সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

সিয়ামের মাসআলা-মাসায়েল: সাত

POYGAM.COM
জুলাই ২৬, ২০১৭
news-image

সিয়াম-সাধনার মাহে রমযান বিদায় নিলেও রেখে গেছে সেই সাধনার পথে পথচলার প্রেরণা। সেই প্রেরণায় বাকি ১১টি মাস চলতে পারলেই আমাদের সফলতা… আসুন আমরা মাহে রমযানের মতোই সুন্দর মন নিয়ে কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখি।

২১. আযান ও সেহরির মাঝে ব্যবধান

আনাস ইব্‌ন মালিক রহ., যায়েদ ইব্‌ন সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

«تَسَحَّرْنَا مَعَ النَّبيِّ ﷺ ثُمَّ قَامَ إِلى الصَّلاةِ، قَلْتُ: كَمْ كَانَ بَينَ الأَذَانِ والسَّحُورِ؟ قَالَ: قَدْرُ خَمْسِينَ آيَةً» رواه الشيخان.

“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সেহরি খেলাম, অতঃপর তিনি সালাতের জন্য দাঁড়ালেন। আমি বললাম: আযান ও সেহরির মধ্যে ব্যবধান কি ছিল? তিনি বললেন: পঞ্চাশ আয়াত পরিমাণ”।[৪০]

বুখারির অপর বর্ণনায় আনাস ইব্‌ন মালিক থেকে বর্ণিত:

«أَنَّ النَّبيَّ ﷺ وَزَيْدَ بنَ ثَابِتٍ تَسَحَّرا فَلَما فَرَغَا مِنْ سَحُورِهِمَا قَامَ نَبيُّ الله ﷺ إِلى الصَّلاةِ فَصَلَّى، قُلْنَا لأَنَسٍ: كَمْ كَانَ بَيْنَ فَراغِهِما مِنْ سَحُورِهِمَا وَدُخُولهما في الصَّلاةِ؟ قَالَ: قَدْرُ مَا يَقْرَأُ الرَجُلُ خَمسينَ آيَةً».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জায়েদ ইব্‌ন সাবেত এক সঙ্গে সেহরি খান, যখন তারা সেহরি থেকে ফারেগ হলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের জন্য দাঁড়ালেন ও সালাত আদায় করলেন। আমরা আনাসকে বললাম: তাদের সেহরি ও সালাত আরম্ভের মধ্যে ব্যবধান কি ছিল? তিনি বললেন: যতটুকু সময়ে একজন ব্যক্তি পঞ্চাশ আয়াত পড়ে”।[৪১]

শিক্ষা ও মাসায়েল[৪২]

এক. সেহরিতে বিলম্ব করা সুন্নত। এতে যেমন সওমের শক্তি অর্জন হয়, তেমন কিতাবিদের সুস্পষ্ট বিরোধিতা‎ হয়।

দুই. সাহাবিদের সময় ইবাদতে পরিপূর্ণ ছিল, এ জন্য যায়েদ কুরআন তিলাওয়াতের পরিমাণ দ্বারা সময়ের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।

তিন. শারীরিক কর্ম দ্বারা সময় পরিমাপ করা বৈধ, যেমন আরবরা বলত: বকরির দুধ দোহনের পরিমাণ, উটের বাচ্চা নহর করার পরিমাণ ইত্যাদি।

চার. সেহরি ও আযানের ব্যবধান মধ্যম গতির তিলাওয়াতে স্বাভাবিক পর্যায়ের পঞ্চাশ আয়াত পরিমাণ।[৪৩]

পাঁচ. সেহরি বিলম্ব করা সুন্নত, তবে সেহরির শেষ পর্যন্ত স্ত্রীগমন তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তার দ্বারা সওমের শক্তি অর্জন হয় না, বরং তাতে কাফফারা ওয়াজিব ও সওম বিনষ্টের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কখনো এমন হবে, ফজর উদিত হচ্ছে, কিন্তু সে উত্তেজনার কারণে রমন ক্রিয়া বন্ধ করতে পারছে না।

ছয়. ইলম অর্জন করা, মাসায়েল জানা, সুন্নত অনুসন্ধান করা, ইবাদতের সময় জানা ও তদনুরূপ আমল করা জরুরী। কারণ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “সেহরি ও আযানের ব্যবধান কি ছিল”। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “পঞ্চাশ আয়াত পরিমাণ”।

সাত. উম্মতের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া যে, সিয়ামের শক্তির জন্য সেহরির বিধান দেন, অতঃপর তিনি স্বেচ্ছায় তা বিলম্ব করেন, যেন সাহাবিরা এতে তার অনুসরণ করে। তিনি সেহরি না খেলে তার অনুসরণ করা তাদের জন্য কষ্টকর ছিল, আবার প্রথমরাত বা মধ্যরাতে সেহরি খেলে সেহরির অনেক উদ্দেশ্য বিফল হত।

আট. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শিষ্টাচার ও আদব রক্ষা করা জরুরী। এখানে যেমন যায়েদ বলেছেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সেহরি খেয়েছি”। তিনি বলেননি: “আমরা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেহরি খেয়েছি”। কারণ সাথীত্ব আনুগত্যের প্রমাণ বহন করে।

‎‎‎২২. রোযাদারের চুম্বন ও আলিঙ্গন করার বিধান

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كَانَ رَسُولُ الله ﷺ يُقَبِّلُ وهوَ صَائِمٌ، ويُبَاشِرُ وَهُوَ صَائِمٌ، ولَكنَّهُ أَمْلَكُكُمْ لأَرَبِهِ» أَيْ: أَمْلَكُكُمْ لِحَاجَتِهِ.

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযাবস্থায় চুম্বন করতেন, আলিঙ্গন ‎করতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের চেয়ে তার চাহিদা অধিক ‎নিয়ন্ত্রণকারী ছিলেন। অর্থাৎ স্ত্রীগমনের চাহিদা।

অপর বর্ণনায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে রোযাবস্থায় চুম্বন করতেন”। মুসলিম।‎

মুসলিমের অপর বর্ণনায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«وَأَيُّكُمْ يَمْلِكُ أَرَبَهُ كَما كَانَ رَسُولُ الله ﷺ يَمْلِكُ أَرَبَهُ».

“তোমাদের মধ্যে কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত নিজের প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে”।

আবু দাউদের এক বর্ণনায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كَانَ رَسُولُ الله ﷺ يُقَبِّلُنِي وهُو صَائِمٌ وأَنا صَائِمَةٌ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে চুম্বন করতেন, অথচ তিনি ও আমি সওম অবস্থায় থাকতাম”।

‎ইব্‌ন হিব্বানের এক বর্ণনায় এসেছে, আবু সালমা ইব্‌ন আব্দুর রহমান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেন, ‎তিনি বলেছেন:

«كَانَ رَسُولُ الله ﷺ يُقَبِّلُ بَعضَ نِسائِهِ وهوَ صَائِمٌ، قُلتُ لعائِشَةَ: في الفَريضَةِ والتَّطوُّعِ؟ قَالَتْ عَائِشَةُ: في كُلِّ ذَلكَ في الفَريضَةِ والتَّطَوُّع».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কতক স্ত্রীদের রোযাবস্থায় চুম্বন করতেন। আমি আয়েশাকে জিজ্ঞেস ‎করলাম: ফরয ও নফলে? তিনি বললেন: উভয়ে”।‎[৪৪]

হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত:

«أَنَّ النَّبيَّ ﷺ كَانَ يُقبِّلُ وَهُوَ صَائِم» رَوَاهُ مُسْلمٌ.

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযাবস্থায় চুম্বন করতেন”।[৪৫]

ওমর ইব্‌ন আবু সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন: “রোযাদার কি চুম্বন করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তাকে -উম্মে সালমা- জিজ্ঞাসা কর। উম্মে সালমা ‎তাকে বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করেন। সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, ‎আল্লাহ আপনার অগ্র-পশ্চাতের সবগুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: জেনে রেখ, আল্লাহর শপথ!  আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক পরহেযগার ও আল্লাহভীরু”। মুসলিম।[৪৬]

ওমর ইব্‌ন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রোযাবস্থায় বিনোদনের ছলে আমি চুম্বন করি। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আজ এক জঘন্য অপরাধ করে ফেলেছি, রোযাবস্থায় চুম্বন করেছি। তিনি বললেন: বল দেখি রোযাবস্থায় পানি দ্বারা কুলি করলে কি হয়? আমি বললাম: কিছু হয় না। তিনি বললেন: তাহলে কী অপরাধ করেছ”।[৪৭]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. রোযাদারের চুম্বন ও আলিঙ্গন করা বৈধ, রোযা ফরয হোক বা নফল, রোযাদার বৃদ্ধ হোক বা যুবক, রমযান বা গায়রে রমযান সর্বাবস্থায়, যদি স্ত্রীগমন অথবা বীর্যপাত থেকে নিরাপদ থাকে ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।

দুই. হাদিসে আলিঙ্গন দ্বারা উদ্দেশ্য শরীরের সাথে শরীরের স্পর্শ, ‎স্ত্রী সহবাস নয়। কারণ স্ত্রী সহবাস রোযা ভঙ্গকারী।[৪৮]

তিন. রোযাদারের স্ত্রী চুম্বন, অথবা স্পর্শ অথবা আলিঙ্গনের ফলে যদি বীর্যস্খলন হয়, রোযা ভেঙ্গে যাবে, তার অবশিষ্ট দিন পানাহার থেকে বিরত থাকা, তওবা, ইস্তেগফার ও পরবর্তীতে কাযা করা জরুরী। কারণ আল্লাহ তা‘আলা হাদিসে ‎কুদসীতে বলেন:

«يَدَعُ شهْوَتَه وأَكْلَهُ وشُرْبَهُ مِنْ أَجْلي» وفي رِوايةٍ «ويَدَعُ لَذَّتَه مِنْ أَجْلي، ويَدَعُ زَوجَتَه مِنْ أَجْلي».

“সে আমার জন্য তার প্রবৃত্তি ও পানাহার ত্যাগ করে”।[৪৯] অপর বর্ণনায় আছে: “সে আমার জন্য স্বাদ ও স্ত্রীগমন ত্যাগ করে”।[৫০]

‘মজি’ বের হলে রোযা ভাঙ্গবে না, বিশুদ্ধ মতানুসারে এ কারণে তার ‎ওপর কিছু ওয়াজিব হবে না।[৫১]

রোযাদারের জন্য উচিত যৌন উত্তেজক আচরণ থেকে বিরত থাকা, যা হারাম পর্যন্ত নিয়ে যায়।

চার. হাদিস প্রমাণ করে যে, চুম্বন শুধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং সমগ্র ‎উম্মতের জন্য তা বৈধ, যদি সহবাস বা বীর্যপাতের আশঙ্কা না ‎‎থাকে।‎[৫২]

পাঁচ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে আল্লাহ ভীরু, কারণ তিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী জানতেন।[৫৩]

ছয়. হাদিস প্রমাণ করে যে, দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা নিষেধ, অথবা এ বিশ্বাস করা যে, শুধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য স্ত্রী চুম্বন বৈধ, উম্মতের কারো জন্য তা বৈধ নয়। কারণ এ ব্যাপারে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি স্বাভাবিকভাবে তা নেননি, বরং তিনি বলেন:

«أمَا والله إنِّي لأَتْقَاكُم لله وأَخْشَاكُم له» وفي الحَدِيثِ الآخَرِ: «وَأَعْلَمُكُم بِحُدُودِ الله».

“জেনে রেখ, আমি ‎‎তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে পরহেযগার ও আল্লাহ ভীরু”।[৫৪] অপর হাদিসে এসেছে: “আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহর বিধান অধিক জানি”। ‎

সাত. হাদিস থেকে সাহাবিদের হালাল-হারাম জানার আগ্রহ ও আল্লাহ ভীতি প্রমাণ হয়, তারা ইবাদত বিনষ্টকারী বা সওয়াব হ্রাসকারী বস্তু থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতেন।

আট. এ হাদিসে সেসব সূফীদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা বিশ্বাস করে যে, ঈমান ও আমলে যাদের পূর্ণতা অর্জন হয়েছে, তারা শরিয়তের বিধানের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত! এখানে আমরা দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরিয়তের বিধানে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন, অথচ তার ঈমান ও আমল সবার চেয়ে কামেল ও পরিপূর্ণ ছিল। এতে তাদেরও প্রতিবাদ রয়েছে, যাদের ধারণা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বাপর পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, তাই নিষিদ্ধ কতক কাজ তার জন্য বৈধ।[৫৫]

নয়. ওমর ইব্‌ন খাত্তাবের হাদিসে এক বিধানের ক্ষেত্রে দু’টি বস্তুর তুলনা করা ও কিয়াসের বৈধতা প্রমাণিত হয়, যদি বস্তুদ্বয়ে সাদৃশ্য থাকে। যেমন পানি দ্বারা গড়গড়ার ফলে গলায় ও পেটে পানি প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে, যে কারণে সওম ভেঙ্গে যায়, অনুরূপ চুম্বনের ফলে স্ত্রীগমনের সম্ভাবনা থাকে, যে কারণে সওম ভেঙ্গে যায়, কিন্তু যেহেতু গড়গড়ার ফলে সওম ভাঙ্গে না, তাই চুম্বনের ফলে সওম ভাঙ্গবে না।[৫৬]

২৩. রমযানে পানাহার করার শাস্তি

আবু উমামা বাহেলি রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: ‎

«بينَا أنَا نَائِمٌ إذْ أَتَاني رَجُلانِ فأخَذَا بضَبْعِي – أي: عَضُدِي – فَأَتَيَا بي جَبَلاً وَعْراً فَقَالَا لي: اصْعَدْ، فقلت: إني لا أُطِيقُه، فقَالَا: إنا سَنُسَهِّلُه لك، فَصَعَدتُ حتى إذا كُنتُ في سَواءِ الجَبَل إذا أنا بِأصْواتٍ شدِيدَةٍ، فَقُلْتُ: مَا هَذهِ الأَصْواتُ؟ قَالَوا: هَذا عِوى أَهْلِ النَّارِ، ثمَّ انْطُلِقَ بي فَإِذا أَنا بِقَومٍ مُعَلَّقِين بِعَرَاقِيبهِم، مُشَقَّقَةٍ أَشْدَاقُهُم تَسِيلُ أشْداقُهُم دَماً، قَالَ: قُلتُ: مَن هَؤُلاءِ؟ قَالَ: هؤُلاءِ الَّذين يُفطِرُون قَبلَ تَحِلَّة صَوْمِهِم» رَوَاهُ النِّسَائي وَصَحَّحَهُ الحَاكِم.

“একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, সহসা দু’জন লোক এসে আমার বাহু ধরে আমাকেসহ তারা এক দুর্গম পাহাড়ে আগমন করল। তারা আমাকে বলল: আরোহণ কর, আমি বললাম: আমি আরোহণ করতে পারি না। তারা ‎বলল: আমরা তোমাকে সাহায্য করব। আমি ওপরে আরোহণ করলাম। যখন পাহাড়ের চূড়ায় ‎‎পৌঁছলাম, বিভিন্ন বিকট শব্দের সম্মুখীন হলাম। আমি বললাম: এ আওয়াজ কিসের? তারা ‎বলল: এগুলো জাহান্নামীদের ঘেউ ঘেউ আর্তনাদ। অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে রওনা করল, আমি এমন লোকদের সম্মুখীন হলাম, যাদেরকে হাঁটুতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের চোয়াল ‎‎ক্ষতবিক্ষত, অবিরত রক্ত ঝরছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি বললাম: এরা কারা? তারা বলল: এরা ‎হচ্ছে সেসব লোক, যারা সওম পূর্ণ হওয়ার আগে ইফতার করত”।‎[৫৭]

শিক্ষা ও মাসায়েল

‎এক. এ হাদিসে কবরের আযাবের প্রমাণ রয়েছে। কবরের আযাব কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম আহমদ রহ. বলেন: কবরের আযাব সত্য, গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট ব্যতীত কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না”।[৫৮]

দুই. কবরের আযাব শরীর ও রূহ উভয়ের ওপর ঘটে, যার স্বরূপ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। ইব্‌ন কায়্যিম রহ. বলেন: “এ উম্মতের পূর্বসূরি ও ইমামদের অভিমত হচ্ছে, মৃত ব্যক্তি যখন মারা যায়, ‎‎নেয়ামত বা আযাবে অবস্থান করে, যা তার শরীর ও রূহ উভয় ভোগ ‎করে। শরীর থেকে আলাদা হওয়ার পর রূহ আরামে বা আযাবে অবস্থান ‎করে। কখনো সে শরীরের সাথে মিলিত হয়, তখন সে তার সাথে আযাব বা নেয়ামত ভোগ করে। অতঃপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন সব রূহ শরীরে ‎ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আর তারা সবাই কবর থেকে আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবে”।[৫৯]

তিন. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে কবর আযাবের কতক নমুনা দেখানো হয়েছে। নবীদের স্বপ্ন ‎সত্য ও ওহির অংশ।

চার. এতে কবর আযাবের কঠিন চিত্র ফুটে উঠেছে, মুসলিমদের উচিত কবর আযাব ভয় করা, তার উপকরণ থেকে বেচে থাকা ও তা থেকে সুরক্ষার আসবাব গ্রহণ করা।

পাঁচ. রমযানে যে ব্যক্তি জেনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে, কোন কারণ ব্যতীত সময় হওয়ার পূর্বে ইফতার করে, তার জন্য কঠোর হুশিয়ারি রয়েছে এ হাদিসে। এটা কবিরা গুনাহ, যার জন্য রয়েছে কঠিন ‎শাস্তি।‎

ছয়. সূর্যাস্তের পূর্বে ইফতারে যদি এ শাস্তি হয়, তাহলে যে রমযানে সওম রাখে না, অথবা কোন কারণ ব্যতীত কয়েক রমযান ইফতার করে, সে এরূপ বা তার চেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে সন্দেহ নেই। অতএব যার থেকে এরূপ ঘটে তার কর্তব্য দ্রুত তওবা করা, যেন তাকে কবরের এ আযাব স্পর্শ না করে।

[চলবে]

মূল লেখক: ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-হাকিল
তরজমা: সানাউল্লাহ নজির আহমদ