সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

নজরুলের নাটক বিপুল এবং বিচিত্র

POYGAM.COM
অক্টোবর ২৮, ২০১৭
news-image

আবদুল মান্নান সৈয়দ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বালক বয়সে ছিলেন লেটো দলের সর্দার। নাটক রচনার মাধ্যমেই মূলত তার বিস্ময়কর, অপরূপ, অতুলনীয় সৃষ্টিশীল জীবনের যাত্রা। ‘যাত্রা’ রচনার মাধ্যমে যার কালজয়ী অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল সেই মহাকবি তার পরবর্তী সৃষ্টিশীল জীবনে মঞ্চনাটক, রেকর্ড নাটক, বেতার নাটক ও সিনেমায় যে বিপুল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সৃষ্টিসম্ভার সংযোজন করেছেন তা আজো অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত। তার এইসব সৃষ্টিশীল কাজের যে বিরাট জগতের সন্ধান পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃত, কোন কোন ক্ষেত্রে অপূর্ব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সবকিছু মিলিয়ে নজরুলকে পূর্ণাঙ্গ এবং অনন্য এক নাট্যপ্রতিভা হিসেবে সহজেই আবিষ্কার করা যায়।

লেটো দলের যাত্রাপালার অনিবার্য উপাদান ছিলো গান। পরবর্তীকালে নজরুলের নাটকে বহুক্ষেত্রে গানের প্রাধান্য এবং অন্যদের নাটকে নজরুলের গান সংযোজিত হয়ে বাংলা নাটকে যে অপূর্ব স্পন্দন সৃষ্টি হয়েছে তার কৃতিত্ব পুরোটাই নজরুলের।

আমাদের দেশে সমকালীন নাট্য আন্দোলন ঐতিহ্যবিমুখ হয়ে পড়েছে বলে অনেকে ধারণা করেন। নজরুলের নাটক ও নাট্যপ্রতিভা নজরুল সম্পর্কে মঞ্চ, টিভি, রেডিও, সিনেমায় যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে বিরাজমান অজ্ঞতা ও উদাসীনতা এরকম ধারণাকে সত্য বলেই সায় দেয়। দুই হাজার নয় সালের আগস্ট মাসে একটি জাতীয় দৈনিকের বিনোদন পাতায় ‘মঞ্চে নজরুল উপেক্ষিত’ শীর্ষক শীর্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ঐ প্রতিবেদনে একজন খ্যাতিমান নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা নজরুলের নাটকের ব্যাপারে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন কোথায় তার নাটক? প্রতিবেদনটিতে নজরুলের নাটক সম্পর্কে নজরুল গবেষক ও বিশেষজ্ঞের দেয়া তথ্যসহ অনেক তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে।

এরই প্রেক্ষিতে নজরুলের নাটক সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে চেয়েছেন অনেক পাঠক ও নাট্যামোদী। তারই সন্ধানে হাজির হয়েছিলাম শীর্ষস্থানীয় নজরুল গবেষক, নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও নজরুল রচনাবলীর সম্পাদকমন্ডলীর অন্যতম সদস্য আবদুল মান্নান সৈয়দের নিকট। তিনি একাধারে কবি, কথাশিল্পী, নিরন্তর সমালোচক, নাট্যকার, নিরলস গবেষক, বহুপ্রজ ও বহুমুখী লেখক। সাক্ষাৎকারের ঘটনাটি ঘটেছিল দুই হাজার নয় সালের রমজান মাসের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় দিন ইফতারের পর তাঁর গ্রীণরোডের বাসভবনে। নজরুলের নাটক সম্পর্কে তিনি যে তথ্য-উপাত্ত ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন হাজির করেছেন তা থেকে একটি বলিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করি। আমি কোন প্রসঙ্গের অবতারণা না করেই আবদুল মান্নান সৈয়দের নিকট নজরুলের নাটক সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমার বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে যা যা বলেছিলেন সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন উপশিরোনামে লেখাটি সাজানো হয়েছে। — আহমদ বাসির

অনেক এবং অনির্ণীত

নজরুলের গানের সংখ্যা যেমন এখনো পর্যন্ত অনির্ণীত, সত্যি বলতে কী— তেমনি তার নাটকের সংখ্যাও কিন্তু এখনো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। নজরুলের কবিতা, গল্প, উপন্যাস-মোটামুটি আমরা বলতে পারি সংখ্যায় কতো কিন্তু কতোরকম নাটক যে নজরুল লিখেছেন তার সঠিক সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। এটা খুবই জরুরি বিষয় যে, নজরুলের নাটক সংখ্যা কতোগুলো তা নির্ণয় ও উদ্ধার করা। নাটক বলতে আমি বৃহত্তর অর্থে যতো ধরনের নাটক সম্ভব, সবরকম নাটকের কথাই বলছি। নজরুলের নাটক সংখ্যা যদিও নির্ণয় করা যায়নি তবু যেগুলো পাওয়া গেছে সেগুলোই সংখ্যায় অনেক এবং বিচিত্র।

শৈল দেবীর গানের খাতায়

কলকাতায় শৈল দেবী’র গানের খাতা আমি দেখেছি। সেখান থেকে দুটি গীতিনাট্যের নাম আমি আমার খাতায় লিখে রেখেছি— এগুলোর কথা কেউই জানে না। বিশেষ করে বেতার ও গ্রামোফোন রেকর্ডে যতো নাটক আছে সেগুলো সব উদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি। বেতার থেকে তো সম্ভবই হয়নি। শৈল দেবী’র মতো আরো যারা নজরুলের সহচর-সহচরী ছিলেন তাদের গানের খাতা পাওয়া গেলে দেখা যাবে নজরুলের গীতিনাট্য রয়েছে, সেগুলো রেডিওতে সম্প্রচারিত। বিভিন্ন পত্রিকার পাতায়ও সন্ধান মিলতে পারে নজরুলের নাটকের। নাটক রচনা ছাড়াও নাট্যজগতের সাথে এত বিচিত্র যোগাযোগ ছিলো নজরুলের যা এখনো অনেকখানি আচ্ছাদিত রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালালে আরো বহু বহু কিছু পাওয়া যাবে।

বিচিত্র আঙ্গিক, বিচিত্র বিষয়

নজরুল একাঙ্ক নাটক লিখেছেন, পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখেছেন, কাব্যনাটক লিখেছেন, শুধুমাত্র বাচ্চা মেয়েদের অভিনয় উপযোগী নাটক লিখেছেন। সেকালের গ্রামোফোন রেকর্ডের জন্য, রেডিওর জন্য, মঞ্চের জন্য, সিনেমার জন্য নজরুল লিখেছেন। রেডিওতে অজস্র গীতিনাট্য লিখেছেন। নজরুলের নাটকের স্বভাব হচ্ছে বৈচিত্র্য এবং সেগুলো গানে ভরপুর। শুধু নাটকের জগতে যদি দেখা যায় এত অসম্ভব রকম বৈচিত্র্য তার আছে যে, এমনকি একটি হিন্দি নাটকও তিনি লিখেছেন, পুরোটাই হিন্দিতে লেখা। জান কেউ? জানে না। আমাদের পাঠকদেরও জানার কাজ। এগুলো জানতে হবে। যারা নাট্যচর্চা করেন তাদের তো অবশ্যই জানতে হবে। বিশুদ্ধ রঙ্গ-কৌতুকের নাটকও লিখেছেন নজরুল। লিখেছেন ঈদের নাটকও। নাটকের নামই ‘ঈদ’।

মধুমালা

নজরুলের খুব সুস্থাবস্থায় তিনটি নাট্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল। ঝিলিমিলি, আলেয়া, পুতুলের বিয়ে— এই ৩টির পর সুস্থাবস্থায় আরো একটি এবং অসুস্থ হওয়ার পর গ্রন্থাকারে বেরিয়েছিল মধুমালা। আমি বুঝি না মধুমালার মতো অসম্ভব সুন্দর নাটকটি কেন মঞ্চে অভিনীত হয় না, টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয় না, সিনেমায় রূপায়িত হয় না।

নজরুল সন্দ্বীপ গিয়েছিলেন— সেখানকার কিছুটা আদল এই নাটকে আছে। এই নাটকে ঢাকাইয়া ভাষায় কথা আছে এবং সেটা গোটাই বাংলাদেশের পটভূমিতে। একটু লোককাহিনী, একটু রূপকথা, সব মিলিয়ে অসম্ভব সুন্দর একটি নাটক। ভালো প্রোডিউসারের হাতে পড়লে যে কোন মাধ্যমে এটা অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করবে।

হিন্দি নাটক জন্মাষ্টমীঈদের নাটক ঈদ

নজরুল মানুষ হিসেবে হিন্দু-মুসলমানে ফারাক করেননি। সেই দর্শন তার নাটকেও ফুটে উঠেছে। তিনি সম্পূর্ণ হিন্দিতে হিন্দুদের জন্য নাটক লিখেছেন ‘জন্মাষ্টমী’ নামে। আবার মুসলমানদের জন্যও ঈদ নিয়ে লিখেছেন ‘ঈদ’ নামের নাটক।

আলেয়া গীতিনাট্য

আলেয়া গীতিনাট্য সেকালের সেরা রঙ্গালয় কলকাতার নাট্য নিকেতনে অভিনীত হয়েছিল। নাট্য নিকেতনের প্রধান ছিলেন প্রবোধচন্দ্র গুহ এবং তার অভিনেত্রী ছিলেন নীহারবালা। সেকালে অভিনেত্রীদের জানতে হতো গান এবং অভিনয় একই সঙ্গে। নীহারবালা গান জানতেন এবং অভিনয়ও করতেন। আলেয়া নাটকটিও অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে অভিনীত হয়েছিল। নজরুল আলেয়া নাটকে দু’একবার অভিনয়ও করেছিলেন কোন একজনের অনুপস্থিতিতে।

একাঙ্ক নাটক ও নজরুল

আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের আজকের যে রাজধানী এই ঢাকার জগন্নাথ হলে বাংলাভাষার প্রথম একাঙ্ক নাটক অভিনীত হয়েছিল। এটা আমাদের গৌরব। এই একাঙ্ক নাটকের গুরু মন্মথ রায়। সব অর্থেই গুরু তিনি। তিনিই এর প্রচলন এবং দ্বিগ্বিজয় ঘটান। সংখ্যার দিক দিয়েও প্রচুর একাঙ্ক নাটক রচনা করেন তিনি। বিশ-এর দশকে এটা হয়েছিল। ঢাকায় যে প্রথম একাঙ্ক নাটক শুরু হলো এ ব্যাপারে আমি আমাদের নাট্যামোদী যারা আছেন তাদের একটু অভিনিবেশ, একটু মনোযোগ দাবি করবো।

এই মন্মথ রায়ের সাথে নজরুল ইসলামের— নজরুল তো ছোট-বড় মানতেন না— একটা গভীর হৃদ্যতা ঘটল এবং মন্মথ রায়কে সাধুবাদ জানিয়ে নজরুল একটা চিঠিও লিখলেন। নজরুল নওরোজ পত্রিকায় মন্মথ রায়ের একাঙ্ক নাটকও ছাপিয়েছেন। নজরুলের নিজের ঝিলিমিলি গ্রন্থের চারটি একাঙ্ক নাটক ঐ সময়েরই লেখা। ফলে নজরুল কিন্তু প্রথমদিকের বাংলা একাঙ্ক নাটক রচয়িতাদের একজন।

একাঙ্ক নাটক অনেকদিন ধরে চালু ছিল। আমিও লিখেছি, সবাই লিখেছেন এই একাঙ্ক নাটক। বনফুল, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসুসহ সবাই লিখেছেন। এখন টেলিভিশন হয়ে একাঙ্ক নাটকের চল উঠে গেছে। ছোটগল্প এবং একাঙ্ক নাটক— দুটো বিষয় খুব কাছাকাছি। সে কারণে সবাই এটার চর্চা করেছেন।

নজরুলের একাঙ্ক নাটক

নজরুলের একাঙ্ক নাটকগুলোতে আমরা দেখেছি রবীন্দ্রনাথের নাটকের একটা ধারাবাহিকতা আছে। কোনকিছু তো ধারাবাহিকতা ছাড়া হয় না। নজরুলের প্রথম দিকের একাঙ্ক নাটকগুলোর একটিতে রক্তকরবী’র ছায়া আছে, আরেকটিতে ডাকঘরের। তারপরই নজরুল তার একান্ত নিজস্ব জগতে চলে গেলেন। ‘ভূতের ভয়’ বলে যে একটা একাঙ্ক নাটক আছে— এটা ইংরেজের বিরুদ্ধে। ভূত হচ্ছে ইংরেজ। নজরুল যখনই অসুর বা ভূত বলছে তখনই বুঝে নিতে হবে এটা ইংরেজ। এই নাটকে নজরুল নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছেন।

‘শিল্পী’ নামে একটা একাঙ্ক আছে নজরুলের। এই নাটককে আমি খুব গুরুত্ব দেই। এখানে দুই নজরুলের কথা আছে। একজন মানুষ নজরুল, অন্যজন শিল্পী নজরুল। শিল্পীসত্তার যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ এবং সমন্বয়— এটা নজরুল আশ্চর্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মন্মথ রায়, নজরুল ও সচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

মন্মথ রায়, কাজী নজরুল ইসলাম ও সচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত— এঁরা তিন জন মিলে একটি ‘নাট্যত্রয়ী’ তৈরি হয়েছিল। নাট্য জগতে তিন জনই শীর্ষস্থানীয়। সচীন্দ্রনাথের ‘সিরাজউদদৌলা’ নাটকের গানগুলো নজরুলের লেখা। ‘সিরাজউদদৌলা’ মানে কোথাও একটা বিদ্রোহ কিংবা স্বাধীনতার কথা। অন্যদিকে মন্মথ রায়েল ‘মহুয়া’ নাটকের জন্যও গান লিখলেন। মন্মথ রায়ের আরেকটি নাটক ‘কারাগার’। এই নাকটের গানও নজরুলের লেখা। এই নাটকের প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত এবং মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ হয়েছিল। নজরুল কোন নাটকের সাথে যুক্ত হচ্ছেন? ‘সিরাজউদদৌলা’, ‘কারাগার’ আবার রোম্যান্টিক ‘মহুয়া’।

চার রকম বিদ্যাপতি

নজরুল ইসলাম নিজে বড় লেখক ছিলেন বলেই বড় লেখকদের প্রতি তাঁর একটা দায়বদ্ধতা ছিলো। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী’র দুই শ্রেষ্ঠ কবি বিদ্যাপতি ও চন্ডিদাসের অনুরাগী ছিলেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত ‘লাঙল’ পত্রিকার শীর্ষে চন্ডিদাসের বিখ্যাত পঙক্তি ছাপা হতো ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ অন্যদিকে বিদ্যাপতি নিয়ে তিনি সিনেমার কাহিনী লিখেছেন বাংলায় এবং হিন্দিতে। রেকর্ড নাটক আকারেও বিদ্যাপতি বেরিয়েছিল এবং আরেকবার ভিন্নভাবে লিখেছিলেন সেটা আলাদা পুস্তকাকারে বেরিয়েছিল। অন্তত চার বার বিদ্যাপতি তিনি চার ভাবে লিখেছিলেন।

গান : অন্যদের নাটকের সাথে সেতুবন্ধন

অন্যদের নাটকে নজরুলের অংশগ্রহণ আছে—গীতিকার হিসেবে, সুরকার হিসেবে এবং আরও বিভিন্নভাবে। তারাশংকরের ‘কালিন্দি’র গানগুলোও নজরুলের লেখা। নজরুল যে নাটকগুলোতে গান লিখে দিয়েছেন সেগুলো দেখার জন্য, গান শোনার জন্য তখন নাট্যালয়ে নাট্যালয়ে ভিড়। এমনিতেই নজরুলের নিজের নাটক ঘিরে একটা অন্যকরম অবস্থা তৈরি হয়েছিল কলকাতায়। আবার নিজের ও অন্যদের নাটকে গান লিখে, সুর করে গোটা নাট্যজগতে ভিন্নরকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

অনেকের নাটকের জনপ্রিয়তা মূলে যে নজরুলের গান তা একটি ঘটনা থেকেই অনুমান করা সম্ভব। মন্মথ রায়ের মহুয়া নাটকে নজরুল যে ৯টি গান লিখেছেন এই গানগুলো নিয়ে ‘মহুয়ার গান’ বলে দুই আনা দামের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে ডিএম লাইব্রেরি এবং এর মালিক গোপাল দাস বলেছিলেন, এটা যে কতো বিক্রি হয়েছে তার কোন সীমা-সরহদ নেই। নজরুল শিশির কুমার ভাদুড়ীর ‘সীতা’ নাটকের জন্যও পোশাক পছন্দ করে দিয়েছেন।

সেমিনার ও সেলিম আল দীন

আমার মনে পড়ছে ১০/১২ বছর আগে নজরুলের নাটক নিয়ে একটি সেমিনার হয়েছিল নজরুল ইনস্টিটিউটে। সেখানে আলোচক ছিলাম আমি, সেলিম আল দীন এবং আমার সেদিন খুব ভালো লেগেছিলো। নিজে নাট্যকার সেলিম আল দীন নজরুলের নাটক সম্পর্কে অগাধ শ্রদ্ধা পোষণ করেছে। নজরুলের নাটক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কথা বলেছে সে। একটি কথা সে বলেছে যে, নজরুলের নাটক অসম্ভব উচ্চাঙ্গের। অন্যটি— ওর নিজের নাটকে যেমন ফোক, জনজীবন, লোক জীবনের উপস্থাপনা ছিলো। নজরুলেরও ঐ একই জিনিস ছিলো বলে তাঁর নাটক সম্পর্কে সে অসম্ভব রকম শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলো।

একটু ভিন্নরকম হলেও আমি দেখি— নজরুলের এক ধরনের ধারাবাহিকতা বা উত্তরণ ওর মধ্যে ঘটেছে।

ক্ষিরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদ ও শিশির কুমার ভাদুড়ী

আগের দিনের নাট্যকার ক্ষিরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ নজরুলকে পছন্দ করতেন। ‘আলী বাবা’র লেখক তিনি। নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ী নজরুলকে পছন্দ করতেন। তাঁর ‘সীতা’ নাটকের পোশাক নির্বাচনে সাহায্য করেছিলেন নজরুল। কল্লোল যুগের প্রায় সব লেখকরাই শিশির কুমারকে পছন্দ করতেন, শিশির কুমারও তাদের পছন্দ করতনে। ভাবলে বিস্ময়কর মনে হয় নাট্যজগতের সাথে নজরুলের কতো বিচিত্র যোগাযোগ ছিলো।

গবেষকদের ঊনতা

আমাদের পাঠক সাধারণ, নাট্যমোদী, নাট্যজনেরা যে নজরুলের নাটক সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা রাখে না এই দোষ তো নজরুলের নয়, এই দোষ এক হিসেবে তাদেরই। আবার এক হিসেবে আমরা যারা নজরুল চর্চা করি তাদেরও। তবে কিছুটা তো পাঠকের নিজের দায়িত্ব আছে। নাট্যামোদী ও নাট্যজনদের দায়িত্ব তো আরও বেশি। আমরা তো নজরুল রচনাবলী আবদুল কাদির সাহেবের পর থেকে বের করে যাচ্ছি। সেখানে নজরুলের যেসব নাটক থাকছে সেগুলো যদি পড়া হয় তাহলে তো এ সমস্যা থাকার কথা নয়। আরেকটা হচ্ছে গবেষকদের কাজ, সে ক্ষেত্রে আমাদের কিছু ঊনতা আছে এটা বলতেই হবে।

নাট্যরূপ নয়, লেখা নাটক

আমরা দেখি নজরুলের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে গল্প উপন্যাসের নাট্যরূপ প্রচারিত হয়। কিন্তু আমি বলব নজরুলের লেখা নাটকগুলো টেলিভিশনে প্রচারিত হোক, মঞ্চে অভিনীত হোক। স্বভাবতই এখনকার দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করতে কিছুটা স্বাধীনতা নির্মাতা বা নির্দেশকের থাকবেই। সিনেমা যখন হয়েছে তখন তো ‘পথের পাঁচালী’ বদলে গেছে। ওটা হবেই— সিনেমার ভাষা আলাদা, মঞ্চনাটকের ভাষা আলাদা, টিভি নাটকের ভাষা আলাদা, রেডিও নাটকের ভাষা আলাদা। জসীম উদদীনের যে এত জনপ্রিয় নাটক ‘বেঁদের মেয়ে’ সেটাও আমরা কোথাও দেখছি না। ঐতিহ্য কোন পড়ে পাওয়া জিনিস নয়। টিএস এলিয়ট তার বিশ্ববিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ট্রাডিশন এন্ড ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ প্রবন্ধে (১৯১৯ সালে প্রকাশিত) বলেছেন, ঐতিহ্য কোন পড়ে পাওয়া জিনিস নয়, তাকে অর্জন করতে হয়। আমাদের নাট্যঐতিহ্য যদি অর্জন করতে হয় তাহলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদদীনের নাটক এবং তাদের নাট্য সংশ্লিষ্ট অবদানকে রীতিমতো চর্চা করতে হবে। আবিষ্কার, পুনরাবিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে নজরুলের নাটক চর্চার জন্য আলাদা দল গঠনের কথা চিন্তা করা যেতে পারে।