সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা চান রোহিঙ্গারা

POYGAM.COM
নভেম্বর ২৪, ২০১৭
news-image

রোহিঙ্গারা মনে করেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বললেও বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে তারা আর সেদেশে ফিরতে দেবে না।

ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। তারা দেশে ফেরা নিয়েও চরম অনিশ্চয়তা দেখছেন। তারা মনে করছেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ সত্ত্বেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও দমন পীড়ন যেহেতু থামছে না, তাই সেখানে ফিরে যাওয়া কঠিন। তাদের মতে, মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা যায় না, তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল নেই। সে কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব চান রোহিঙ্গারা।

তারা বলেছেন, নাগরিকত্ব ও সব ধরনের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে তাদের নির্বিচার হত্যা করবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা।

রোহিঙ্গারা মনে করেন, মিয়ানমার সরকার যদিও বলেছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে, কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে তারা আর সেদেশে ফিরতে দেবে না। রোহিঙ্গারা তাদের জমিজমা ভিটে-বাড়ি, ব্যবসা বাণিজ্য সব ফেলে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাই সেসব আর তারা ফিরে পাবেন না বলেই ধরে নিচ্ছেন। এখনো চলছে গণহত্যা ও নিপীড়ন। প্রতিদিন পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। তবু রোহিঙ্গাদের মাঝে ক্ষীণ আশা যদি বাংলাদেশ কুটনৈতিকভাবে সফল হয় তারা হয়তো ফিরতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত শিক্ষিত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে তাদের এমন হতাশার কথা জানা যায়।

মাস্টার শফিউল্লাহ (৬৫) বুচিদংয়ের টংবাজার হাইস্কুলে অনেকদিন শিক্ষকতা করেছেন। তিনি স্ত্রী পুত্রসহ পরিবারের আট সদস্য নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন থাইংখালী বাগঘোনা ক্যাম্পে। ভবিষ্যত জীবনের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত আরসা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৃষ্টি। আমি কোনো দিন আরসার নাম শুনিনি। আরসার কথিত হামলার আগে থেকেও রোহিঙ্গাদের দুর্বিসহ জীবন ছিল। সব অধিকার কেড়ে নেয়ার পরও রোহিঙ্গারা কোনোভাবে বসবাস করে আসছিল রাখাইনে। কিন্তু আরসার হামলার অযুহাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের সমূলে উচ্ছেদ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত। তবে কখনো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলে সেখানে জাতিসংঘ ও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব চান তিনি।’

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের কুটনৈতিক প্রচেষ্টা ও বিশ্বের নানামুখি চাপ সম্পর্কে উখিয়া বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রিত মংডু টাউনের রোহিঙ্গা ব্যাবসায়ী মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা যায় না। তাদের কথা এবং কাজের মধ্যে মিল নেই।

ইউসুফ আকিয়াব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন এবং নিয়মিত রেডিওর খবর শুনেন। বাংলাদেশে এসেও তিনি মিয়ানমারের এফএম রেডিওর খবর শুনছেন। তিনি এসব খবরের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, ‘দিনে দুবার খবর প্রচার করছে মিয়ানমার এবং তাতে এখনো ঘোষণা দেয়া হচ্ছে টোয়ে মিলং (পালিয়ে যাও, বাড়িতে আগুন দেয়া হবে)। তাদের যদি কোনো সদিচ্ছা অথবা মানবিকতার উদ্রেক হতো তারা এমন ঘোষণা এখনো দিত না। হত্যা ধর্ষণ এবং বাড়িঘরে আগুন দেয়ার ঘটনা বন্ধ করত মিয়ানমার সেনারা।’

তিনি বলেন, ‘আসলে আরসার সেই কথিত হামলা ছিল পরিকল্পিত এবং এই হামলার কথা বলে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নই আসল উদ্দেশ্য। রোহিঙ্গারা নিরীহ এবং যুগের পর যুগ আরাকানে বন্দী জীবনই কাটাচ্ছিল। তাদের চলাফেরা সীমিত। মিয়ানমার সেনাদের দাবি করা টাকা পয়সা (কিয়াত) দিয়ে তারা কোনোমতে বসবাস করছিল। ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গাদের জীবন হঠাৎ নেমে এলো ভয়াবহ দুর্যোগ।’

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু নাগরিকত্ব ও সব ধরনের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া ফিরে গেলে রোহিঙ্গদের শান্তিতে থাকতে দেবে না উগ্রপন্থী বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও দেশটির সেনাবাহিনী।’

বাংলাদেশকে দেয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রস্তাবকে মিয়ানমারের ধোকাবাজি মনে করছেন রোহিঙ্গারা।

তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর জন্যে এটা মিয়ানমারের কৌশল। রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন- বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বৈধ কাগজ কোথায় পাবেন? রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারের নাগরিক তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করার পরও মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে তাদের কাছে অনেক প্রমাণপত্র ছিল, কিন্তু সেনারা সেগুলোও কেড়ে নিয়েছে।

১৯৯২ সালের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বৈধ কাগজপত্রসহ রাখাইনে ফিরতে পারবেন। মিয়ানমার এখনো তাই বলছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জাতিগত পরিচয় হারানোর কারণে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা বাঙালি লেখা কার্ড নেননি। সেনা অভিযানের সময় বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ায় অনেক রোহিঙ্গা নানা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন বিয়ের কাবিননামা, জমির ট্যাক্স/ রশিদ ইত্যাদি আনতে পারেননি। ফলে বৈধ কাগজ তারা পাবেন কোথায়? দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা আরাকানে বসবাস করছেন নাগরিকত্বসহ সব ধরনের মৌলিক অধিকারহীন হয়ে। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে তাদের নির্বিচার হত্যা করবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা।

মংডুর ডোয়েলতলী ইউনিয়নের সাবেক উক্কাট্টা (চেয়ারম্যান) হাসান বসরি এখন থাইংখালী হাকিমপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনে রোহিঙ্গা না লেখায় তারা খুশি নন। এ কারণে নিবন্ধনের প্রতি অনেকের অনীহা।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতিগত পরিচয় বাঙালি লেখায় আমরা মিয়ানমারের কার্ড নিইনি। কিন্তু বাংলাদেশের নিবন্ধনে লেখা হচ্ছে মিয়ানমার।’

নিবন্ধন কার্ডে তিনি তাদের পরিচয় রোহিঙ্গা মিয়ানমার লেখার অনুরোধ করে বলেন, এটি লেখা হলে রোহিঙ্গাদের জন্য সুবিধা হতো। মিয়ানমারে জন্মেছি, সেখানেই আমাদের সব কিছু। নিরাপদে অবস্থানের সুযোগ পেয়ে জন্মভূমিতেই ফিরে যেতে চাই।’

হাসান বসরি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের চাপে মিয়ানমার একটু নরম সুরে কথা বললেও তারা নির্যাতন নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষকেই যুক্ত করতে চাইবে না মিয়ানমার। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আমাদের পরিচয়পত্রে জাতি হিসেবে পরিস্কার লেখা ছিল রোহিঙ্গা। ১৯৮৯ সালে আমাদের নতুন ফরম পুরণ করিয়ে জাতি হিসেবে মুসলিম লেখা হলেও ১৯৯৫ সাল থেকে লেখা শুরু হয় বাঙালি। থেইন সেইনের আমলে সব কার্ড কেড়ে নেয়া হয়। তারপর এনভিসির (ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড) কথা বলে যে ফরম পূরণ করা হয় সেগুলো বার্মিজ ভাষায় লেখা থাকলেও পূরণ করতে বলা হয় বাংলায়। আমরা তা অস্বীকার করায় নতুন কোনো কার্ড পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে ফের এনভিসির কথা বলে কিছু রোহিঙ্গাকে জোর করে বাঙালি লেখা কার্ড ধরিয়ে দেয়া হয়। এই কার্ড নিতে অস্বীকার করায় তারা আমাদের নির্মূলে চুড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়। এখন সেটা বাস্তবায়ন করছে মিয়ানমার।’

তিনি রোহিঙ্গাদের নির্মূল অভিযান বন্ধ ও মিয়ানমারের নাগরিকত্বসহ ফেরত যেতে জাতিসংঘসহ বিশ্বের কাছে আবেদন জানান।

হুমায়ুন কবির জুশান
উখিয়া (কক্সবাজার)