সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

সৌদি-ইসরাইল ঘনিষ্ঠতা হতে পারে বিপজ্জনক

POYGAM.COM
নভেম্বর ২৯, ২০১৭
news-image

রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং আরব অঞ্চলে ইরানি প্রভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শনের লক্ষ্যে সৌদি যুবরাজ বেশ কয়েকটি অলঙ্ঘনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে— রাজপরিবারের বেশ কিছু সদস্য, অর্থাৎ প্রিন্স ও মন্ত্রীদের গ্রেফতার এবং ইসরাইলের সাথে আংশিক হলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া।

কিন্তু প্রথমে ফিলিস্তিন সঙ্কটের একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধানে পৌঁছা ছাড়া আরবদের ইসরাইল বয়কটের অবসান ঘটানোর বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হলে তা ফিলিস্তিন এবং সৌদি আরব, উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হবে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রধান গাদি ইজেনকোট একটি সৌদি নিউজ আউটলেটের সাথে এ যাবৎকালের প্রথম সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরাইল ইরানের ব্যাপারে সৌদি আরবের সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করতে প্রস্তুত। এ ছাড়া এবারই প্রথম, গত সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিবার পরিষদে সিরিয়ার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সাথে ইসরাইল যৌথভাবে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। অধিকন্তু, ইসরাইলি যোগাযোগমন্ত্রী আইয়ুব কারা সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শেখকে ইসরাইল সফরের জন্য উষ্ণ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ইসরাইলি মন্ত্রী জানান, ইসরাইল সম্পর্কে বন্ধুত্বপূর্ণ মন্তব্য করার জন্য সৌদি গ্র্যান্ড মুফতিকে দেশটি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য গৃহীত পদক্ষেপকে ‘বৈধতা’ দেয়ার জন্য সৌদি আরব গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে রিয়াদে ডেকে পাঠায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ উপদেষ্টা জারড কুশনার যে শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছেন, তা গ্রহণের ব্যাপারে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে বোঝানোর জন্য তাকে সৌদি আরব তলব করেছে। ওই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে, সৌদি-ইসরাইল একযোগে কাজ করা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে অন্যান্য স্বাভাবিক ব্যবস্থার সাথে- ইসরাইলি যাত্রীবাহী বিমানের ওভারফ্লাইট, ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা এবং সৌদি আরব, মিসর, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। ‘এম বি এস’ বা যুবরাজ তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে গেলে ইসলামি বিশ্বে সৌদি আরবের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সৌদি-ইসরাইলি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মাহমুদ আব্বাসের সহযোগিতা অত্যাবশ্যক। এটা ছাড়া সৌদি তৎপরতাকে ফিলিস্তিন বিষয়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখা হবে। রিয়াদে আব্বাসের সফরের সময় সত্যিকার অর্থে কী ঘটেছে, সে ব্যাপারে বেশি কিছু প্রকাশ না পেলেও কিছু রিপোর্ট থেকে জানা গেছে- কুশনার যে পরিকল্পনাই উপস্থাপন করুক না কেন, সৌদি নেতৃত্ব তা মেনে নিতে অথবা পদত্যাগ করার জন্য মাহমুদ আব্বাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। অদূর ভবিষ্যতে কুশনারের পরিকল্পনা যখন প্রকাশ করা হবে, তখন সম্ভব মাহমুদ আব্বাসের ওপর অকল্পনীয় চাপ সৃষ্টি করা হবে। উল্লেখ্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য সৌদি ও মার্কিন আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

যা হোক না কেন, কুশনারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে- তিনি ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রকল্পের ব্যাপারে বাস্তবে ন্যূনতম ন্যায়বিচারও করতে পারবেন না। পরিকল্পনায় সৌদি আরবের বয়কটের অবসান এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য আর্থিক সহায়তা, বন্দিমুক্তি এবং বিশাল বসতি ব্লকের বাইরে নীরবে বসতি স্থাপনের আংশিক কার্যক্রম বন্ধ করার মতো শুধু কিছু কৌশলগত অর্জনের প্রস্তাব দেয়া হতে পারে।

২০০২ সালে সৌদি পৃষ্ঠপোষকতায় যে শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল বাস্তবে কুশনারের চুক্তি বা পরিকল্পনায় তার ভগ্নাংশ বাস্তবায়নের কথা থাকতে পারে। ২০০২ সালের আরব শান্তি পরিকল্পনায়, ১৯৬৭ সালে ইসরাইল অধিকৃত আরব ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলের পূর্ণ প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইসরাইলের সাথে পরিপূর্ণভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। আব্বাসকে এ চুক্তি বা পরিকল্পনা মেনে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সৌদি নেতৃত্ব নিজেদের উদ্যোগকেই হেয় করেছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে জোট গঠনের বিনিময়ে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক আংশিকভাবে স্বাভাবিক করার জন্য চাপ দিচ্ছে।

অধিকন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সৌদি পরিকল্পনা সম্ভবত ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ সমঝোতাকে আবার জটিল করে তুলতে পারে। গাজায় ইরানি প্রভাবের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র মিসর ফিলিস্তিনিদের সমঝোতার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছে অথবা কারো কারো অভিমত হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের সমঝোতা করার নির্দেশ দেয়ার ফলে হামাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে।

আব্বাসকে আরো চাপ দেয়ার জন্য সৌদি আরব মাহমুদ আব্বাসের শত্রু মোহাম্মদ দাহলানকে একই সময়ে রিয়াদে ডেকে পাঠিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যাতে দাহলান ওই সময়ে সেখানে থাকেন। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য মনে হয় ফাতাহর অভ্যন্তরীণ ‘সমঝোতা’ নিয়ে এই দু’জনের সাথে আলোচনা করা। অন্যভাবে বলা যায়, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আব্বাস কুশনারের চুক্তি বা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করলে দাহলানকে দৃশ্যপটে নিয়ে আসা হবে।

সৌদি চাপের চিহ্ন হিসেবে কী ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? পশ্চিম তীর এবং গাজার কিছু ভাষ্যকার লক্ষ করেছেন, রামাল্লায় ফিরে আসার পর আব্বাস দাহলানের সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে দমনাভিযান শুরু করেন। এর মাত্র কয়েক দিন পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর আরেকটি আঘাত আসে। মার্কিন প্রশাসন ঘোষণা করেছে, ওয়াশিংটনে পিএলও অফিসের লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র নবায়ন করা হবে না। প্রকৃতপক্ষে আব্বাস যে সৌদি-মার্কিন চাপ প্রতিহত করা অব্যাহত রেখেছেন, হয়তো এটা তার আর একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত। এ বিতর্কে ফাতাহ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং আব্বাসের উত্তরসূরি হওয়ার অন্যতম প্রার্থী মোহাম্মদ শতা ইয়েহ আমাকে বলেছেন, ‘সমঝোতা করার অর্থ, ফিলিস্তিনি স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রকল্পের একটি রেলপথ হতে পারে না।’

সৌদির দাবি ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। কারণ ফিলিস্তিন কুশনারের পরিকল্পনা বা চুক্তির শর্তকে সর্বাত্মকভাবে প্রত্যাখ্যান করবে। এ পরিস্থিতি ২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিডে আব্বাসের পূর্বসূরি ইয়াসির আরাফাত যে উভয় সঙ্কটে পড়ে গিয়েছিলেন, তার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তখন পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরাইলের আংশিক প্রত্যাহারসংক্রান্ত ইহুদ বারাকের পরিকল্পনা মেনে নেয়ার জন্য আরাফাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর অবিলম্বে আরাফাত সাইডলাইনে চলে যান এবং দুই বছর পর রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মাহমুদ আব্বাস সৌদি-মার্কিন চাপ কতটুকু প্রতিহত করতে পারবেন এবং কত দিন প্রেসিডেন্ট পদ ধরে রাখতে পারবেন, তা দেখার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে।

এখন এটা স্পষ্ট, যেভাবেই হোক, সৌদি আরব ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাবে। আব্বাসকে সাথে নিয়ে অথবা আব্বাসকে ছাড়াই তারা অগ্রসর হবেন। সৌদি যুবরাজ বা এম বি এস দেশে যেভাবে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারকে ম্যানেজ করেছেন এবং দেশের বাইরে ইরানের সাথে সঙ্ঘাত বৃদ্ধি করেছেন- তাতে মনে হচ্ছে, তিনি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সফল হতে পারেন।

কিন্তু ইসরাইলের ব্যাপারে তিনি যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেগুলো তার অন্যান্য সাহসী নীতিনির্ধারণের মতো ভালোভাবে কাজ না-ও করতে পারেন। প্রকৃত পক্ষে, তিনি নিজের পায়ে গুলি করে নিজেকে শেষ করে দিতে পারেন। কুশনারের চুক্তি বা পরিকল্পনাকে ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো- আরব এবং মুসলিম দেশগুলোর ঐকমত্যের বিরুদ্ধে কাজ করা। আরব ও মুসলিম বিশ্ব ফিলিস্তিন সঙ্কটের সুন্দর, সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান ছাড়া ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সৌদি আরব হয়তো সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিসর এবং জর্ডানের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পেতে পারে, কিন্তু ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসির ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের কাছ থেকে সমর্থন পাবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কুয়েত ইতোমধ্যেই তাদের দেশে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধী তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে।

সৌদি যুবরাজ নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেলে সৌদি আরব ইসলামি বিশ্বে তার নেতৃত্বের সুযোগ ও অবস্থান হারাবে। যুবরাজের বাবা বাদশাহ সালমান- ‘দু’টি পবিত্র মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক’ বা খাদেম। তিনি মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্র স্থান জেরুসালেমের আল আকসা মসজিদের অধিকার ত্যাগ করবেন। যুবরাজ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে রিয়াদের বিরুদ্ধে খেলার জন্য তেহরানের হাতকে আরো শক্তিশালী করা হবে। এতে ইরান মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবকে আইনসম্মত বা বৈধ রাষ্ট্র নয় বলে প্রচার চালানোর জন্য একটি নতুন হাতিয়ার হাতে পাবে।

ইবরাহিম ফারহাত, ভাষান্তর: মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
সূত্র: আলজাজিরা