সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

চুরি ও খিয়ানত থেকে সতর্ক হোন

POYGAM.COM
নভেম্বর ২৩, ২০১৭
news-image

জুমু‘আর খুতবা, মসজিদে নববী, মদীনা
খুতবার তারিখ: ১২ সফর ১৪৩৯ হিজরী; ০৩ নভেম্বর ২০১৭ ঈসায়ী

সকল প্রশংসা আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাহদের মাঝে তাঁর অনুগ্রহ, দান ও জীবিকা বিতরণ করেছেন। চুরিকে হারাম করেছেন, চুরির অপরাধের শাস্তিতে হাত কাটার বিধান দিয়েছেন।

হে মুসলিমগণ! অর্থ-সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়। সম্পদের ক্রয়-বিক্রয় হয়। সম্পদের প্রতি মোহ ও লোভ হয়। সম্পদ অর্জনে মানুষ কষ্ট ও পরিশ্রম করে। সম্পদের প্রতি থাকে চোর ও অসাধুদের লোভাতুর দৃষ্টি। তারা সতর্কতার সাথে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কখন মালিক বা সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত প্রহরী অসতর্ক থাকে, তখনি তারা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হাতিয়ে নেয়। যারা সুরক্ষিত ঘরে গোপনে প্রবেশ করে, বন্ধ তালা ভেঙ্গে সম্পদ চুরি করে, তারা নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত ব্যক্তি। তারা চোর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে তারা অভিশপ্ত।

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, চোরকে আল্লাহ অভিশাপ দেন, একটি ডিম চুরি করলেও তার হাত কেটে দিতে হবে। (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

জাবির বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সূর্যগ্রহণ কালীন সালাত আদায় করে বললেন, যেসব বিষয়ে তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, আমি এই সালাতে তা প্রত্যক্ষ করেছি। আমার সামনে জাহান্নামকে পেশ করা হয়েছে, তার লেলিহান শিখা আমাকে আচ্ছন্ন করার ভয়ে আমি পিছনে সরে এসেছি যা তোমরা দেখতে পেয়েছিলে। (সহীহুল বুখারী)

চোরের হাত হলো জবরদখলকারী সীমালঙ্ঘনের হাত। শরীয়াহ এই হাত কেটে দেয়ার বিধান দিয়েছে। আর এ শাস্তি চুরির অপরাধীকে ঠেকিয়ে মানুষের অর্থ-সম্পদের সুরক্ষার জন্য।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘চোর পুরুষ ও চোর নারীর হাত কেটে দাও— তাদের কৃতকর্মের পরিণাম স্বরূপ। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। তিনি পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়।’

আবদুল্লাহ বিন উমার রাদিআল্লাহু আনহুমা বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিরহাম মূল্যের বর্ম চুরির অপরাধে হাত কেটে ছিলেন। (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

চোরের হাত কাটা প্রসঙ্গে ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, হাত যখন বিশ্বস্ত থাকে তখন এটি হয় মহামূল্যবান। আর যখন তা অবিশ্বস্ত হয়ে যায়, তখন সেটি হয় সাংঘাতিক অপমানকর। কেউ কেউ বলেছেন, বিশ্বস্ততার সম্মান চূড়ান্তে আর অবিশ্বস্ততা হলো সবচেয়ে অসম্মানের কারণ। হে আল্লাহর বান্দা! সীমালঙ্ঘন নিয়ন্ত্রণ করো। শয়তানের গোলাম হয়ো না।

তোমার ভাইয়ের জীবনের মর্যাদা ও গুরুত্ব তোমার নিজের জীবনের মতো। তার সম্পদের মর্যাদা ও গুরুত্ব তোমার সম্পদের মতো। তার ঘর ও পরিবারের সদস্যদের গুরুত্ব ও মর্যাদা তোমার ঘর ও পরিবারের মতো। তুমি কি চাইবেÑ তোমার সম্পদ, ঘর ও পরিবারের প্রতি অন্যায়ভাবে কেউ হাত বাড়াক, যেভাবে তুমি অন্যদের প্রতি হাত বাড়াও? যদি তুমি এটা পছন্দ না করো, অন্যরাও তা পছন্দ করবে না।

হে আল্লাহর বান্দা! আখিরাতের কঠিন দিনে মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার বিষয় স্মরণ করো। স্মরণ করো এমন দিনকে যেদিন অর্থ-সম্পদ তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। স্মরণ করো সেই দিনকে যেদিন অপরাধীদের শিকল দিয়ে বাঁধা হবে, পায়ে বেড়ি দেয়া হবে।

হে মুসলিমগণ! সতর্ক ও সাবধান হোন। আমাদের কেউ যেন অনুমতি ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ না করে। পরিমাণে কম হোক অথবা বেশি।

আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন অনুমতি ছাড়া কারো পশুর দুধ দোহন না করে।’

আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন যে, এক সফরে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমরা দেখলাম কিছু উট গাছের সাথে বাঁধা আছে। আমরা সেগুলোর উদ্দেশ্যে দৌড়াতে লাগলাম, তিনি আমাদেরকে ডাকলেন, আমরা তাঁর দিকে ফিরে গেলাম।

তিনি বললেন, ‘এ উটগুলো কয়েকটি মুসলিম পরিবারের। আল্লাহর পর এগুলো তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তোমরা বাড়ি-ঘরে ফিরে যাওয়ার পর যদি দেখ যে, তোমাদের সম্পদের অংশবিশেষ হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে, এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট হবে? এ উটগুলোর বিষয়ও তেমন।’ (আহমাদ, ইবনে মাজাহ)

আবু হুমাইদ আস-সায়েদী থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অনুমতি ছাড়া কারো জন্য অপরের একটি লাঠিও নেয়া বৈধ নয়। (আহমাদ, ইবনু হিব্বান)

ছোটখাটো বিষয় যাতে তেমন ক্ষতি নেই— তার বিধান যদি এমন হয়, তাহলে মূল্যবান বিষয়ের বিধান তো আরো কঠিন হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তাই এ ব্যাপারে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।

হাকাম বিন আল-হারিস আস-সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমি দখল করবে, সে ওই পরিমাণ সাতস্তর মাটির বোঝা বহন করে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। (আবু ই‘আলা)

আবু হুমাইদ আস-সায়েদী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমাদের যে-ই অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ নিবে, সে কিয়ামতের দিন ওই সম্পদের বোঝা বহন করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে।’

অতঃপর তিনি উপরের দিকে এমনভাবে হাত উঠালেন যে, তাঁর বগলের নিচের শুভ্রতা প্রকাশ পেল। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি?’ (সহীহুল বুখারী)

আবু মালিক আল-আশজায়ী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে জঘন্য খিয়ানত তথা অবিশ্বস্ততা হলো— দুই প্রতিবেশির পাশাপাশি কৃষিজমি রয়েছে, আর তাদের একজন আরেকজনের জমি দখলে নেয়া। এর পরিণতি হলো— কিয়ামত দিবসে সাতস্তর জমিন থেকে অতটুকু তার গলায় পেঁচিয়ে দেয়া হবে।’ (আহমাদ)

চোর যদি তার চুরির অপরাধ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তার এ অপরাধ ক্ষমা করবেন, তবে চুরিকৃত সম্পদ মালিককে ফেরত দিতে হবে। চোরাই মাল যদি তার কাছে অবশিষ্ট থাকে, তা ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি মাল না থকে তাহলে উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

আল্লাহ আমাদেরকে সন্দেহজনক খাবার, নিকৃষ্ট অর্জন ও হারাম সম্পদ থেকে রক্ষা করুন। আমাদেরকে হালালের মাধ্যমে সচ্ছলতা দিন। তিনি উদার, দানশীল।

দ্বিতীয় খুতবা

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যে হেদায়াত চায়, তিনি তাকে হেদায়াত দেন। যে অন্যায় ও অপরাধ থেকে সুরক্ষা চায়, তিনি তাকে সুরক্ষা দেন। যে তাঁর সন্তুষ্টি চায়, তিনি তার জন্য যথেষ্ট।

হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। তাঁর পর্যবেক্ষণের বিষয়ে সতর্ক থাকুন। তাঁর নাফরমানী করবেন না।

‘হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।’

হে মুসলিমগণ! আমাদের কেউ যখন ভিসা নিয়ে কোনো দেশে যায়, তখন সে মনে করবে যে, এ ভিসা হলো সে দেশে তার বৈধ প্রবেশের দলীল। এর মাধ্যমে সেখানে সে নিরাপত্তা পাবে। তার দায়িত্ব হলো, সে দেশের নিয়ম মেনে চলা। সকল ধরনের অবিশ্বস্ততা, চুরি; সে দেশের নিরাপত্তা, মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের যে কোনো ধরনের সীমা লঙ্ঘনমূলক আচরণ তার ওপর হারাম। অনুমতি ছাড়া বা অন্যায়ভাবে কোনো সম্পদ গ্রহণ করলে তা মালিককে ফিরিয়ে দেয়া তার ওপর অত্যাবশ্যক।

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরাতের সময়, আমাকে আদেশ করলেন, আমি যেন মক্কায় থেকে যাই এবং তাঁর কাছে কুরাইশদের গচ্ছিত অর্থ-সম্পদ লোকদেরকে যথাযথভাবে বুঝিয়ে দিই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় তের বছর ছিলেন। তিনি কখনো কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রহণ, কারো রক্ত প্রবাহিত করা বা কারো সম্মান-মর্যাদা লঙ্ঘনের আদেশ দেননি।

ইসলাম সবসময় চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার আদেশ দেয়। অবিশ্বস্ততা ও চুক্তি লঙ্ঘনকে নিষেধ করে।

আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন। সীমালঙ্ঘন ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ থেকে রক্ষা করুন।

আসুন আমরা আল্লাহর মহান নির্দেশনা অনুসরণে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদের ওপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পেশ করি।

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়াসাল্লিম ওয়া বারিক ‘আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমা‘ঈন।

হে আল্লাহ! খুলাফায়ে রাশেদীন আবু বাক্‌র, উমার, উসমান ও আলীসহ সকল সাহাবী ও তাবি‘ঈ এবং কিয়ামত পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণকারীদের ওপর তুমি সন্তুষ্ট হও।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদেরকে শক্তি ও সম্মান দাও। (৩ বার)

শিরক ও মুশরিকদের অপমানিত করো। তোমার ও তোমার দীনের দুশমনদেরকে ধ্বংস করে দাও।

হে আল্লাহ! আমাদের ও মুসলিমদের সকল দেশে নিরাপত্তা দাও।

হে আল্লাহ! আমাদের নেতাকে ও তাঁর স্থলাভিষিক্তদের এমন কাজ করার তাওফীক দাও, যাতে তুমি সন্তুষ্ট। তাদেরকে তাওফীক দাও ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থে কাজ করার।

হে আল্লাহ! দুশমনদের মোকাবিলায় আমাদেরকে সাহায্য করো। তুমি দুর্বল মুসলিমদের জন্য হয়ে যাও। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের সকল বিপদ-সঙ্কট দূর করে দাও।

হে আল্লাহ! আমাদের দু‘আ শোনো হে দানশীল!  হে মহান, হে দয়ালু!

খুতবা: শেখ সালাহ আল-বুদাইর
অনুবাদ: মুরাদ আশরাফী