফ্যামিলি ট্রি’ কেটে ছোট করে দিয়েছে হার্ট ডিজিজ। আমি জানি, শুধু আমেরিকা নয়, এ কথা পৃথিবীর অন্যান্য বহু পরিবারের ক্ষেত্রেই সত্যি। আমি স্বপ্ন দেখি, সেই পৃথিবীর যেখানে আমার পরিবারের উদাহরণ সত্যি হবে না। বরং, যেখানে ছোট ছোট বাচ্চা দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গ পেয়ে আনন্দে বেড়ে উঠবে। তাদের সঙ্গে হাঁটবে, মাছ ধরবে..।

দুর্ভাগ্যক্রমে এমন একটি উদ্দীপক ভাষণ দেয়ার পরই বুকে ব্যথা নিয়ে লুটিয়ে পড়েন ওয়ার্নার। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে স্টেন্টিং করতে হয়।

চিকিৎসক মহল সূত্রের খবর, এই নিয়ে শোরগোল দানা বাঁধার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, হার্ট সুস্থ রাখতে সম্প্রতি বাজারে ছাড়া এএইচএ’র নানা বিতর্কিত গাইডলাইন। যার মধ্যে ভুট্টার দানা, সোয়াবিন ইত্যাদিকে হার্ট ভালো রাখার জন্য খেতে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মাখন এবং নারকেল তেল বর্জন করে মার্জারিন এবং ভেজিটেবল অয়েল খেতেও বলা হয়েছে। ডা. ওয়ার্নার শুধু এএইচএ’র শীর্ষকর্তাই নন, অক্ষরে অক্ষরে এএইচএ’র স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ মেনে চলতেন। এই বিতর্কিত ডায়েটই কি তার বিপদ ডেকে আনল? এই নিয়েও বিতর্ক দানা বেঁধেছে।

যদিও ভারতের হার্টের চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন কার্ডিওলজিক্যাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার (সিএসআই)-এর সাবেক সর্বভারতীয় সভাপতি ডা. প্রদীপকুমার দেব বলেন, কতগুলো বিষয় এ ব্যাপারে স্পষ্ট করা উচিত। এক, হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির হার্ট অ্যাটাক হবে না— এই ধারণা শিশুসুলভ, অবাস্তব। দুই, ডাক্তারদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি। কেরলের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের গড় আয়ু যেখানে ৮২, ডাক্তারদের ৬৪। তিন, ঠিকই এএইচএ’র ডায়েট নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। একথা বলতে দ্বিধা নেই, অনেক সময়ই সংগঠনের সুপারিশ করা ডায়েটের সঙ্গে শুধু শরীর-স্বাস্থ্য নয়, সেই দেশের কর্পোরেটদের স্বার্থও জড়িয়ে থাকে।

সিএসআই-এর সাবেক সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ডা. অরূপ দাশ বিশ্বাস বলেন, হার্টের অসুখের ক্ষেত্রে সমস্ত ধরনের নিয়ম মেনে চললেও অ্যাটাক হবে না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন না। মনে রাখবেন, চেনা ঝুঁকিগুলো বাদ দিলেও অন্তত ৬০ শতাংশ হার্ট অ্যাটাকের কারণ অজানা (রেসিডুয়াল রিস্ক-এর জন্য)। আর জিনগত কারণ তো আছেই। ডা. ওয়ার্নারের পরিবারের হার্টের অসুখের ইতিহাস কেমন ছিল, সেকথা তো উনি নিজেই বলেছেন।

সূত্র: বর্তমান