সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

সূরা ফাতিহায় যে অঙ্গীকার করি আমরা…

POYGAM.COM
অক্টোবর ৪, ২০১৭
news-image

সূরাতুল ফাতিহা। যে সূরা দিয়ে কুরআন শুরু। ফাতিহা বলা হয় চাবিকে। যা দিয়ে খোলা হয় বা উদ্বোধন করা হয়। এ সূরার মাধ্যমে কুরআন খুলতে হয়। তাই কুরআনে প্রবেশ করার জন্য সূরাতুল ফাতিহার গভীর মর্মবাণী ভালো করে জেনে নেয়া দরকার।

আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামিন— কৃতজ্ঞতা জানাই সেই আল্লাহর, যিনি এই সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক। আর রাহমানির রাহীম। তিনি পরম করুণাময়, অত্যন্ত দয়ালু ও দাতা। মালিকি ইয়াওমিদ্দীন। তিনি মালিক প্রতিদান দিবসের। তিনি একচ্ছত্র অধিপতি সেই দিনের। সেই দিন কারো কোনো কথা, কারো কোনো আধিপত্য নেই। সেই দিন শুধু আল্লাহর। তিনি আরশে আসীন। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর সম্মুখে আসামির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে।

সেই সত্তার কাছে আমরা বলি, ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতায়িন—আমরা কেবল তোমারি গোলামি করি এবং আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, যা কিছু চাওয়ার তা শুধু তোমার কাছেই চাই।

সূরা ফাতিহা আমরা সবসময় নামাজে তিলাওয়াত করি। কিন্তু এর সত্যতা কোথায় আমাদের জীবনে? এই যে সূরার প্রথমে বলেছি, আলহামদুলিল্লাহ। কৃতজ্ঞতা সব আল্লাহর। প্রশংসা সব আল্লাহর। কিন্তু আসলেই কি আমি কৃতজ্ঞ আল্লাহর কাছে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে দেখি। আমি কি সত্যিই কৃতজ্ঞ আল্লাহর কাছে?

সূরা হিজরের ৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আমরা তোমাকে দিয়েছি, বার বার আবৃত্তি করার মতো সাতটি আয়াত এবং মহান কুরআন।’

প্রতি নামাজেই তো এই সূরা আবৃত্তি করছি। কথাগুলোতো আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করি। যদি কথাগুলো বুঝে বুঝে বলতাম, বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করতে পারতাম যে, আসলেই আমি কী বলছি আল্লাহর কাছে? আমি কি তা জানি এবং অনুধাবন করি?

সূরা নিসায় আছে— ‘নামাজ সেই সময় পড়া উচিত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা জানো তোমরা কী বলছো? অথবা যে পর্যন্ত না তোমরা বুঝতে পারছো কী বলছো?’

সালাত এমন একটা বিষয়, যা দিয়ে আল্লাহর কাছে কিছু বলা হয়। এখন আমি নিজেই তো বুঝি না যে, আল্লাহকে আমি কী বলছি? তো সেই নিবেদন তিনি নিবেন কেন? রাসূল (সা.) বলেছেন, অনেক নামাজ আছে কাঁধের উপরেও উঠে না। আবার কান দেখিয়ে বলেছেন, কানের উপরেও উঠে না।

তাহলে এই যে, সালাতে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন’ অর্থাৎ আমরা শুধু তোমারই গোলামি করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই। যা চাওয়ার তোমার কাছেই চাই। এটা আমাদের জীবনে আদৌ সত্য নয়। নামাজে দাঁড়িয়ে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলি আমরা।

আবার সূরা ইউনূসের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন— ‘নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাৎ আশা করে না এবং যারা এ পৃথিবীর জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট এবং এ নিয়েই পরিতৃপ্ত এবং যারা আমাদের নিদর্শনগুলো সম্পর্কে গাফেল, এরা হলো তারা যাদের আশ্রয় হবে আগুন। ওই কারণে যা তারা উপার্জন করত।’

ইহদিনাস-সিরাতাল মুসতাকিম— আমাদেরকে চালাও তোমার সোজা পথে। আমরা তো নামাজে দাঁড়িয়ে বলছি যে, আমাদেরকে চালাও বা দেখিয়ে দাও সোজা পথ। এখন আমরা প্রত্যেকেই যার যার অন্তরের কাছে জিজ্ঞেস করি, আসলেই কি আমি আল্লাহর পথে চলতে চাই? আসলেই কি আল্লাহর কাছে যেতে চাই? আসলেই কি আমি চাই যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর একজন সম্মানিত বান্দা হই? কিয়ামতের দিন আমি তার মনোনীত বান্দাদের মধ্যে গণ্য হই? এ ধরনের স্বপ্ন কি আমি আদৌ দেখি। অথচ নামাজে দাঁড়িয়ে মুখস্থ পড়া পড়ে যাচ্ছি।

আমাদের সামনে কিয়ামত নামে একটি দিন আছে। যেদিন সর্বকালের সব মানুষের বিচার হবে। সে দিন প্রতিটি মুহূর্ত আমরা আমাদের এখনকার জীবনে কী করেছি, প্রতিটি চোখের পলক কিভাবে ফেলেছি সবকিছু দৃশ্যমান হবে। সবকিছু দেখা যাবে। সূরা জিলজালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারপর যে অতি অল্প পরিমাণে ভালো কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে এবং যে অতি অল্প পরিমাণে খারাপ কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে।’

সিরাতাল্লাজিনা আন্‘আমতা আলাইহিম— তাদের পথে চালাও যাদের ওপর তোমার অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে।

গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম, ওলাদ্ দোয়াললিন— তাদের পথে নয়, যারা অভিশাপপ্রাপ্ত এবং যারা পথভ্রষ্ট।

এটাই যদি বাস্তবতা হয়ে থাকে তাহলে পুণ্য কী? আর আমরা পুণ্য পরিমাপ করবোই বা কী দিয়ে? তাহলে আসলেই কি আমরা পুণ্য করছি? সমাজে যেসব পুণ্যের ধারাবাহিকতা চালু আছে তার মধ্যে রয়েছে— কুরআন পড়লেই হরফে হরফে ১০ নেকি। তার ওপর আবার নফল ইবাদত, আবার মৃত মানুষের নামে বখশে দেয়া, কুরআন খতম ইত্যাদি।

অথচ সূরা যুখরুফে ৩৬-৩৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন— ‘যারা কুরআন থেকে গাফেল থাকে, আমরা তাদের ওপর শয়তান চাপিয়ে দেই। সে তার বন্ধু হয়ে যায়। এ শয়তানরা এসব লোককে সঠিক পথে আসতে বাধা দেয়। কিন্তু এরা মনে করে আমরা ঠিক পথেই চলছি। এরপর যখন এ ব্যক্তিকে আমার সামনে হাজির করা হবে তখন সে তার সঙ্গী শয়তানকে লক্ষ্য করে বলবে, হায় আফসোস! তোমার ও আমার মাঝে যদি দুই দিগন্তের ব্যবধান থাকত। তুমি কত নিকৃষ্ট সঙ্গীই না ছিলে।’

এই যদি আল্লাহর নিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে আমরা যারা কুরআন জানি না, কুরআন যাদের কাছে দূরবর্তী, যারা এ থেকে গাফেল, আল্লাহর নিয়ম অনুযায়ী তাদের পরিণতি কি সূরা যুখরুফের ৩৬-৩৮ আয়াতের মধ্যে পড়ে যাবে না? আমাদের কাছে কুরআন শুধু অস্পষ্টই নয়, কুরআনের ‘ক-ই’ আমরা জানি না। আমরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানতেই পারলাম না যে, আল্লাহ আমাদের কাছে কী বার্তা পাঠিয়েছেন? অথচ দুনিয়ার সবকিছুই আমাদের চলছে এবং হচ্ছে কিন্তু আল্লাহ আমাদের কাছে কী বার্তা পাঠিয়েছেন তা নিজের ভাষায় একবার পড়েও দেখলাম না।

এখন আমরা যারা এই কুরআনের পাঠক তারা কি ভেবে দেখেছি যে, আমাদেরকে কি আল্লাহ চালাচ্ছেন, নাকি অন্য কেউ চালাচ্ছে? কুরআনেই তো আমরা দেখি যে, মানুষকে চালায় দুটি শক্তি। একটি আল্লাহ, অন্যটি শয়তান। আমরা যদি প্রতিটি মুহূর্ত ভাবি যে, এই সময়টা আমি কার হুকুম মানছি, আল্লাহর না শয়তানের, তাহলে উত্তর পেয়ে যাবো।

যদি কেউ জীবনে এই লক্ষ্য স্থির করে যে, আমি এটা চাই— আমার সৃষ্টিকর্তা আমার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন না, তাহলে সে কুরআন অনুযায়ী চলবে। সে ছিরাতাল মুসতাকিমের পথ গ্রহণ করবে। তাহলে সেই মানুষের জীবনে বাহ্যিক দিক হোক, আচরণগত দিক হোক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দিক হোক, যে কোনো দিকই হোক না কেন তার আত্মপ্রকাশের যতগুলো অভিব্যক্তি আছে তার কোনোটার মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি থাকবে না।

আরিফা মির্জা
প্রাবন্ধিক