সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

দু‘আ কবুলের কোনো লক্ষণ নেই !

POYGAM.COM
নভেম্বর ২৮, ২০১৭
news-image

তামাম জাহানের স্রষ্টা-প্রতিপালক আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা। দরুদ ও সালাম পেশ করছি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার এবং সকল সাহাবীর উপর। মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য আল্লাহর কাছে আকীদাহ ও আমলের ক্ষেত্রে সঠিক পথের তাওফীক প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

وَقَالَ رَبُّكُمْ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে। (সূরা গাফের: ৬০)

প্রশ্নকারী বলেছেন যে, তিনি আল্লাহর কাছে দু‘আ করে থাকেন। অথচ আল্লাহ তার দু‘আ কবুল করেন না। ফলে তার কাছে এই অবস্থা কঠিন বলে মনে হয়। বিশেষ করে আল্লাহ তো ওয়াদা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু‘আ করে, আল্লাহ তার দু‘আ কবুল করেন। আল্লাহ কখনই ওয়াদা খেলাফ করেন না। উক্ত প্রশ্নের জবাবে আমরা বলব যে, দু‘আ কবুলের জন্য কতিপয় শর্ত রয়েছে। তা সর্ববস্থায় দু‘আর ক্ষেত্রে বর্তমান থাকতে হবে।

প্রথম শর্ত

একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে দু‘আ করা। অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে, এই বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর কাছে দু‘আ করা যে, আল্লাহ কবুল করতে সক্ষম। দু‘আ করার সময় এই আশা রাখবে যে, আল্লাহ তা কবুল করবেন।

দ্বিতীয় শর্ত

দু‘আ করার সময় এই কথা অনুভব করবে যে, দু‘আ কবুলের দিকে সে খুবই মুখাপেক্ষী। শুধু তাই নয় বরং এ কথাও অনুভব করবে যে, একমাত্র আল্লাহই বিপদগ্রস্ত ফরিয়াদকারীর ফরিয়াদ শ্রবণ করেন এবং তিনিই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। যদি এ কথা অনুভব করে যে, সে আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী নয় এবং আল্লাহর কাছে তার কোন প্রয়োজনও নেই; বরং দু‘আ করাটা যেন একটা অভ্যাসমাত্র তাহলে এ ধরনের দু‘আ কবুল না হওয়ারই উপযোগী।

তৃতীয় শর্ত

হারাম খাওয়া থেকে দূরে থাকবে। কারণ বান্দা এবং তার দু‘আ কবুল হওয়ার মধ্যে হারাম রুযী প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে। সহীহ হাদীসে প্রমাণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

‘নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ পবিত্র  তিনি পবিত্র ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলদের (আ.) প্রতি যা নির্দেশ দিয়েছেন, মুমিনদের প্রতিও তাই নির্দেশ দিয়েছেন।’ তিনি বলেন,

ياَ أيُّهاَ الرُّسُلُ كُلُوْا مِنْ الطَّيِّباَتِ واعْمَلُوْا صاَلِحا

‘হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার গ্রহণ কর এবং সৎকর্ম কর।’ (সূরা মুমিনুন: ৫১) আল্লাহ বলেন—

ياَ أيُّهاَ الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُلُوْا مِنْ طَيِّباَتِ ماَ رَزَقْناَكُمْ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু সামগ্রী থেকে আহার গ্রহণ কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসেবে দান করেছি।’ (সূরা বাকারা: ১৭২)

অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, ‘যে দীর্ঘ সফর করে এলায়িত কেশ ও ধুলামিশ্রিত পোশাক নিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে ডাকতে থাকে— হে, প্রতিপালক! হে রব! অথচ সে ব্যক্তির পানাহার সামগ্রী হারাম উপার্জনের, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম টাকায় সংগৃহীত, এমতাবস্থায় কী করে তার দু‘আ কবুল হতে পারে?’

দু‘আ কবুলের সকল মাধ্যম অবলম্বন করা সত্বেও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ লোকের দু‘আ কবুল হওয়াকে অসম্ভব মনে করলেন। দু‘আ কবুলের কারণগুলো নিম্নরূপ:

১) আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আকাশে আরশের উপরে। আল্লাহর দিকে হাত উঠানো দু‘আ কবুলের অন্যতম কারণ। হাদীসে এসেছে,

إِنَّ اللَّهَ حَيِيٌّ كَرِيمٌ يَسْتَحْيِي إِذَا رَفَعَ الرَّجُلُ إِلَيْهِ يَدَيْهِ أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত লজ্জাশীল ও সম্মানী। বান্দা যখন তাঁর দিকে দু’হাত উঠিয়ে দু‘আ করে, তখন তিনি হাত দু’টিকে খালি অবস্থায় ফেরত দিতে লজ্জা বোধ করেন।’

২) এই লোকটি আল্লাহর একটি নাম رب ‘পালনকর্তা’ উচ্চারণ করে করে দু‘আ করেছে। এই নামের উসীলা গ্রহণ করা দু‘আ কবুলের অন্যতম কারণ। কেননা রব অর্থ পালনকর্তা, সমস্ত মাখলুকাতের সৃষ্টিকারী ও পরিচালনাকারী। তাঁর হাতেই আকাশ-জমিনের চাবি-কাঠি। এ জন্যই আপনি কুরআন মজীদের অধিকাংশ দু‘আতেই দেখতে পাবেন, ‘রব’ বা পালনকর্তা শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ

‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গুনাহ মাফ কর এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দাও, যা তুমি ওয়াদা করেছ তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন তুমি আমাদিগকে অপমানিত করো না। নিশ্চয় তুমি ওয়াদা খেলাফ করো না। অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দু‘আ এই বলে কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী লোক হোক। তোমরা সকল নারী-পুরুষই সমান।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৯৩-১৯৫) সুতরাং আল্লাহর এই নামের (রব) মাধ্যমে উসীলা দেয়া দু‘আ কবুলের অন্যতম কারণ।

৩) এই লোকটি মুসাফির ছিল। সফর করাকে অধিকাংশ সময় দু‘আ কবুলের কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়। কেননা সফর অবস্থায় মানুষ আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। স্বদেশে অবস্থানকারীর চেয়ে মুসাফির আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। মুসাফির এলোমেলো কেশ বিশিষ্ট ও ময়লাযুক্ত কাপড় পরিধানকারী হয়। মনে হয় সে নিজের নফসের প্রতি কোন গুরুত্বই দিচ্ছে না। আল্লাহর কাছে দু‘আ করা ব্যতীত তার অন্য কোন উপায় নেই। সফরে থেকে এলোকেশ বিশিষ্ট হয়ে ও ময়লাযুক্ত পোশাক পরিহিত অবস্থায় দু‘আ করা দু‘আ কবুলের পক্ষে খুবই সহায়ক। হাদীসে আছে, আল্লাহ তা‘আলা আরাফার দিন বিকাল বেলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং আরাফাতে অবস্থানকারীদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করে বলেন— ‘প্রতিটি অঞ্চল হতে তারা আমার কাছে এসেছে, ধুলা-মলিন পোষাক নিয়ে এবং এলোকেশ বিশিষ্ট অবস্থায়।’

যাই হোক, দু‘আ কবুলের উপরোক্ত কারণগুলো থাকা সত্বেও কোন কাজ হলো না। কারণ একটাই— তার খাদ্য-পানীয় ছিল হারাম, পোশাক ছিল হারাম এবং হারাম খেয়ে তার দেহ গঠিত হয়েছে। এ জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিভাবে তার দু‘আ কবুল করা হবে? দু‘আ কবুলের এই শর্তগুলো পাওয়া না গেলে দু‘আ কবুলের কোনই সম্ভাবনা নেই।

শর্তগুলো বর্তমান থাকার পরও যদি দু‘আ কবুল না হয়, তাহলে বুঝতে হবে কী কারণে দু‘আ কবুল হয়নি, তা আল্লাহই ভাল জানেন। দু‘আকারী এ বিষয়ে জানার কোন সুযোগ নাই। দু‘আ কবুলের সকল শর্ত বর্তমান থাকার পরও দু‘আ কবুল না হলে হতে পারে আল্লাহ তার উপর থেকে দু’আ কবুলের চেয়ে বড় কোন মুসিবত দূর করবেন। অথবা এও হতে পারে যে, কিয়ামতের দিনের জন্য তার দু‘আকে সঞ্চয় করে রাখবেন এবং সেদিন তাকে অধিক পরিমাণে বিনিময় দান করবেন। কেননা ব্যক্তি দু‘আ কবুলের সকল শর্ত বাস্তবায়ন করে আল্লাহর কাছে দু‘আ করার পরও দু‘আ কবুল করা হয়নি এবং তার উপর থেকে বড় কোন মুসিবতও দূর করা হয়নি। হয়ত বান্দা দু‘আ কবুলের সকল শর্ত পূরণ করে দু‘আ করেছে। কিন্তু দ্বিগুণ পুরস্কার দেয়ার জন্য তার দু‘আ কবুল করা হয়নি। একটি পুরস্কার দু‘আ করার কারণে এবং অন্য একটি পুরস্কার মুসীবত দূর না করার কারণে। সুতরাং তার জন্য দু‘আ কবুলের চেয়ে মহান জিনিস তার জন্য কিয়ামাতের দিন সঞ্চয় করে রাখা হবে।

মানুষের উচিৎ হলো দু‘আর ফলাফলের জন্য তাড়াহুড়া না করা। কেননা তাড়াহুড়া করা দু‘আ কবুল না হওয়ার অন্যতম কারণ। হাদীসে এসেছে,

يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ قَالُوْا كَيْفَ يَعْجَلُ يَا رَسُولُ اللَّهِ؟ قَالَ يَقُولُ دَعَوْتُ و دَعَوْتُ
وَ دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِى

‘তোমাদের কেউ দু‘আয় তাড়াহুড়া না করলে তার দু‘আ কবুল হয়ে থাকে।’ সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তাড়াহুড়া করা হয়ে থাকে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘বান্দা বলে— কত দু‘আ করলাম, কত দু‘আ করলাম, কত দু‘আ করলাম, কিন্তু কবুল তো হচ্ছে না।’

তাই কারও জন্য দু‘আতে তাড়াহুড়া এবং দু‘আ করতে করতে ক্লান্তি বোধ করে দু‘আ করা ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়; বরং বেশি বেশি দু‘আ করা উচিৎ। কারণ দু‘আ একটি ইবাদত। যা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে এবং প্রতিদান বৃদ্ধি করবে।

কাজেই হে দীনি ভাই! ছোট-বড় এবং কঠিন ও সহজ সকল বিষয়ে আপনাকে বেশি বেশি দু‘আ করার উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহ সবাইকে তাওফীক দিন।

শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহি.)