সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

ভুলে যাওয়া কৃষি পদ্ধতি ‘চিনাম্পা’

POYGAM.COM
আগস্ট ২৭, ২০১৭
news-image

ছোটখাটো লেক। মাঝে সারিবদ্ধ দ্বীপের মতো অনেকগুলো সম-আয়তনের ছোট ছোট ভূখণ্ড। বেশির ভাগই একটি থেকে আরেকটির সমান দূরত্বে অবস্থিত। এর কোনোটিতে সবজি, কোনোটিতে ভুট্টা, কোনোটিতে আখ আবার কোনো কোনোটিতে ফুলও চাষ হচ্ছে, অনেকটা আমাদের দেশের এখনকার কৃষিতে ব্যবহৃত ফ্লোটিং বেডের মতো। পার্থক্য এটি, এসব ক্ষেতের কোনোটাই ভাসমান নয়, বরং স্থির।

প্রায় ৫০০ বছর আগে ১৫১৯ সালে এরনান কোর্তেস ও তার কনকুইস্তাদোররা যখন প্রথম অ্যাজটেক মেক্সিকোয় পা রাখে, সেখানে এ ছিল এক অতিসাধারণ দৃশ্য। অ্যাজটেক সভ্যতার প্রতি এরনান কোর্তেস ও তার কনকুইস্তাদোরদের অবদান হলো, গোটা সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। অ্যাজটেকরা হারিয়ে গেছে, সঙ্গে নিয়ে গেছে এ চাষ পদ্ধতি। মেক্সিকোয় এখন শুধু সোচিমিলকো শহর ছাড়া আর কোথাও এ পদ্ধতিতে চাষবাস দেখা যায় না।

সমান দূরত্ব বজায় রেখে সম-আকৃতির ক্ষেতে চাষের এ ধরনের পদ্ধতিকে বলা হয় চিনাম্পা।

চিনাম্পা ছিল কৃষি ও বনায়নের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এক অপূর্ব নিদর্শন। আয়তাকার বেড়া দিয়ে একেকটি চিনাম্পা প্লট ঘিরে দেয়া হতো। প্রতিটি প্লটের দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ মিটার ও প্রস্থ আড়াই মিটার। খুঁটি ও কঞ্চি বেঁধে এসব প্লটের বেড়া তৈরি করা হতো। এরপর প্লটটিকে কাদা, পাথর ও পচা শাকসবজি দিয়ে পূর্ণ করা হতো। বপন করা শস্য বা উদ্ভিদের মূল যাতে পানিতে নষ্ট না হয়, সেজন্য প্লটটির উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিত। মাটি ভেঙে পড়া রোধ ও প্লটগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য এগুলোর দুই পাশে রোপণ করা হতো উইলোজাতীয় উদ্ভিদ। এসব উদ্ভিদের গভীর শিকড় চিনাম্পার দেয়ালের কাঠামো রক্ষা ও পানিতে মাটির ক্ষয় রোধ করত।

চিনাম্পাগুলোকে স্থাপন করা হতো একটি আরেকটির সমান্তরালে। দুটি চিনাম্পার মাঝে খালি জায়গায় কিছুটা সরুমতো খাল খনন করা হতো। ক্যানু বেয়ে এসব খাল অতিক্রম করে একটি চিনাম্পা থেকে আরেকটি চিনাম্পায় যেতেন কৃষকেরা।

চিনাম্পাগুলোকে দূর থেকে দেখে মনে হতো, অনেকগুলো বাগান পানিতে ভাসছে। সুতরাং একে ভাসমান বাগান বলেও ভ্রম হতো অনেকের।

চিনাম্পা থেকে বছরব্যাপী ফসলের ভালো ফলন নিশ্চিত করার জন্য পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে বর্ষার মৌসুমে বন্যায় সব জলনিমগ্ন হয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছিল আশপাশের খাল, বাঁধ ও স্লুইস গেটের মাধ্যমে। সার হিসেবে ব্যবহার করা হতো নগরের আবর্জনা।

প্রসঙ্গত, এসব আবর্জনার পুরোটাই ছিল জৈব। ফলে নগরের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষায়ও এসব চিনাম্পার অবদান ছিল। অনেকটা জটিল এ পদ্ধতি একটা জিনিসেরই প্রমাণ দেয়, দখলদার, লুটেরা ও স্বর্ণলোভী ইউরোপীয় আগন্তুকদের তুলনায় কোনো অংশেই অসভ্য ছিল না অ্যাজটেক সম্প্রদায়ের মানুষ। বরং কৃষি ও বনায়নের সমন্বয়ে অনন্য এ পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে গিয়ে এখনো হিমশিম খেয়ে হাল ছাড়তে হচ্ছে আধুনিক মানুষকে।