সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

‘মধ্যপ্রাচ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ’

POYGAM.COM
নভেম্বর ২২, ২০১৭
news-image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, ইরাক ও সিরিয়ায় উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের বিরুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহযুদ্ধ ও বিভেদের বীজ বপনের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা হয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানির লেখা এক চিঠির জবাবে সর্বোচ্চ নেতা এ মন্তব্য করেছেন। ইরাক ও সিরিয়ায় দায়েশের পতন হওয়ায় জেনারেল সোলায়মানি তার চিঠিতে সর্বোচ্চ নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

জবাবে সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, এই ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ও জীবনঘাতী টিউমারকে আপনি তছনছ করে দিয়ে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও মুসলিম জাতির সেবা করেননি বরং সব জাতি ও সমগ্র মানবতার সেবা করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে খেলা হয়েছে: ইরান

ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশী শক্তির উপস্থিতি কখনোই এ অঞ্চলের মানুষের স্বার্থে ছিল না। এ অঞ্চলে বহির্শক্তির উপস্থিতির ফলে অস্ত্র বিক্রি, মতবিরোধ সৃষ্টি, তেলের দাম কমানোর খেলাই হয়েছে।

বুধবার মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে ড. রুহানি আরো বলেন, মার্কিনীরা আসার পর থেকেই এ অঞ্চলের একটি অংশে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। বিদেশী শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের ফলেই ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে যুদ্ধ বেঁধেছে। ইরান সবসময় মজলুমের পাশে ছিল এবং থাকবে। ইরান কখনোই নিরীহ মুসলমানের ওপর সন্ত্রাসী হামলা দাঁড়িয়ে দেখবে না।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইয়েমেনের নিরীহ মানুষ কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য ও রোগ-ব্যাধিতে মানবেতর জীবন যাপন করছে। কোনো কারণ ছাড়াই ইয়েমেনের মজলুম জনগণের ওপর অব্যাহতভাবে আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোও এই আগ্রাসনকে সহায়তা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, লেবাননের মতো একটা স্বাধীন দেশের ব্যাপারে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা কিংবা তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানোর ঘটনাকে ইতিহাসের নজিরবিহীন ঘটনা। কোন শক্তিবলে এসব করা হচ্ছে! অত্যন্ত লজ্জার বিষয় হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ ইসরাইলকে বলছে লেবাননের জনগণের ওপর বোমা হামলা চালাতে।

‘ইরানে হামলা করতেই মধ্যপ্রাচ্যে এসেছিল আমেরিকা’

ইরানের সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ রেজা পুরদাস্তান বলেছেন, তার দেশের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালাতেই মধ্যপ্রাচ্যে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছিল আমেরিকা। তিনি আরো বলেছেন, এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত আমেরিকার কপালে পরাজয় ছাড়া অন্য কিছু জোটেনি।

ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আমেরিকার জন্য ‘অকল্পনীয়’ হিসেবে উল্লেখ করে জেনারেল পুরদাস্তান বলেন, মার্কিন সেনারা পারস্য উপসাগরে প্রবেশের পর ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে এবং ইরানে আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত থাকে।

অন্যদিকে মার্কিন সেনারা মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশের পর তাদের সামরিক সক্ষমতার দুর্বল দিকগুলো শনাক্ত করে নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজায় ইরান। এখন যে কোনো মুহূর্তে সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান। জেনারেল পুরদাস্তান বলেন, আগ্রাসনের শিকার হলে ইরানের সেনাবাহিনী এমন কঠোর জবাব দেবে যে, আগ্রাসী বাহিনীকে অনুতপ্ত হতে হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কথা উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান বলেন, নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য বিশ্বের যেকোনো স্থানে শত্রুর বিরুদ্ধে আঘাত হানার জন্য ইরানের সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

এইকসঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিকে আত্মরক্ষামূলক হিসেবে উল্লেখ করে জেনারেল পুরদাস্তান বলেন, বিশ্বের কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগাম আগ্রাসন চালানোর পরিকল্পনা তেহরানের নেই।

মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ‘ইসরাইল’ সৃষ্টি হচ্ছে!

আমেরিকাসহ আরো কিছু বিদেশি শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের মতো আরেকটি অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়— এমনই মন্তব্য ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ীর। তিনি আরো বলেছেন, আমেরিকা ও ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যেই সম্প্রতি ইরাকের কুর্দিস্তানে বিচ্ছিন্নতাকামী গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইরান সফররত তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের সঙ্গে এক বৈঠকে এ মন্তব্য করেন সর্বোচ্চ নেতা। তিনি বলেন, ‘আমেরিকাসহ পশ্চিমা সরকারগুলোকে বিশ্বাস করা যায় না এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি ইসরাইল সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।’

আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, কুর্দিস্তানে গণভোট অনুষ্ঠান ছিল গোটা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং এটি এ অঞ্চলের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। ইরাকের প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই গণভোটের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করে দেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ইরাক থেকে কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ঠেকাতে ইরান ও তুরস্কের উচিত সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয়া। সেইসঙ্গে ইরাক সরকারকেও এ ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তিনি সিরিয়া বিষয়ক আস্তানা বৈঠকে তেহরান-আঙ্কারা সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ওই সহযোগিতার কারণে সিরিয়ার পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করা যাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাতে তেহরান ও আঙ্কারাকে নিয়ে একটি শক্তিশালী জোট গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করেন রজব তাইয়্যেব এরদোগান। তিনি বলেন, ইরাক থেকে কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ঠেকাতে তেহরান, আঙ্কারা ও বাগদাদকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানি গণভোটের আয়োজন করে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এদিকে তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক ওয়েবসাইট মিডলইস্ট মনিটর লিখেছে, ইরাকি কুর্দিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের যে হুমকি দিয়েছে ইরাক সরকার, তার সাথে যোগ দিয়েছে প্রতিবেশী ইরান ও তুরস্ক। ইরাকি কুর্দিস্তান ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যাপারে যে ভোট দিয়েছে সে ব্যাপারে সম্ভাব্য যৌথ পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা করতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান গতকাল তেহরানে যান। ইরান ও তুরস্ক উভয়ে কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঘোর বিরোধী।

এরদোগান এ সফরে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব করছেন। ইরানের শিল্প, খনিজসম্পদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী শরিয়ত মাদার মেহরাবাদ বিমানবন্দরে এরদোগানকে স্বাগত জানান। নিজ দেশের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী কুর্দিদের বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় ইরান ও তুরস্ক বাগদাদের সাথে মিলে ইরাকি কুর্দিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের হুমকি প্রদানের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের সীমান্তে ইরাকি সেনাদের সাথে সম্মিলিত সামরিক মহড়াও চালিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভির খবরে বলা হয়, এরদোগানের এ সফরকালে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার, ইরাক, সিরিয়া ও ইরাকি কুর্দিস্তান পরিস্থিতিসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

তেহরানে এক দিনের সফরে এরদোগান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী ও প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সাথে বৈঠক করেন। এর আগে তুরস্কের সেনাপ্রধান জে. হুলুসি আকার রোববার তেহরান সফর করেন। কুর্দি নেতাদের ওপর চাপ দিতে উভয় দেশ সম্প্রতি ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের সাথে তাদের সীমান্তে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। এসব মহড়া ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের সেনাবাহিনীও অংশ নেয়। বাগদাদ ২৫ সেপ্টেম্বরের গণভোট বাতিল করার দাবি করছে। ওই গণভোটে ৯২.৭ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জে. আমির হাতামি মঙ্গলবার জে. আকারের সাথে বৈঠককালে বলেন, ‘ইরান, তুরস্ক ও ইরাকের মধ্যে সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপ রোধ করতে সহায়ক হতে পারে।

ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চল গত মঙ্গলবার ঘোষণা করে যে, তারা ১ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করবে। এর জবাবে বাগদাদ অঞ্চলটির ওপর আরো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে তারা কুর্দিস্তান ব্যাংকগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ, সব ফাইট বন্ধ এবং ওই অঞ্চলে বৈদেশিক মুদ্রা হস্তান্তর বন্ধ করে দিয়েছে। ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার, তার প্রতিবেশীরা এবং পশ্চিমাশক্তিবর্গ আশঙ্কা করছে যে, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট সিরিয়ার সংঘাতের পাশাপাশি আরো বড় ধরনের আঞ্চলিক লড়াইয়ের সূত্রপাত করতে পারে যা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ব্যাহত করতে পারে।

কুর্দিরা হচ্ছে অঞ্চলটির চতুর্থ বৃহৎ জাতিগত গ্রুপ। ইরান, তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকে ছড়িয়ে রয়েছে কুর্দিরা। এসব দেশই কুর্দিদের স্বাধীনতার বিরোধী। তুরস্কে কুর্দি বিদ্রোহী পিকেকে ৩০ বছর ধরে দেশটির সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাদের মধ্যকার অস্ত্রবিরতি দুই বছর আগে ভেঙে গেছে।