সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

আরাকান রাজ্যের ইতিহাস

POYGAM.COM
সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭
news-image

আরাকান রাজ্য। দক্ষিণ প্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাজ্য। এ রাজ্যের সীমানা উত্তরে চীন, দক্ষিণে থাইল্যান্ড, পূর্ব ও পশ্চিমে বাংলাদেশ।

এটা একটা মুসলিম রাজ্য। তাতে ইসলাম প্রবেশ করেছে বহু পূর্বে ২৭২ হিজরীতে। আমীরুল মুমিনীন হারুনুর রশীদ (রাহি.)-এর শাসনামলে।

যখন মুসলিম বণিকগণ পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেন। তাদের হাতে ইন্দোনেশিয়া ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করলো, ফিলিপাইনেও ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সে সময় এসব দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশেও ইসলাম প্রসারিত হলো, আর তার নাম হচ্ছে আরাকান।

দুই শত বাহাত্তর হিজরীতে। আজ থেকে ১২ শত বছর আগে। সেখানে ইসলাম প্রবেশ করে তার অধিবাসীদের অন্তরে স্থান করে নিল। সবাই ইসলামের বিধান মেনে চলতে শুরু করলো।

মুসলিম শাসকগণ তাদেরকে শাসন করতেন। তারা অনেক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করলেন, জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন করলেন। মুসলিমগণ তাদের সন্তানদেরকে কুরআন হিফজ করাতে লাগলো। তারা একটি মুদ্রা চালু করলো, যার উপর লেখা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। তারপর তার নীচে লেখা ছিল— আবু বকর, উমার, উসমান, আলী।

তারা বিশুদ্ধ ও সহীহ আকীদা-মানহাজের অনুসারী মুসলিম ছিল। এভাবে বহু শতাব্দী পর্যন্ত তারা ইসলামের উপর চলতে থাকে। ইসলাম এখানকার লাখ লাখ মানুষের হৃদয় জয় করে এর আশপাশের দেশগুলোতেও ছড়াতে থাকে।

এর পাশের দেশ ছিল বার্মা। এটা একটা বৌদ্ধ রাষ্ট্র। কেউ সেখানে প্রবেশ করলে সর্বত্র বড় বড় বৌদ্ধমূর্তি দেখতে পেতো। বৌদ্ধরা সেগুলোর সেজদা করতো। সর্বত্র বৌদ্ধদের উপাসনালয়গুলো দেখতে পেতো। বৌদ্ধদেরকে দেখা যেতো— কমলা রঙের চাদর, লুঙ্গি পরিধান করে, মুণ্ডিত মাথা ও নগ্ন পায়ে তার চারপাশ প্রদক্ষিণ করছে। মানুষদেরকে বৌদ্ধ মতবাদ ও মূর্তিপূজার দিকে তারা আহ্বান করছে।

ইসলাম এই দেশে তথা বার্মা ও অন্যান্য অঞ্চলে প্রসার লাভ করতে লাগলো। তখন বৌদ্ধরা মুসলিমদের ওপর হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠলো। মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করলো। মুসলিমগণ ছিলেন সংখ্যালঘু। আর তারা ছিল লাখ লাখ। ফলে তারা মুসলিমদেরকে শাস্তি দিল। তাদের দেশ দখল করে নিল, আরাকানকে বার্মার সাথে যুক্ত করে নিল। তার নাম পরিবর্তন করে রাখলো মিয়ানমার। তারা সেখানে মুসলিমদের ওপর যা ইচ্ছা তাই করতে লাগলো।

মুসলিমগণ সেখানে স্বতন্ত্র রাজ্যের অধিকারী ছিল। আর তা ছিল প্রায় ২০০ বছর পূর্বে ১৭৮৪ খ্রীস্টাব্দে। অতঃপর সেখানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, এমতাবস্থায় স্বতন্ত্র রাজ্যের অধিকারী থাকার পর মুসলিমগণ হয়ে যায় সংখ্যালঘু। তারা এমন একটি রাজ্যের অধীন হয়ে যায় যেখানে পঞ্চাশ লক্ষ বৌদ্ধ, আর মুসলিমদের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র শতকরা ১৫ জনের মতো। অর্থাৎ মাত্র তিন-চার লাখের মতো। কিন্তু এই সংখ্যাও ফেলে দেয়ার মতো ছিল না।

মুসলিমগণ তাদের অনেক জনপদ গড়ে তোলে। তারা তাদের মসজিদসমূহে ইবাদত পালন করতে থাকে। তাদের আদর্শ সমাজ ব্যবস্থাই মানুষের জন্য কল্যাণ এবং ইসলামের পথে বড় আহ্বানকারী হয়ে যায়। ফলে হিংসাপরায়ণ ওই বর্মী ও বৌদ্ধ গোষ্ঠীরা বার বার মুসলিম বসতিগুলোর ওপর আক্রমণ করতে লাগলো। তাদের ওপর চাপ ও সংকীর্ণতা সৃষ্টি করতে লাগলো এবং তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। যেন তারা বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তারা মুসলিমদের বিভিন্ন জনপদে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। এমনকি দফায় দফায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এযাবত তারা দেড় লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করেছে।

এভাবে তাদের ও মুসলিমদের মাঝে টানাপোড়েন চলতে থাকে। অতঃপর আর কখনো আরাকানের মুসলিমগণ তাদের নিরাপত্তা ফিরে পায়নি। এমনকি বর্মীরা পুনরায় ৬০ হাজার মুসলিমকে হত্যা করে এবং পঞ্চাশ হাজার মুসলিমের ওপর অবরোধ আরোপ করে। মুসলিমদের অবস্থা এমন হয়ে পড়ে যে, তারা জানে না তারা কোথায় যাবে? তাই তারা নিরুদ্দেশে যাত্রা করে ছড়িয়ে পড়ে— কেউ পাকিস্তানে, কেউ বাংলাদেশে। তারা এমনসব দেশেও আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় যেগুলো তাদের দেশের মতো বা তার চেয়েও বেশি দরিদ্র।

তখন আমাদের ভাইয়েরা আরাকান থেকে যেটা পরে বার্মা হয়েছে, সেখান থেকে মক্কায় প্রবেশ করে। বর্তমানে মক্কায় তারা বিশ হাজার বা পঁচিশ হাজারের মতো অধিবাসী। আর বৌদ্ধরা জনপদের পর জনপদ আক্রমণ করে তাদেরকে হত্যা করতে থাকে। এবং তাদের ওপর এমন আইন-কানুন আরোপ করতে থাকে যা তাদের জীবন ও পরিস্থিতিকে সংকীর্ণ করে তোলে। ফলে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।

প্রথমে তাদের উপর মসজিদ নির্মাণ করা নিষিদ্ধ করা হয়। আর বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আহ্বান করার জন্য তারা অসংখ্য বৌদ্ধ উপাসনালয় বানাতে থাকে এবং তার ভিতর মূর্তিপূজা করতে থাকে।

তারা মুসলিমদের উন্নতির সব পথ বন্ধ করে দেয় আর তারা নিজেদের মনমতো এমনসব আইন-কানুন পাস করতে থাকে যাতে বোঝা যায় যে, তাদের জাতীয়তা হচ্ছে বর্মী। এভাবে বর্মীরা ২০০ বছর তাদের গ্রাস করে রাখার পর তারা হয়ে গেল বর্মী।

বিগত বছরগুলোতে সে দেশটির স্বৈরাচারী সরকার ভীষণভাবে আরাকানীদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। তারা একেবারে নিশ্চয়তাহীন জীবনযাপন করতে থাকে। তাদের এমন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই যার দ্বারা বোঝা যাবে, তারা কোনো একটি দেশের নাগরিক। মুসলিমদেরকে জীবিকা নির্বাহের পথ থেকে বঞ্চিত করা হয়, যে কোনো ধরনের চাকুরি তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। তাদেরকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়। শুধু প্রাথমিক লেখাপড়ার পথ খোলা রাখা হয় তাদের জন্য। যেন বৌদ্ধদের চাকর হিসাবে থাকতে পারে এবং তাদেরকে কোনো মুদি ব্যবসা বা এ জাতীয় কাজে পাঠানো হলে যেন তাদের জন্য চিঠি পড়ে দিতে পারে। এভাবে মুসলিমদেরকে চাকরের কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

তাদের যুবকদেরকে দিয়ে গ্রামে সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, সামরিক ক্যাম্প নির্মাণ, রাস্তার নি¤œমানের কাজকর্ম, কাপড় পরিষ্কার ইত্যাদি কাজ করানো হয়। কিন্তু এসবের বিনিময়েও তাদেরকে এক টুকরো রুটি দেয়া হতো না। তাদেরকে কাজের মজুরি দেওয়া হতো না— শুধু তাই নয়, এমনকি তাদেরকে সামান্য খাবারও দেয়া হতো না।

মুসলিমদেরকে আদেশ করা হতো যেন যখনই তাদের প্রয়োজন হয়, তৎক্ষণাত যেন তাদের জন্য খাবার-দাবার নিয়ে আসে। আর যে এটা করবে না তাকে হত্যা করে ফেলা হবে। আর এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অনেক। এ কারণে যখনই বলা হয়, ষাট হাজার হত্যা করা হয়েছে, সত্তর হাজার হত্যা করা হয়েছে, তার অর্থ হলো— একজন যুবক এসে বলছে, আমার কাছে খাদ্য নেই, পানীয় নেই, তখন তাকে এই বলে হত্যা করা হয়েছে যে, তুমি কেন খাবার নিয়ে আসনি?

তাদের ওপর ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তাদের কাছে তাদের প্রয়োজনের সামান্য অর্থকড়িই নেই। জীবন ধারণের সামান্য ব্যবস্থাও যাদের নেই, ভয়াল বিপদের মধ্যে নিমজ্জিত যাদের জীবন, তারা কিভাবে হজ্জ কিংবা উমরা পালন করতে সক্ষম হবে?…

শাইখ মুহাম্মাদ আল-আরেফী