সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

সিয়ামের মাসআলা-মাসায়েল: ছয়

POYGAM.COM
জুলাই ১, ২০১৭
news-image

সিয়াম-সাধনার মাহে রমযান বিদায় নিলেও রেখে গেছে সেই সাধনার পথে পথচলার প্রেরণা। সেই প্রেরণায় বাকি ১১টি মাস চলতে পারলেই আমাদের সফলতা… আসুন আমরা মাহে রমযানের মতোই সুন্দর মন নিয়ে কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখি।

১৬. রমযানে ওমরার ফযীলত

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ থেকে এসে উম্মে সিনান আনসারিকে বলেন: তুমি কেন হজ্জ করনি? সে বলল: অমুকের পিতা, অর্থাৎ তার স্বামীর কারণে। তার চাষাবাদের দুটি উট ছিল, একটি দ্বারা সে হজ্জ করেছে, অপরটি আমাদের জমি চাষ করেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘নিশ্চয় রমযানের ওমরা আমার সাথে হজের সমান।’ [বুখারী: ১৭৬৪; মুসলিম: ১২৫৬]

অপর বর্ণনায় আছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«فإِذا جَاءَ رَمَضَانُ فاعتَمرِي فإنَّ عُمْرةً فيه تَعْدِلُ حَجَّة».

‘যখন রমযান মাস আসে ওমরা কর, কারণ এ সময়ের ওমরা হজ্জের সমান।’ [বুখারী: ১৬৯০; মুসলিম: ১২৫৬]

উম্মে মাকাল রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন:

«اعْتَمرِي في رَمَضَانَ فإنَّها كَحَجَّة» رواه أبو داود.

‘রমযানে ওমরা কর, কারণ তা হজ্জের ন্যায়।’  [আবু দাউদ: ১৯৮৯); নাসাঈ ফিল কুবরা: ৪২২৬; তিরমিযী: ৯৩৯; তিনি বলেছেন হাদীসটি হাসান, গরিব। ইব্‌ন খুযাইমাহ: ৩০২৫; হাকেম: ১/৬৫৬; হাকেম বলেছেন হাদীসটি সহীহ মুসলিমের শর্ত মোতাবেক]

অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে জাবের, আনাস, আবু হুরায়রা ও ওয়াহাব ইব্‌ন আনাস রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে।  [জামে তিরমিযী: ৩/২৭৬]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: ‘রমযানের ওমরা হজ্জের সমান’। ইব্‌ন বাত্তাল (রাহি.) বলেন: ‘এর দ্বারা বুঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যে হজ্জের কথা বলেছেন, তা নফল ছিল, কারণ উম্মাত এ বিষয়ে একমত যে, ওমরা কখনো ফরয হজ্জের স্থলাভিষিক্ত হয় না। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী ‘হজ্জের অনুরূপ’ দ্বারা উদ্দেশ্য— সাওয়াব ও ফযীলত বুঝানো, যা মানুষের কিয়াস ও ধারণার ঊর্ধ্বে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার অনুগ্রহ দান করেন।’  [শারহু ইব্‌ন বাত্তাল আলাল বুখারী: ৪/৪২৮; দেখুন, মিনহাতুল বারী: ৪/২৩৩]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. বান্দার ওপর আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি অল্প আমলের বিনিময়ে অধিক সাওয়াব দান করেন। এ জন্য আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করি।

দুই. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন ও তাদের খবর নিতেন। আল্লাহ যাকে তার বান্দাদের দায়িত্ব দান করেন, তার উচিত অধীনদের সাথে দয়ার আচরণ করা, তাদের কল্যাণ কামনা করা ও খবরাখবর নেয়া এবং তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার স্বার্থে কাজ করা।

তিন. সাওয়াবের দিক থেকে রমযানের ওমরা হজ্জের সমতুল্য, কিন্তু এ কারণে রমযানের ওমরায় ফরয হজ্জের ফরয আদায় হবে না। এ ব্যাপারে সবাই একমত।  [ফাতহুল বারী: ৩/৬০৪; তুহফাতুল আহওয়াযী: ৪/৭]

চার. সময়ের মর্যাদার কারণে আমলের সওয়াব বেড়ে যায়, যেমন বেড়ে যায় একাগ্রতা ও ইখলাসের কারণে। [ফাতহুল বারী: ৩/৬০৪); আউনুল মাবুদ: ৫/৩২৩, ফায়যুল কাদির: ৪/৩৬১]

পাঁচ. এসব হাদীসের উদাহরণ, যেমন এসেছে সূরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান, অর্থাৎ সাওয়াবের বিবেচনায়, কিন্তু সূরা ইখলাস তিলাওয়াত করা পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করার সমান নয়।

ষষ্ঠ. রমযানের মর্যাদার কারণে ওমরা হজ্জের সমমর্যাদা লাভ করে, কারণ রমযান মাসে ওমরাকারী ওমরার ফযীলত ও  রমযানের ফযীলত লাভ করে। এ বরকতপূর্ণ সময় ও মক্কার পবিত্রতার কারণে ওই ওমরা হজ্জের সমান, যে হজ্জ যিলহজ্জ মাসের বরকতপূর্ণ সময় ও মক্কার পবিত্র স্থানে আদায় করা হয়। [মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৬/২৯৩]

দ্বিতীয়ত রমযানের ওমরায় রয়েছে অধিক কষ্ট, কারণ সওম অবস্থায় আমল কষ্টকর, বা সফরের কারণে যদি সওম ত্যাগ করে, তবু সফরের কষ্ট কম নয়, পরবর্তীতে আবার কাযার কষ্ট। এরূপ কষ্ট রমযান ব্যতীত অন্য মাসে হয় না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমরার নির্দেশ করে আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহাকে‎  বলেন:

«إِنَّها عَلى قَدْرِ نَصَبِك، أَو قَالَ: عَلى قَدْرِ نَفَقَتِك» رواه مسلم.

‘ওমরা হচ্ছে তোমার কষ্ট, অথবা বলেছেন: তোমার খরচ অনুপাতে।’ [মুসলিম: ১২১১; দেখুন, আল-মুফহিম: ৩/৩৭০]

সাত. রমযান মাসে ওমরাকারী এ সাওয়াব অর্জন করবে, চাই সে মক্কায় অবস্থান করুক, বা ওমরা শেষে বাড়ি ফিরুক।

আট. এ হাদীস প্রমাণ করে না যে, তান‘ঈম অথবা হেরেমের বাইরে গিয়ে একমাসে বারবার ওমরা করা, অথবা একদিনে বারবার ওমরা করা বৈধ। বর্তমান যুগে প্রচলিত এ আমল সুন্নাত পরিপন্থী, সাহাবীদের আমলের বিপরীত। তাদের কারো থেকে বর্ণিত নেই যে, তারা এক সফরে একাধিক ওমরা করেছেন।  [মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৬/২৯২; যাদুল মায়াদ: ২/৯৩; তাহযিবুস সুনান: ৭/৩৬]

নয়. রমযানে ওমরাকারী ও বায়তুল্লাহ শরীফে ইতিকাফকারীর কর্তব্য— আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হিফাজত করা। কারণ মক্কার পাপ অন্য স্থানের পাপের তুলনায় অধিক ক্ষতিকর, বিশেষভাবে যদি তা রমযানের মহান মাসে হয়।

দশ. পরিবার ও সন্তানসহ যে রমযান মাসে হারাম শরীফে অবস্থান করে, তার কর্তব্য পরিবার ও সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা, যেন তারা হারামে লিপ্ত না হয়, অন্যথায় সে সাওয়াবের পরিবর্তে পাপ ও গুনাসহ বাড়ি ফিরবে, যেহেতু সে তাদের প্রতি খেয়াল রাখেনি।

এগার. যখন রোযাবস্থায় ওমরার নিয়তে মক্কায় পৌঁছে, সে হয়তো সওম ভেঙ্গে ওমরা আদায় করবে, অথবা সূর্যাস্তের অপেক্ষা করে ইফতারের পর তা আদায় করবে। সওম ভঙ্গ করে ওমরা আদায় করাই উত্তম, কারণ ওমরার নিয়ম মক্কায় পৌঁছা মাত্র তা আদায় করা, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন।

১৭. সাহরীর ফযীলত: এক

আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«السَّحُورُ أَكْلُهُ بَرَكَةٌ فَلا تَدَعُوهُ وَلَو أَنْ يَجرَعَ أحَدُكُمْ جُرْعَةً مِنْ مَاءٍ فَإِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ ومَلائِكتَهُ يُصَلُّونَ عَلى المُتسَحِّرينَ» رَوَاهُ أَحْمَد.

‘সাহরী বরকতময় খাবার, তোমরা তা ত্যাগ করো না, যদিও তোমাদের কেউ মাত্র একঢোক পানি পান করে, কারণ আল্লাহ সাহরী গ্রহণকারীর ওপর রহমত প্রেরণ করেন ও ফেরেশতাগণ তাদের জন্য ইস্তেগফার করেন।’ [আহমাদ: ৩/১২; জামে সগির: ৪৮০১; গ্রন্থে সুয়ূতী হাদীসটি সহীহ বলেছেন। আলবানী সহীহুল জামে গ্রন্থে হাদীসটি হাসান বলেছেন।]

আবদুল্লাহ ইব্‌ন হারেস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন: ‘এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করেন, তখন তিনি সাহরী খাচ্ছিলেন, তিনি বললেন:

إِنَّ السَّحُورَ برَكَةٌ أَعْطَاكُمُوهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فَلا تَدَعُوهَا»

‘নিশ্চয় সাহরী বরকতময়, আল্লাহ তোমাদেরকে তা দান করেছেন, অতএব তোমরা তা ত্যাগ করো না।’  [আহমাদ: ৫/৩৭০; নাসাঈ: ৪/১৪৫; আলবানী, সহীহুল জামে: ১৬৩৬; গ্রন্থে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।

আবু সূআইদ রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى المُتسَحِّرينَ»

‘হে আল্লাহ সাহরী গ্রহণকারীদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।’ উবাদা ইব্‌ন নাসি বলেন: মুখে মুখে প্রচলিত ছিল: ‘সাহরী খাও, যদিও পানি দ্বারা হয়। কারণ প্রসিদ্ধ ছিল: সাহরী বরকতের খাবার।’ [ইব্‌ন আবী আসেম ফিল আহাদ ওয়াল মাসানি: ২৭৫৮; বায্‌যার: ৯৭৪; তাবরানী ফিল কাবীর: ২২/৩৩৭; হাদীস নং-৮৪৫; হাফেয ইব্‌ন হাজার হাদীসটি হাসান বলেছেন। দেখুন: মুখতাসার যাওয়ায়েদে মুসনাদিল বায্‌যার: ৬৯১]

ইবন উমার রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إنَّ اللهَ ومَلائِكتَهُ يُصَلُّونَ عَلى المُتسَحِّرِين» رواه ابن حبان.

‘নিশ্চয় আল্লাহ সাহরীর খাবার গ্রহণকারীদের উপর রহমত প্রেরণ করেন ও তার ফেরেশতাগণ তাদের জন্য ইস্তেগফার করেন।’  [সহীহ ইব্‌ন হিব্বান: ৩৪৬৭; আবু নায়িম ফিল হিলইয়াহ: ৮/৩২০; সহীহুল জামে: ১৮৪৪; এই গ্রন্থে আলবানী হাদীসটি হাসান বলেছেন। সিলসিলাতুস সাহীহাহ: ১৬৫৪।]

আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«نِعْمَ سَحُورُ المؤْمِنِ التَّمْر» رَوَاهُ أَبو دَاودَ.

‘খেজুর মুমিনদের উত্তম সাহরী।’ [আবু দাউদ: ২৩৪৫; বায়হাকী: ৪/২৩৬; সহীহ ইব্‌ন হিব্বান: ৩৪৭৫; আলবানী সহীহ আবু দাউদে বর্ণিত হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. সাহরী ফযীলতপূর্ণ, সাহরী আল্লাহর পক্ষ থেকে রুখসত ও বরকত। এ জন্য আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করব।

দুই. সাহরীর বরকত যেমন আল্লাহ সাহরী গ্রহণকারীদের ওপর দরুদ প্রেরণ করেন ও তাঁর ফেরেশতাগণ তাদের জন্য ইস্তেগফার করেন। আল্লাহর দরুদ প্রেরণ করার অর্থ হচ্ছে, তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করা, তাদের কর্মের সন্তুষ্টি প্রকাশ করা ও তাদের প্রশংসা করা। ফেরেশতাদের দরুদ প্রেরণ করার অর্থ হচ্ছে, তাদের জন্য ইস্তেগফার করা। [দেখুন: কাসিদা ইবনুল কাইয়েম: ২০; ফাতহুল বারী লি ইব্‌ন হাজার: ১১/১৫৬; ফায়যুল কাদির: ৩/১৩৭]

তিন. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহরী ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন, যা সাহরীর গুরুত্ব প্রমাণ করে।

চার. সামান্য বস্তু দ্বারা সাহরী হয়, যদিও তা একঢোক পানি। যেমনটি হাদীস থেকে স্পষ্ট।

পাঁচ. খেজুর সর্বোত্তম সাহরী, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসা করেছেন।

ছয়. মুসলিমদের উচিত এ সুন্নাত পালন করা।

১৮. সাহরীর ফযীলত: দুই

আনাস ইব্‌ন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«تَسَحَّرُوا فَإِنَّ في السَّحُور بَرَكَةً» رواه الشيخان.

‘তোমরা সাহরী খাও, কারণ সাহরীতে বরকত রয়েছে।’ [বুখারী: ১৮২৩; মুসলিম: ১০৯৫; অনুরূপ হাদিস বর্ণিত আছে, আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু‎ আবু সাঈদ, জাবের, আয়েশা. আমর ইব্‌ন আস, হুযায়ফা, ইরবায, আবু লাইলা, তালক, ইয়াশ ইব্‌ন তালক, উমার, উতবা ইব্‌ন আবদ, আবু দারদা ও সালমান রাদিআল্লাহু আনহু‎ প্রমুখদের থেকে। দেখুন: শারহু ইব্‌ন মুলাক্কিন আলাল উমদাহ: ৫/১৮৯; মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৩/১৫৪]

আমর ইবনুল ‘আস রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«فَصْلُ مَا بَينَ صِيامِنَا وصِيَامِ أَهْلِ الكِتَابِ أَكَلَةُ السَّحَر» رواه مسلم.

‘আমাদের সওম ও আহলে কিতাবদের সওমের পার্থক্য হচ্ছে সাহরী খাওয়া।’  [মুসলিম: ১৯৬]

ইরবায ইব্‌ন সারিয়াহ রাদিআল্লাহু আনহু‎ বলেন:

«دَعَاني رَسُولُ الله ﷺ إلى السَّحُور في رَمَضَانَ فقَالَ: هَلُمَّ إلى الغَدَاءِ المُباركِ»

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমযানে সাহরীতে আহ্বান করে বলেন, বরকতপূর্ণ খাবার খেতে আস।’ [আবু দাউদ: ২৩৪৪; আহআদ: ৪/১২৬; নাসাঈ: ৪/১৪৫; সহীহ ইব্‌ন খুযাইমাহ: ১৯৩৮; ইব্‌ন হিব্বান: ৩৪৬৫; আলবানী সহীহ আবু দাউদের হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

মিকদাদ ইব্‌ন মা‘দী কারীব রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«عَلَيْكُمْ بِغَدَاءِ السَّحُور؛ فَإِنَّهُ هُوَ الغَدَاءُ المبَارَك» رواه النسائي.

‘তোমরা অবশ্যই সাহরী খাবে, কারণ তা বরকতপূর্ণ খাবার।’ [নাসাঈ: ৪/১৪৬; আহমাদ: ৪/১৪২; আলবানী সহীহ নাসাঈতে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. সাহরীতে বরকত বিদ্যমান। আল্লাহ যেখানে ইচ্ছা তার মাখলুকে বরকত রাখেন, তন্মধ্যে সাহরী।

দুই. সকল আলেম একমত যে, সাহরী মোস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তবে এটি এ উম্মাতের একটি বৈশিষ্ট্য। [দেখুন: শারহু ইব্‌নুল মুলাক্কিন আলাল উমদাহ: ৫/১৮৮; যাখিরাতুল উকবা: ২০/৩৬৬]

তিন. সাহরীর বরকতসমূহ হচ্ছে—

১. সাহরী খাওয়া শরীয়তের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ দিয়েছেন, এতে রয়েছে বান্দার ইহকাল ও পরকালের সফলতা। [দেখুন: ফাতুহুল বারী: ৪/১৪০; তাওযীহুল আহকাম: ৩/১৫৫]

২. সাহরীতে আহলে কিতাবের বিরোধিতা রয়েছে, তারা সাহরী খায় না। [ফাতুহুল বারী: ৪/১৪০; শারহুন নববী আলা মুসলিম: ৭/২০৭]

 আর তাদের বিরোধিতা আমাদের দ্বীনের মূলনীতি। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের সাথে মিল রাখা ও তাদের আখলাক, বৈশিষ্ট্য গ্রহণ হারাম।

৩. সাহরীর ফলে সওম ও ইবাদতের শক্তি অর্জন হয়, ক্ষুধা ও পিপাসা থেকে সৃষ্ট খারাপ প্রভাব দূর হয়। [ফাতহুল বারী: ৪/১৪০]

৪. সাহরী গ্রহণকারী দু‘আ কবুলের মুহূর্তে ইস্তেগফার, যিকর ও দু‘আ করার সুযোগ লাভ করে, যা ঘুমন্ত ব্যক্তির নসিব হয় না। সাহরীর সময় ইস্তেগফারকারীদের আল্লাহ প্রশংসা করেছেন।

৫. সাহরী ভক্ষণকারী যথাসময়ে ফজর সালাতে হাজির হয়, অনেক সময় মসজিদে আগে এসে প্রথম কাতার ও ইমামের নিকটবর্তী দাঁড়ানোর সাওয়াব লাভ করে, আযানের জওয়াব দেয় ও ফজরের দু’রাকাত সুন্নাত আদায়ে সক্ষম হয়। হাদীসে এসেছে দুনিয়া ও তার মধ্যে বিদ্যমান সবকিছু থেকে ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত উত্তম।

৬. সাহরী গ্রহণকারী ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান করে বা সাহরীতে কাউকে অংশীদার করে সদকার সাওয়াব লাভ করতে পারে। [ফাতহুল বারী: ৪/১৪০]

৭. সাহরীতে রয়েছে আল্লাহর নিয়ামতের শোকর ও তার রুখসতের প্রতি সমর্থন, কারণ আল্লাহ আমাদের জন্য সূর্যাস্ত থেকে ফজর পর্যন্ত পানাহার বৈধ করেছেন, যা পূর্বে হারাম ছিল। [আউনুল মাবুদ: ৬/৩৩৬]

চার. মুসলিমদের কর্তব্য সাহরীতে বাড়াবাড়ি না করা, বিশেষভাবে যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘তোমরা তা ত্যাগ করো না।’ নেক নিয়াতে সাওয়াবের আশায় সাহরী ভক্ষণ করা, শুধু অভ্যাসে পরিণত করা নয়। [তাওযীহুল আহকাম: ৩/১৫৬; যাখিরাতুল উকবা: ২০/৩৬৬]

পাঁচ. সাহরীর দাওয়াত দেয়া ও দাওয়াত গ্রহণ করা বৈধ। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরবায ইব্‌ন সারিয়াকে তার সাথে সাহরী খেতে ও মিলিত হতে আহ্বান করেছেন। এক হাদীসে এরূপ এসেছে: ‘তোমরা বরকতপূর্ণ খানার জন্য আস।’ [নাসাঈ: ৪/১৪৫; আলবানী সহীহ নাসাঈতে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

ছয়. ইমাম খাত্তাবী (রাহি.) বলেছেন: ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন সহজ, তাতে কঠোরতা নেই। কিতাবীদের বিধান ছিল, তারা ইফতার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ফজর পর্যন্ত আর সাহরী খেতে পারত না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের থেকে তা রহিত করেছেন:

﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ١٨٧﴾ [البقرة: 187]

‘আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ‎ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট ‎হয়।‘ আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের জন্য আমরা তার শোকর আদায় করছি। [সূরা বাকারা: ১৮৭]; [মাআলেমুস সুনান: ২/৭৫৭], আউনুল মাবুদ: ৬/৩৩৬]

১৯. সাহরীর সময়: এক

ইব্‌ন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ أَذَانُ بِلالٍ مِنْ سُحُورِهِ فَإِنَّهُ يُؤَذِّنُ أَوْ قَالَ: يُنَادِي لِيَرْجِعَ قَائِمُكُمْ وَيُنَبِّهَ نَائِمَكُمْ وَلَيْسَ الفَجْرُ أَنْ يَقُولَ هَكَذا – وجَمَعَ يَحيَى بنُ سَعِيدٍ القَطَانُ كَفَّيْهِ – حَتَّى يَقُولَ هَكَذَا – ومَدَّ يَحيى إِصْبَعَيْهِ السَّبَابَتَينِ».

‘বেলালের আযান যেন তোমাদের কাউকে সাহরী থেকে বিরত না রাখে। কারণ সে আযান দেয় অথবা তিনি বলেছেন: সে ডাকে যেন তোমাদের জাগ্রতরা ফিরে যায় ও ঘুমন্ত‎‎রা জাগ্রত হয়। ফজর এটা নয় যে এরকম হবে (ইয়াহইয়া ইব্‌ন সায়িদ আল-কাত্তান ‎নিজ হাতের তালুদ্বয় জড়ো করে দেখালেন অর্থাৎ লম্বালম্বি অবস্থায় আলো প্রকাশ পেলেই তা ফজর হিসেবে ধর্তব্য হবে না, বরং তা সুবহে কাযিব)। যতক্ষণ না এরকম হবে, (ইয়াহয়াহ তার তর্জনীদ্বয় ‎প্রসারিত করলেন অর্থাৎ আলো ডানে বাঁয়ে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করলেই কেবল ফজর হিসেবে ধর্তব্য হবে, তখন তা হবে সুবহে সাদিক)।’  [বুখারী: ৬৮২০; মুসলিম: ১০৯৩]

সাহল ইব্‌ন সা‘দ রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: ‘আমি আমার পরিবারে সাহরী খেতাম, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ফজর সালাতের জন্য দ্রুত ‎ছুটতাম।’

বুখারীর অপর বর্ণনায় আছে: ‘আমার দ্রুততার কারণ ছিল— রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সিজদায় অংশগ্রহণ করা।’ [বুখারী: ৫৫২; দ্বিতীয় বর্ণনা বুখারী: ১৮২০; ও আবু ইয়ালা: ৭৫৩৩]

যির ইব্‌ন হুবাইশ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হুযাইফার সঙ্গে সাহরী করলাম, অতঃপর আমরা সালাতের জন্য চললাম। মসজিদে এসে দু’রাকাত সালাত আদায় করলাম, আর ইকামত আরম্ভ হলো, উভয়ের মাঝে সামান্য ব্যবধান ছিল।’  [নাসায়ী: ৪/১২৪; আলবানী সহীহ নাসায়ীর হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

‘যেন তোমাদের জাগ্রতরা ফিরে যায়’ অর্থাৎ: বেলাল রাতে আযান দেয়, তোমাদের জানানোর জন্য যে, ফজর বেশি দেরি নেই। সে তাহাজ্জুদে দণ্ডায়মানকারীদের আরামের জন্য ফিরিয়ে দেয়, যেন সামান্য ঘুমিয়ে উদ্যমসহ সকালে উঠতে পারে, অথবা বিতর পড়ে নেয় যদি তা পড়ে না থাকে; অথবা ফজরের জন্য প্রস্তুতি নেয়— পবিত্রতার প্রয়োজন বা অন্যান্য প্রয়োজন সেরে নেয়, যা ফজরের সময় জানার ফলে সম্ভব। [শারহুন নববী আলা মুসলিম: ৭/২০৪; আল-মুফহিম: ৩/১৫৩]

‘ঘুমন্তদের জাগ্রত করে’ অর্থাৎ ঘুমন্তরা যেন ঘুম থেকে জেগে ফজরের ‎প্রস্তুতি নেয়, সামান্য তাহাজ্জুদ আদায় করে, অথবা বিতর আদায় না করলে তা আদায় করে, অথবা সওমের ইচ্ছা থাকলে সাহরী খায়, অথবা গোসল বা ওযু সেরে নেয়, অথবা অন্যান্য প্রয়োজন সেরে নেয়। [শারহুন নববী আলা মুসলিম: ৭/২০৪; আল-মুফহিম: ৩/১৫৩]

শিক্ষা ও মাসায়েল

‎এক. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণ ফজরের শেষ সময় পর্যন্ত সাহরী বিলম্ব করতেন। তাদের কেউ সময় শেষ হওয়ার আশঙ্কায় সাহরী সংক্ষেপ করতেন। অতএব ফজরের পূর্ব পর্যন্ত সাহরী বিলম্ব করা সুন্নাত। [ফাতহুল বারী: ৪/১৩৮]

দুই. প্রয়োজনের সময় দ্রুত আহার করা জায়েয। এ বিষয়ে ইমাম বুখারী একটি অধ্যায় নির্ধারণ করেছেন, তা হলো— ‘সাহরী দ্রুত করার অধ্যায়’ শিরোনামে। ‎ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবী বাকর থেকে, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ‘রমযানে আমরা সালাতুল লাইল শেষে এতো দেরিতে বাড়ি যেতাম যে, খাদেমদের দ্রুত খাবার পরিবেশনের জন্য বলতাম, যেন ফজর ছুটে না যায়।’ ‎[মালিক: ১/১১৬; বায়হাকী: ২/৪৯৭]

২০. সাহরীর সময়: দুই

আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমার রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

«إِنَّ بِلالاً يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يُنَادِيَ ابنُ أُمِّ مَكْتُومٍ ثُمَّ قَالَ: وَكَانَ رَجُلاً أَعْمَى لا يُنَادي حَتَّى يقَالَ لَهُ: أَصْبَحْتَ أَصْبَحْتَ» رواه الشيخان.

‘নিশ্চয় বেলাল আযান দেয় রাতে, অতএব ‎‎তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ না আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম আযান দেয়। অতঃপর তিনি বলেন: সে ছিল অন্ধ, যতক্ষণ না তাকে বলা হতো— ‘ভোর করেছ, ভোর করেছ’— ততক্ষণ সে আযান দিত না”।

মুসলিমের অপর বর্ণনায় রয়েছে:

«كَانَ لِرَسُولِ الله ﷺ مُؤَذِّنانِ: بِلالٌ وابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ الأَعْمَى فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ: إِنَّ بِلالاً يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ فَكُلُوا واشْرَبُوا حَتَّى يُؤَذِّنَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُوم  قَالَ: وَلم يَكُنْ بَيْنَهُما إِلاّ أَنْ يَنْزِلَ هَذا ويَرْقَى هَذَا» .

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’জন মুয়াজ্জিন ছিল: বেলাল ও অন্ধ আবদুল্লাহ ইব্‌ন ‎উম্মে মাকতুম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: বেলাল রাতে আযান দেয় ‎সুতরাং তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ না ইব্‌ন উম্মে মাকতুম আযান দেয়। তিনি বলেন: তাদের দু’জনের সময়ের ব্যবধান ছিল একজন (আজানের স্থান ‎‎থেকে) নামতেন, অপরজন উঠতেন।‎’ [বুখারী: ৫৯২; মুসলিম: ১০৯২]

সামুরা ইব্‌ন জুনদুব রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ‎করেন:

«لا يَغُرَّنكُمْ مِنْ سُحُورِكُم أَذانُ بِلالٍ ولا بَياضُ الأُفِقِ المسْتَطِيلِ هَكَذا، حَتَّى يَسْتَطيرَ هَكَذا» وَحَكَاهُ حَمادُ بنُ زَيْدٍ بِيَدَيْهِ، قَالَ: يَعْنِي مُعْتَرِضاً. رواه مسلم

‘বেলালের আযান বা দিগন্তের লম্বা সাদা রেখা যেন তোমাদেরকে সাহরী থেকে ‎বিরত না রাখে, যতক্ষণ না তা এভাবে প্রলম্বিত হয়।’ হাম্মাদ ইব্‌ন যায়েদ দু’হাতে ইশারা করে তার ব্যাখ্যা দেন। তিনি ইঙ্গিত করলেন: অর্থাৎ প্রস্থের দিক থেকে প্রসারিত হওয়া। [সহীহ মুসলিম]

নাসাঈর এক বর্ণনায় আছে:

«لا يَغُرَّنكُمْ أَذانُ بِلالٍ، ولا هَذَا البَيَاضُ حَتَّى يَنْفَجِرَ الفَجْرُ هَكذَا وَهَكَذا» يَعْني: مُعْتَرضاً. قَالَ أَبو دَاوُدَ الطَيالِسيُ: وَبَسَطَ بِيدَيْهِ يَمِيناً وشِمالاً مَادَّاً يَدَيْهِ.

‘বেলালের আযান এবং এ শুভ্রতা যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে, যতক্ষণ না ফজর এভাবে এভাবে ছড়িয়ে পড়ে।’ অর্থাৎ প্রস্থের দিকে। আবু দাউদ তায়ালিসি বলেন: তিনি তার দু’হাত ডানে-বামে লম্বাকরে প্রসারিত করলেন। [মুসলিম: ১০৯৪; আবু দাউদ: ২৩৪৬; তিরমিযী: ৭০৬; নাসায়ী: ৪/১৪৮]

আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

«إِذَا سَمِعَ أَحَدُكُمْ النِّدَاءَ والإِنَاءُ عَلى يَدِهِ فَلا يَضَعْهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ مِنهُ»

‘যখন তোমাদের কেউ আযান শ্রবণ করে, আর হাতে থাকে খাবারের পাত্র, সে তা রাখবে না যতক্ষণ না সেখান থেকে তার প্রয়োজন পূর্ণ করে।’ [আবু দাউদ: ২৩৫০; আহমাদ: ২/৫১০; দারা কুতনি: ২/১৬৫; বায়হাকী: ৪/২১৮; হাকেম: ১/৫৮৮; তিনি মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন, ইমাম যাহাবী তার সমর্থন করেছেন।]

ইমাম আহমাদের এক বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে—

«وَكَانَ المؤَذِّنُ يُؤَذِّنُ إِذا بَزَغَ الفَجْرُ».

‘মুয়াজ্জিন আযান দিত যখন সুবহে সাদিকের আলো বিচ্ছুরিত হত।’ [আহমাদ: ২/৫১০; তাবারী ফি তাফসিরিহি: ২/১৭৫; বায়হাকী: ৪/২১৮]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. ফজর উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রীগমন বৈধ।

দুই. অন্ধ ব্যক্তির আযান দেয়া বৈধ, যদি সে সময় সম্পর্কে জানে বা তাকে জানানোর কেউ থাকে।

তিন. ফজরের জন্য দু’বার আযান দেয়া বৈধ: প্রথমবার ফজরের পূর্বে, দ্বিতীয়বার: ফজর উদয় হওয়ার পর।

চার. সওমের নিয়তের পর সাহরী খাওয়া বৈধ, পানাহারের কারণে পূর্বের নিয়ত নষ্ট হবে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর উদয়ের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার বৈধ করেছেন, অথচ ফজর উদয়ের পর নিয়ত বৈধ নয়। এ থেকে প্রমাণিত হয় নিয়তের স্থান খাবারের পূর্বে, তারপর পানাহারে সওম নষ্ট হবে না। অতএব কেউ মাঝরাতে আগামীকালের সওমের নিয়ত করে, শেষ রাত পর্যন্ত পানাহার করলে তার নিয়ত শুদ্ধ। ‎[আল-মুফহিম: ৩/১৫০; শারহুন নববী: ৭/২০৪; ফাতহুল বারী: ২/৯৯০-১০০; দিবায: ৩/১৯৪]

পাঁচ. ফজর উদয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলে পানাহার করা বৈধ, কারণ রাত অবশিষ্ট আছে এটাই স্বাভাবিক। দলিল নিম্নের আয়াত:

﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ١٨٧﴾ [البقرة: 187]

‘তোমরা পানাহার করতে থাক যতক্ষণ না ‎ফজরের সাদা রেখা থেকে কালো রেখা সুস্পষ্ট আলাদা না হয়ে যায়।” [সূরা বাকারা: ১৮৭]

সন্দেহকারীর নিকট ফজরের সাদা রেখা সুস্পষ্ট হয়নি, তাই সে সাহরী খেতে পারবে। আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু‎ থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত:

«كُلْ مَا شَكَكَتَ حتى يَتَبَينَ لكَ» رواه البيهقي ،

‘তোমার সন্দেহ পর্যন্ত তুমি খাও, যতক্ষণ না তোমার নিকট স্পষ্ট হয়।’ [ইমাম নববী বলেছেন: ‘যদি ফজর উদয়ে সন্দেহ হয়, তাহলে তার জন্য পানাহার ও স্ত্রীগমন বৈধ, এতে কারো দ্বিমত নেই, যতক্ষণ না ফজর স্পষ্ট হয়।’ মাজমু: ৬/৩১৩; দেখুন: যাখিরাতুল উকবা: ২০/৩৫৫]

এ বিধান তখন, যখন সে স্বচক্ষে ফজর দেখে নিশ্চিত হয়, কিন্তু সে যদি আযান অথবা ঘড়ির উপর নির্ভর করে, তাহলে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ তখন জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

ছয়. সাহরী খাওয়া ও তাতে বিলম্ব করা মোস্তাহাব।

সাত. ‘দুই মুয়াজ্জিনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান: একজন নামতেন, অপরজন উঠতেন।’ ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘এর অর্থ: বেলাল ফজরের পূর্বে আযান দিতেন, আযানের পর দু‘আ ইত্যাদির জন্য অপেক্ষা করতেন। অতঃপর ফজর পর্যবেক্ষণ করতেন, যখন ফজর ঘনিয়ে আসত, তিনি অবতরণ করে উম্মে মাকতুমকে খবর দিতেন। ইব্‌ন ‎উম্মে মাকতুম ওযু, ইস্তেঞ্জা সেরে প্রস্তুতি নিতেন, অতঃপর উপরে উঠে ফজর উদিত হওয়ার সাথে সাথে আযান আরম্ভ করতেন।’ [কুরতুবী এ ব্যাখ্যা উল্লেখ করে বলেন, এটাই যুক্তিযুক্ত। আল-মুফহিম: ৩/১৫১; দেখুন: শারহুন নববী: ৭/২০৪; দিবায: ৩/১৯৪]

আট. এ থেকে প্রমাণিত হয়, ফজরের পর রাত থাকে না, বরং তা দিনের অংশ। [আল-মুফহিম: ৩/১৫১; দিবায: ৩/১৯৪; দেখুন: ফাতহুল বারী: ২/১০১]

নয়. ব্যক্তির জন্য মায়ের পরিচয় গ্রহণ করা বৈধ, যদি লোকেরা তার মায়ের পরিচয়ে তাকে চিনে, বা তার প্রয়োজন হয়। [ফাতহুল বারী: ২/১০১]

দশ. প্রথম ফজর ও দ্বিতীয় ফজরে পার্থক্য তিনটি:

প্রথম পার্থক্য: দিগন্তের উত্তর থেকে দক্ষিণে লম্বালম্বি সাদা রেখা দ্বিতীয় ফজরের আলামত। আর উর্ধ্ব আকাশে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সাদা লম্বা রেখা প্রথম ফজরের আলামত।

দ্বিতীয় পার্থক্য: দ্বিতীয় ফজরের পর অন্ধকার থাকে না, বরং সূর্যোদয় পর্যন্ত ফর্সা ক্রমে বৃদ্ধি পায়। আর প্রথম ফজরে আলোর পর অন্ধকার মেনে আসে।

তৃতীয় পার্থক্য: দ্বিতীয় ফজরের সাদা রেখা দিগন্তের সাথে মিলিত থাকে। প্রথম ফজরে সাদা রেখা ও উর্ধ্ব আকাশের মাঝে অন্ধকার বিরাজ করে। [ফিকহুল ইবাদাত লী শায়খ উসাইমিন: ১৭২-১৭৩]

এগার. মুয়াজ্জিন যখন ফজরের আযান দেয়, তখন যদি রোযাদারের হাতে খাবার প্লেট থাকে, সে পানাহার পূর্ণ করবে, বন্ধ করবে না; হাদীসের বাহ্যিক অর্থ তাই বলে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাড়। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা কেবল তাঁরই জন্য। [‘মুখতাসারে মুনযিরীর’ উপর শায়খ আহমাদ শাকিরের টিকা: ৩/২৩৩; তামামুল মিন্নাহ লিল আলবানী: ৪১৭-৪১৮]

[চলবে]

মূল লেখক: ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-হাকিল
তরজমা: সানাউল্লাহ নজির আহমদ