রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮

Beta Version

গারদে ঢুকছে হাতিরঝিল!

POYGAM.COM
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭
news-image

হাতিরঝিলের বিজিএমইএ ভবন অংশে পাড় ঘেঁষে নির্মাণ করা হচ্ছে আট ফুট উঁচু দেয়াল।

হাতিরঝিল মোড় থেকে সোনারগাঁও হোটেলের দিকে যেতে মূল সড়কের বাঁ পাশে চওড়া ফুটপাত। এরপর একটি বিভাজকে লাগানো ছোট-বড় বাহারি সব গাছ। তারপর হাঁটার জায়গা (ওয়াকওয়ে), বসার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে তৈরি সারিবদ্ধ কংক্রিটের বেঞ্চ। সবশেষে আরও গাছ আর ঘাসের সবুজে মোড়ানো হাতিরঝিলের ঢালু পাড়। এফডিসির সামনের ব্যস্ত রাস্তায় চলার সময় এই খোলা-সবুজ জায়গাটুকু মনে কিছুটা হলেও স্বস্তির জোগান দেয়।

 কিন্তু এই স্বস্তিটুকু আর বোধ হয় কপালে জুটবে না নগরবাসীর। গারদে পোরা হচ্ছে ঝিলের এই অংশকে। আট ফুট উঁচু দেয়ালে আটকে যাবে সবুজ-স্বস্তি।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌন্দর্য রক্ষা এবং ভবঘুরে ও অবাঞ্ছিতদের হাত থেকে ঝিল রক্ষার জন্যই দেয়াল তোলার এই সিদ্ধান্ত। তবে দেয়াল ওঠানোর মাধ্যমে হাতিরঝিলের মতো একটি গণপরিসরে দর্শনার্থীদের প্রবেশকে সীমাবদ্ধ করে ফেলাকে সমালোচনা করেছেন প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি। তাঁরা এটাকে হাতিরঝিলের মূল চেতনার পরিপন্থী বলছেন।

গতকাল মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, হাতিরঝিল মোড় থেকে বিজিএমইএ কার্যালয় পর্যন্ত দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পিলারের কাজ প্রায় শেষ। ওয়াকওয়ের পাশে বেঞ্চ ঘেঁষে এমনভাবে দেয়ালটি ওঠানো হচ্ছে, তাতে লেকের দিকে মুখ করে বসতে পারবেন না কেউ।

আবার বিজিএমইএ ভবন থেকে ঝিলপাড় ঘেঁষে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত ওয়াকওয়ের অংশটুকুতে লোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দেয়াল নির্মাণের কারণ সম্পর্কে হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা জামাল আক্তার ভূঁইয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঝিলের পাড়ে প্রচুর গাছ আছে। বাইরের অনেক লোক এখানে ঢুকে পরিবেশ নোংরা করছে। এ ছাড়া পাইকারি মাছের আড়তের প্রচুর বর্জ্য ঝিলে ফেলা হয়। এগুলো আটকাতেই এই ব্যবস্থা।’

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়ন। সেনাবাহিনীর পক্ষে প্রকল্প কর্মকর্তা মেজর সাদিক শাহরিয়ার বলেন, আট ফুট উচ্চতার এই দেয়ালের নিচের তিন ফুট হবে নিরেট। বাকিটুকুতে লোহার গ্রিল দেওয়া হবে। এটি নির্মাণের যৌক্তিকতা জানতে চাইলে তিনিও নিরাপত্তার সঙ্গে ঝিলের ‘পরিবেশ রক্ষার’ কথা বলেন। তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর ঝিলপাড়ের জায়গাটা নেশাখোরদের আড্ডার জায়গা হয়ে ওঠে। এ ছাড়া এখানে অনেকে অবৈধভাবে দোকানপাট তোলার চেষ্টা করেন। দেয়াল উঠলে সবাই ওয়াকওয়ে ও ফুটপাত ব্যবহার করে চলতে পারবেন, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারবেন না।

তবে হাতিরঝিল প্রকল্পের স্থাপত্য ও নিসর্গবিষয়ক উপদেষ্টা দলের দলনেতা স্থপতি ইকবাল হাবিব এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও পরিবেশদূষণের অজুহাতে যেটা করা হচ্ছে, তা হাতিরঝিলের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি একটি গণপরিসর, সব শ্রেণির মানুষের বিচরণস্থল। এখানে দেয়াল তুলে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়াটা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। বরং কর্তৃপক্ষ ঝিল রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য বাড়তি লোক নিয়োগ করতে পারে।

ইকবাল হাবিব আরও বলেন, ‘বুড়িগঙ্গাও তো দূষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই বলে কি আমি বুড়িগঙ্গার চারপাশে বেড়া দিয়ে দেব? এতে কি কোনো সমাধান হবে?’

এ ঘটনা জেনে প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ও সর্বোচ্চ তদারককারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ঠিক কী কারণে এখানে দেয়াল নির্মাণের প্রয়োজন হলো, সেটা কোনোভাবেই বুঝতে পারছি না। এমন কিছু হলে তো আমার সঙ্গে আলোচনা করার কথা। কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই কীভাবে এটা হলো, সেটাও একটা প্রশ্ন।’

হাতিরঝিলের মূল অংশের বাইরে ব্যস্ত সড়কের পাশে এই খোলামেলা জায়গাটি নাগরিকদের কাছে পছন্দের স্থান। অনেকে এখানে হাঁটতে আসেন। কেউ পথ চলতে বেঞ্চে বসে দু-দণ্ড জিরিয়ে নেন। আবার সড়ক দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার পথে মুক্ত জলাশয়ে মিশে যাওয়া সবুজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন অনেকে। এবার হাতিরঝিল মোড় থেকে রেলক্রসিং পেরিয়ে বিজিএমইএ ভবন পর্যন্ত ঝিলের তীর ঘেঁষে নির্মীয়মাণ সীমানাপ্রাচীরের কারণে পথচারীদের সেই দৃষ্টিসীমা সংকুচিত হয়ে আসবে।

মামুনুর রশীদ