সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

সিয়ামের মাসআলা-মাসায়েল: পাঁচ

POYGAM.COM
জুন ১৭, ২০১৭
news-image

এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মহান আল্লাহর রেজামন্দি লাভের অবারিত সুযোগ নিয়ে আমাদের কাছে এসেছে মাহে রমযান। সহীহ-শুদ্ধভাবে রোযা পালন এবং সিয়ামের মাসের অন্যান্য আমল যাতে সঠিকভাবে জেনে-বুঝে করা যায়, সেজন্য আমাদের এ আয়োজন। পয়গাম পাঠকদের জন্য  ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে রমযানের মাসআলা-মাসায়েল।

১১. তারাবীহ সালাতের বিধান

যায়েদ ইব্‌ন সাবেত রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাটাই দ্বারা একটি ছোট হুজরার ন্যায় বানিয়ে তাতে সালাত আদায়ের জন্য বের হন, লোকেরা তার পিছু নিল ও তার সাথে সালাত আদায় করতে লাগল। অতঃপর তারা পরবর্তী রাতে উপস্থিত হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলম্ব করলেন, বের হলেন না, তারা জোরে আওয়াজ দিতে লাগল ও দরজায় ছোট পাথর নিক্ষেপ করে জানান দিচ্ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট রাগান্বিত অবস্থায় বের হলেন, অতঃপর বললেন: তোমাদের এ কর্ম দেখে আমার ধারণা হচ্ছে তোমাদের ওপর এ সালাত ফরয করে দেয়া হবে, তোমরা তোমাদের ঘরে সালাত আদায় কর, কারণ ব্যক্তির সালাত ঘরেই উত্তম, শুধু ফরয ব্যতীত।” [বুখারি: ৫৭৬২মুসলিম: ৭৮১]

অপর বর্ণনায় আছে: “আমার আশঙ্কা হচ্ছে তোমাদের ওপর এ সালাত ফরয করা হবে, আর যদি ফরয করা হয় তোমরা তা আদায় করতে পারবে না।” [বুখারি: ৬৮৬০, মুসলিম: ৭৮১]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. দুনিয়ার প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনাসক্তি, তিনি খুব স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর আসবাব পত্র ব্যবহার করতেন।

দুই. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক ইবাদত করতেন, অথচ তার অগ্র-পশ্চাতের সকল পাপ মোচন করা হয়েছে।

তিন. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের প্রতি সাহাবীদের আগ্রহ।

চার. কিয়ামুল্লাইলের ফযিলত, বিশেষ করে রমযানে।

পাঁচ. মসজিদে নফল সালাত বৈধ। [শরহুন নববী আলাল মুসলিম: ৬/৬৯]

ছয়. তারাবির সালাত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত, তিনি এর সূচনা করেছেন। অতঃপর উম্মতের ওপর ফরয হওয়ার আশঙ্কায় তা ত্যাগ করেন। পুনরায় ওমর রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ তা জীবিত করেন। [ফাতহুল বারী: ৩/১৪]

সাত. আমির বা মুসলিমদের প্রধান যখন অভ্যাসের বিপরীত কিছু করেন, তখন তার কারণ বলে দেয়া উচিত, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। [ফাতহুল বারি: (৩/১৪), তারহুত দাসরিব: ৩/৯০]

আট. উম্মাতের ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া যে, তিনি তাদের ওপর ইবাদতের চাপ কমিয়ে দিয়েছেন। আমির ও মুরুব্বিদের উচিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আদর্শ অনুসরণ করা। [ফাতহুল বারি: ৩/১৪]

নয়. অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য কতক স্বার্থ ত্যাগ করা বৈধ, অনুরূপ অধিক গুরুত্বপূর্ণকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরী। [শারহুন নববী আলা মুসলিম: ৬/৬৯, ফাতহুল বারি: ৩/১৪]

দশ. জামাতের সাথে নফল আদায়ের সময় আযান ও ইকামত নেই, যেমন তারাবির সালাত। [ফাতহুল বারী: ৩/১৪, তারহুত তাসরিব: ৩/৯০]

এগার. নফল সালাত মসজিদের তুলনায় ঘরে পড়া অধিক উত্তম, তবে যে নফল জামাতসহ পড়া উত্তম তা ব্যতীত, যেমন ইসতেশকা ও তারাবীর সালাত। [শারহুন নববী আলাল মুসলিম: ৬/৭০, মিরকাতুল মাফাতিহ: ৩/৩৩৪]

১২. সিয়াম পাপ মোচনকারী

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿إِنَّمَآ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَأَوۡلَٰدُكُمۡ فِتۡنَةٞۚ وَٱللَّهُ عِندَهُۥٓ أَجۡرٌ عَظِيمٞ ١٥﴾ [التغابن:15]

“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো ‎‎কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর ‎নিকটই মহান প্রতিদান।” [সূরা তাগাবুন: ১৫]

﴿وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةٗۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٣٥﴾ [الأنبياء:15]

“আর ভাল ‎ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে ‎‎থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে ‎আসতে হবে।” [সূরা আম্বিয়া: ৩৫]

আয়াতদ্বয়ে ‘ফিতনা’ শব্দটি পরীক্ষা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইব্‌ন আব্বাস রাদি‘আল্লাহু আনহু এর অর্থ বলেন: “আমি তোমাদেরকে সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা, প্রাচুর্য-দারিদ্র, হালাল-হারাম, পাপ-পুণ্য এবং ‎‎হেদায়েত ও গোমরাহির মাধ্যমে পরীক্ষা করব।” [তাফসিরে ইব্‌ন কাসীর: ৩/২৮৬]

হুযাইফা রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ বলেন, উমার রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ বলেছেন:

«مَنْ يَحفَظُ حَدِيثاً عَنِ النَّبيِّ ﷺ في الفِتنَة؟ قَالَ حُذَيْفَةُ: أَنا سَمِعْتُهُ يَقُولُ: فِتنَةُ الرَّجُلِ في أَهْلِهِ ومَالِهِ وجَارِهِ تُكَفِّرُهَا الصَّلاةُ والصِّيامُ والصَّدَقَةُ»

“ফেতনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস কার মনে আছে? হুযাইফা রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ ‎বলেন: আমি তাকে বলতে শুনেছি, ব্যক্তির ফিতনা তার ‎পরিবার-পরিজনে, মাল-সম্পদে ও তার প্রতিবেশীর মধ্যে, যার কাফফারা হয় সালাত, ‎সিয়াম ও সদকা।” [বুখারী: ১৭৯৬, মুসলিম: ১৪৪]

আবু হুরাইরা রাদি‘আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‎

«لِكُلِّ عَمَلٍ كَفَّارَةٌ، والصَّوْمُ لي وَأَنَا أَجْزِي به…» رواه البخاري .

“প্রত্যেক আমলের প্রতিদান রয়েছে, আর সাওম হচ্ছে আমার জন্য, আমি এর প্রতিদান দেব।” [বুখারি: ৭১০০, আহমদ: ২/৫০৪]

মুসনাদে আহমাদে রয়েছে:‎

«كُلُّ العَمَلِ كَفَّارَةٌ والصَّوْمُ لي وَأَنَا أَجْزِي به…»

“প্রত্যেক আমল কাফফারা, আর সওম আমার জন্য, আমি তার প্রতিদান দেব।” [আহমাদ: ২/৪৫৭, তায়ালিসি: ২৪৮৫]

অপর বর্ণনায় আছে:

«كُلُّ العَمَلِ كَفَّارَةٌ إِلَّا الصَّوْمَ لي وَأَنَا أَجْزِي به…» .

“প্রত্যেক আমল কাফফারা, তবে সাওম আমার জন্য, আমি তার প্রতিদান ‎‎দেব।” [এ হাদীস ইব্‌ন রাহওয়াইহ থেকে বর্ণিত, মাজমাউয যাওয়ায়েদে হায়সামি তা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেছেন: ৩/১৭৯, তিনি বলেছেন: এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ গ্রন্থের বর্ণনাকারী।]

আবু হুরায়রাহ রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন: ‎

«الصَّلَواتُ الخَمسُ، والجُمعَةُ إلى الجُمُعةِ، ورَمَضَانُ إلى رَمَضَانَ، مُكَفِّراتٌ مَا بَينَهنَّ إذا اجْتُنِبَتْ الكَبَائرُ» رواه مسلم.

“পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুম‘আ থেকে অপর জুম‘আ, এক রমযান থেকে অপর রমযান— ‎মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফফারাস্বরূপ, যদি কবীরাহ গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়।” [মুসলিম: ২৩৩]

আবু সাঈদ খুদরি রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‎বলতে শুনেছি: ‎

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وعَرَفَ حُدُودَهُ وتَحفَّظَ مما كَانَ يَنبَغِي لَه أَنْ يَتَحَفَّظَ فيهِ كَفَّرَ ما قَبْلَه» رَوَاهُ أَحْمَدُ وَصَحَّحَهُ ابنُ حِبانَ.

“যে রমযানের সাওম পালন করল, তার সীমারেখা ঠিক রাখল এবং যা থেকে বিরত থাকা দরকার তা থেকে সে বিরত থাকল, তার পূর্বের পাপ মোচন করা হবে।” [আহমদ: ৩/৫৫, আবু ইয়ালা: ১০৫৮, বায়হাকী: ৪/৩০৪, সহীহ ইব্‌ন হিব্বান: ৩৪৩৩]

শিক্ষা ও মাসায়েল

‎এক. কল্যাণ-অকল্যাণ উভয় দ্বারা মানুষকে পরীক্ষা করা হয়, কল্যাণের পরীক্ষা যেমন: অধিক সম্পদ ও নিয়ামত। অকল্যাণের পরীক্ষা যেমন: বিপদ-আপদ দুঃখ-‎‎বেদনা, রোগ-ব্যাধি লেগে থাকা।‎

‎দুই. সন্তান ও সম্পদ মানুষের জন্য পরীক্ষা, কারণ মানুষ তাদের মহব্বত, ভালবাসা ও হিতকামনায় আল্লাহর হক নষ্ট করে, পরকালে যা শাস্তির কারণ। তাদের দ্বারা পরীক্ষার অপর দিক হলো, শরীয়ত আমাদেরকে তাদের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়েছে, যেমন তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, ভরণ-‎‎পোষণ ইত্যাদির ব্যবস্থা করা, সেসব বিষয়ে ত্রুটি করা পরকালে শাস্তির কারণ। [ শারহুন নববী আলা মুসলিম: ২/১৭১]

‎তিন. পাপ ও নাফরমানী ফিতনার অন্তর্ভুক্ত, যেমন বেগানা নারী অথবা হারাম মালে জড়িত ব্যক্তি ফিতনায় পতিত, অনেক সময় নেককার লোকেরা এতে পতিত হয়। [আত-তামহিদ লি ইব্‌ন আবদি বার: ১৭/৩৯৪]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ إِذَا مَسَّهُمۡ طَٰٓئِفٞ مِّنَ ٱلشَّيۡطَٰنِ تَذَكَّرُواْ فَإِذَا هُم مُّبۡصِرُونَ ٢٠١﴾ [الأعراف: 201]

“নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, যখন ‎তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা ‎‎স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। ‎তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [সূরা আরাফ: ২০১]

তিনি অন্যত্র বলেন:

﴿وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَٰحِشَةً أَوۡ ظَلَمُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ ذَكَرُواْ ٱللَّهَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ لِذُنُوبِهِمۡ وَمَن يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ وَلَمۡ يُصِرُّواْ عَلَىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ ١٣٥﴾ [آل عمران: 135]

“আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করলে অথবা ‎নিজদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ ‎করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা ‎চায়। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে‎‎? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা ‎বার বার করে না।” [সূরা আলে-ইমরান: ১৩৫)]

চার. কোন গুনাহে যে বারবার লিপ্ত হয়, তার উচিত অধিক সাওয়াবের কাজ করা, ‎‎কেননা নেক কাজ গুনাহ মুছে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿إِنَّ ٱلۡحَسَنَٰتِ يُذۡهِبۡنَ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِۚ ١١٤﴾[هود: 114]

“নিশ্চয়ই ভালকাজ মন্দকাজকে মিটিয়ে দেয়। ‎এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।” [সূরা হুদ: ১১৪]

সন্দেহ নেই, অধিক পরিমাণ নেক কাজ গুনাহের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। অতঃপর আল্লাহ তার নেক আমলের কারণে ‎তাকে খালেস তওবা করার তওফীক দান করেন।

পাঁচ. এসব হাদীস প্রমাণ করে সিয়াম কাফফারা। সুতরাং আবু হুরাইরার হাদীসে বর্ণিত ‘সিয়াম কাফফারা নয়’ এর অর্থ হচ্ছে, সাধারণ আমল শুধু কাফফারা, কিন্তু সিয়াম কাফফারা হওয়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত সাওয়াবও আছে। একনিষ্ঠ-ভাবে আল্লাহর জন্য সম্পাদিত সিয়ামে এ ফযীলত লাভ হবে। [ফাতহুল বারী: ৪/১১১]

ছয়. ইমাম নববী (রাহি.) বলেন: “কখনো বলা হয়: ওযু যদি গোনাহের কাফফারা হয় তাহলে সালাত কিসের কাফফারা? আর সালাত যদি কাফফারা হয়, তাহলে জামাতের সালাত, ‎রমযানের সাওম, আরাফার সাওম, আশুরার সাওম এবং ফেরেশতাদের আমীনের সাথে বান্দার ‎আমীনের মিল কিসের কাফফারা? কারণ এসব আমল সম্পর্কে বর্ণিত আছে এগুলো কাফফারা। আলেমগণ এর উত্তর ‎দিয়েছেন: এসব আমল কাফফারার যোগ্য, যদি কাফফারা করার জন্য ছোট পাপ থাকে, তাহলে তার কাফফারা করে, যদি ছোট-বড় পাপ না থাকে, তাহলে এর দ্বারা নেকী লিখা হয় ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। আর যদি কোন করীরা গোনাহয় লিপ্ত হয়, আশা করি এ কারণে তা হালকা হবে। [শারহুন নববী: ৩/১১৩, আদ-দিবায আলা মুসলিম: ২/১৭]

সাত. এসব আমল দ্বারা বান্দার হক মাফ হয় না, ছোট বা বড় নেক আমলের কারণে কোন হক মাফ হয় না। বরং তা থেকে অবশ্যই মুক্ত হতে হবে, অথবা তার থেকে হালাল করে নিতে হবে। [তানবিরুল হাওয়ালেক: ২/৪২, তুহফাতুল আহওয়াযি: ১/৫৩৫]

আট. সিয়ামের ফলে পাপ মোচন হয়।

নয়. সিয়ামের এসব ফযীলত সে লাভ করবে, যে সাওম বিনষ্টকারী বস্তু থেকে স্বীয় সাওম হিফাযত করবে, যেমন আবু সাঈদ খুদরির হাদীসে এসেছে:

«وعَرَفَ حُدُدَهُ وتَحَفَّظَ ممَا كَانَ ينْبَغِي لهُ أنْ يتَحَفَّظَ فِيه»

“সাওমের সীমারেখা ঠিক রাখল ও সেসব বস্তু থেকে নিরাপদ থাকল, যা থেকে নিরাপদ থাকা জরুরী।”

সারকথা, মুসলিমদের উচিত রমযানের রাত-দিন হারাম কথা যেমন গীবত, পরনিন্দা ও হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেকে হিফাযত করা, যা টেলিভিশন-ইন্টারনেট ও বিভিন্ন প্রচার যন্ত্রে প্রচার করা হয়, যার কুফল অন্যান্য সময়ের চেয়ে রমযানে বেড়ে যায়। আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত ও সঠিক পথে থাকার তাওফীক দান করুন।

১৩. সাদা তাগা ও কালো তাগার অর্থ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ١٨٧﴾ [البقرة: 187]

“আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ‎ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট ‎হয়।” [সূরা বাকারা: ১৮৭]

আদী ইব্‌ন হাতিম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: যখন নাযিল হল:

﴿حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ١٨٧﴾ [البقرة :187]

“যতক্ষণ না ‎ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট ‎হয়।” [সূরা বাকারা: ১৮৭]

আমি একটি কাল রশি ও একটি সাদা রশি হাতে নেই এবং তা আমার বালিশের নিচে রেখে দেই। অতঃপর আমি রাতে বারবার তাকাতে থাকি, কিন্তু আমার নিকট তা স্পষ্ট হয়নি। প্রত্যূষে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ ঘটনার বর্ণনা দেই। তিনি বললেন: এটা হচ্ছে রাতের কাল রেখা ও দিনের সাদা রেখা।” [বুখারী : ১৮১৭, মুসলিম: ১০৯০]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নে সাহাবীরা ছিলেন অধীর আগ্রহী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিলকৃত ওহী তারা দ্রুত বাস্তবায়ন করতেন। অপর বর্ণনায় এসেছে: আদী ইবন হাতিম রাদি‘আল্লাহু আনহু বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে যা বলেছেন সব বুঝেছি, তবে সাদা তাগা ও কালো তাগা ব্যতীত। আমি গত রাতে দুটি তাগা সঙ্গে করে ঘুমাই, একবার এদিকে, আরেক বার সে দিকে তাকাতে থাকি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। অতঃপর বললেন: এ কালো তাগা আর সাদা তাগার অর্থ আসমানে বিদ্যমান রাত-দিনের সাদা-কালো রেখা।” [তাবরানী ফিল কাবির: ১৭/৭৯]

দেখার বিষয় আদী (রা.) এ আয়াতের অর্থ বাস্তবায়নের জন্য বালিশের নিচে সাদা ও কালো তাগা পর্যন্ত রেখেছেন। [আল-মুফহিম: ৩/১৪৮-১৫০]

দুই. সাহাবায়ে কেরাম ইবাদত সংক্রান্ত বিষয়ে জটিলতা সৃষ্টি না হলে প্রশ্ন থেকে নিবৃত থাকতেন। বুঝার জন্য তারা যথাযথ চেষ্টা করতেন, যখন অপারগ হতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করতেন। অনুরূপ প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য প্রথমে জিজ্ঞাসা না করে বুঝার চেষ্টা করা, ইবাদত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জটিলতা ব্যতীত জিজ্ঞাসা না করা।

তিন. আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ١٨٧﴾ [البقرة: 187]

“আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ‎ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট ‎হয়।” [সূরা বাকারা: ১৮৭]

এর অর্থ হচ্ছে: তোমরা খাও এবং পান কর, যতক্ষণ না দিনের সাদা রেখা রাতের কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। আর এটা হয় সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর।” [ইব্‌ন কাসীর: ১/২২২, ফাতহুল বারী: ৪/১৩৪]

চার. কঠিন মাসআলা ও দুর্বোধ্য শব্দসমূহ বিজ্ঞ আলেমদের নিকট জিজ্ঞাসা করা।

পাঁচ. এ আয়াত প্রমাণ করে যে, ফজরের পরবর্তী সময় দিনের অংশ, রাতের নয়। [শারহুন নববী আলা মুসলিম: ৭/২০১, ফাতহুল বারী: ৪/১৩৪]

ছয়. ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত পানাহার বৈধ। পানাহার অবস্থায় যদি কারো ফজর উদিত হয়, আর সে মুখের খানা বের করে ফেলে, তার সাওম শুদ্ধ, খেতে থাকলে সাওম শুদ্ধ হবে না। [ফাতহুল বারী: ৪/১৩৫]

১৪. ঋতুবতী নারীর ইফতার ও কাযা

মুয়াযাহ বিনতে আবদুল্লাহ আল-আদাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আমি আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহাকে বলি: “ঋতুবতী কেন সাওম কাযা করে, সালাত কাযা করে না? তিনি বললেন: তুমি কি হারুরী? আমি বললাম: আমি হারুরি না, কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করছি। তিনি বললেন: আমাদের এমন হত, অতঃপর আমাদেরকে শুধু সাওম কাযার নির্দেশ দেয়া হত, সালাত কাযার নির্দেশ দেয়া হত না।” [বুখারী: ৩১৫, মুসলিম: ৩৩৫]

মুয়াযাহ থেকে ইমাম তিরমিযীর এক বর্ণনায় রয়েছে— সে আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহাকে বলে: “আমাদের প্রত্যেকে কি ঋতুকালীন সালাত কাযা করবে? তিনি বললেন: তুমি কি হারুরী? আমাদের কারো ঋতুস্রাব হলে, কাযার নির্দেশ দেয়া হত না।” [তিরমিযী: ১৩০]

আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ঋতুবতী হতাম, অতঃপর পবিত্রতা অর্জন করতাম, তিনি আমাদেরকে সওম কাযার নির্দেশ দিতেন, কিন্তু সিয়াম কাযার নির্দেশ দিতেন না।” এ হাদিস ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন হাদীসটি হাসান। অতঃপর তিনি বলেন: “এ হাদীস অনুযায়ী আহলে ইলমের আমল, অর্থাৎ ঋতুবতী নারী সিয়াম কাযা করবে, সালাত কাযা করবে না। এ ব্যাপারে তাদের দ্বিমত সম্পর্কে জানি না।” [তিরমিযী: ৭৮৭]

আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহা “তুমি কি হারুরী” বলে, এ প্রশ্নের প্রতি অনীহা ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। হারুরী খারেজি সম্প্রদায়ের একটি গ্রুপ। কুফার নিকটে অবস্থিত হারুরা শহরে তাদের বসতি, এ জন্য তাদেরকে হারুরী বলা হয়, সেখান থেকে তাদের উৎপত্তি। তাদের মধ্যে ছিল দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা। [ফাতহুল বারী: ১/৪২২]

তাদের কেউ হাদীস ও ইজমার বিপরীত ঋতুবতী নারীর উপর ঋতুকালীন সালাতের কাযার নির্দেশ দিত। [দেখুন: আল-মুগনি: (১/১৮৮, হাশিয়া সিনদি আলা সুনানে নাসায়ি: ৪/১৯১, উমদাতুল কারি: ৩/৩০০]

এ জন্য তিনি বিরক্তি প্রকাশক শব্দ দ্বারা তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তুমি কি তাদের কেউ?

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা হারাম। কুরআন-হাদীসের সীমারেখায় অবস্থান করা ও সে অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। আল্লাহর দেয়া শিথিলতা বা রুখসত গ্রহণ করা। দ্বীনের ব্যাপারে যেরূপ বাড়াবাড়ি খারাপ, অনুরূপ বাহানা তালাশ নিন্দনীয়। মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, অর্থাৎ কুরআন-হাদীসের ওপর আমল করা।

দুই. দ্বীনের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপকারীদের নিষেধ করা বৈধ, যেন সঠিকভাবে শরীয়তের বাস্তবায়ন হয় এবং কোন সমস্যার সৃষ্টি না হয়।

তিন. কোন প্রশ্নের কারণে প্রশ্নকারী সম্পর্কে যদি মুফতির মনে খারাপ ধারণা জন্মায় তাহলে প্রশ্নকারীর ব্যাখ্যা দেয়া উচিত যে, তিনি গোড়া নন বরং জানতে ইচ্ছুক, যেমন মুয়াযাহ বলেছেন: ‘আমি হারুরী নই, কিন্তু প্রশ্ন করছি’ তখন মুফতির কর্তব্য দলিল দ্বারা তার প্রশ্ন দূর করা, যেমন আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহা‎ করেছেন।

চার. শরীয়তের মূল ভিত্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ। এ জন্য আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহা তাকে বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাওম কাযার নির্দেশ দিতেন, সালাত কাযার নির্দেশ দিতেন না। অর্থাৎ যদি সালাতের কাযা ওয়াজিব হত, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই তাদের কাযা করার নির্দেশ দিতেন। কারণ তিনি ছিলেন উম্মাতের সবচেয়ে হিতাকাঙ্ক্ষী, তিনি উম্মাতের জন্য প্রত্যেক বিষয় স্পষ্ট করে গেছেন। [উমদাতুলকারী: ৩/৩০১] মুসলিমের কর্তব্য আল্লাহর নির্দেশে পরিপূর্ণ সোপর্দ হওয়া, তার শরীয়তকে সম্মান প্রদর্শন করা ও দলিলের সামনে থেমে যাওয়া। আদেশগুলো বাস্তবায়ন করা, যেহেতু শরীয়তের আদেশ, নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকবে, যেহেতু শরীয়তের নিষেধ, কারণ বুঝা যাক বা না যাক।

পাঁচ. ইব্‌ন আবদিল বার (রাহি.) বলেছেন: “ঋতুবতী নারী সিয়াম পালন করবে না, বরং কাযা করবে, তবে সালাত কাযা করবে না। এ বিষয়ে উম্মাতের ইজমা রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ! সকল মুসলিম যেখানে একমত, সেটা সঠিক ও চূড়ান্ত সত্য।” [তামহিদ: ২২/১০৭]

ছয়. নারীর ওপর ইসলামী শরীয়তের ছাড় এই যে, তাদেরকে সালাত কাযার নির্দেশ দেয়া হয়নি, কারণ সালাত দিনে একাধিক বার, যার কাযা খুব কষ্টকর। এ জন্য নারীদের উচিত আল্লাহর শোকর আদায় করা।

সাত. নারী যদি ফজর উদিত হওয়ার সময় পাক হয়, তাহলে সে দিনের সাওম তার শুদ্ধ হবে না, কাযা করা জরুরী, কারণ যখন ফজর উদিত হয়েছে, তখন সে ঋতুবতী। নারী যদি সূর্যাস্তের সামান্য আগে ঋতুবতী হয়, তাহলে তার সওম বাতিল, কাযা করা ওয়াজিব। [ফাতাওয়া লাজনায়ে দায়েমা: ১০/১৫৫, ফাতাওয়া নং: ১০৩৪৩]

নয়. নারী যদি সূর্য অস্ত যাওয়ার সামান্য পর ঋতুবতী হয়, তাহলে সে দিনের সাওম শুদ্ধ।

দশ. নারী যদি সাওম অবস্থায় রক্ত আসার বিষয় অথবা তার ব্যথা অনুভব করে, সূর্যাস্তের আগে বের না হয়, তাহলে তার সাওম শুদ্ধ। [‘ফাতাওয়া আল-জামেয়াহ লিল মারআল মুসলিমাহ’ লি ইব্‌ন উসাইমিন: ১/৩২৫]

এগার. এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, অসুস্থ ব্যক্তি সওম ভঙ্গ করতে পারবে, যদিও তার সওমের ক্ষমতা থাকে, যদি রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। কারণ ঋতুবতী নারী একেবারে দুর্বল হয় না, বরং রক্ত বের হওয়ার কারণে তার ওপর সাওম কষ্টকর, আর রক্ত বের হওয়া একটি রোগ। [শারহু ইব্‌ন বাত্তাল আলাল বুখারী: ৪/৯৭-৯৮]

১৫. রোযাদারকে ইফতার করানোর ফযীলত

জায়েদ ইব্‌ন খালেদ জুহানি রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَن فَطَّرَ صَائماً كَانَ له مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لا يَنقُصُ مِن أَجْرِ الصَّائِمِ شَيئاً»

“যে রোযাদারকে ইফতার করাল, রোযাদারের অনুরূপ সাওয়াব তারও হবে, তবে রোযাদারের নেকি ‎বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।” [তিরমিযী: ৮০৭, ইব্‌ন মাজাহ: ১৭৪৬, নাসায়ী ফিল কুবরা: ৩৩৩০-৩৩৩১, সহীহ ইব্‌ন খুযাইমাহ: ২০৬৪, ইব্‌ন হিব্বান: ৩৪২৯, নাসায়ী আয়েশা থেকে মওকুফ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন, দেখুন: নাসায়ী ফিল কুবরা: ৩৩৩২, আবদুর রায্‌যাক আবু হুরায়রা থেকে মওকুফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, দেখুন: আবদু রায্‌যাক: ৭৯০৬]

অপর বর্ণনায় আছে—

«مَنْ فَطَّر صَائماً أَطعَمَهُ وسَقَاهُ كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنقُصَ مِنْ أَجْرِهِ شَيء».

“যে রোযাদারকে ইফতার করাল, তাকে পানাহার করাল, তার রোযাদারের সমান সওয়াব হবে, তবে তার নেকি থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।” [ আবদুর রায্‌যাক: ৭৯০৫, তাবরানী ফিল কাবির: ৫/২৫৬, হাদীস নং: ৫২৬৯]

আবু হুরায়রা রাদি‘আল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত। তাকে এক মহিলা ইফতারের জন্য দাওয়াত করল, তিনি তাতে সাড়া দিলেন এবং বললেন: “আমি তোমাকে বলছি, যে গৃহবাসী কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, তাদের জন্য তার ‎অনুরূপ সওয়াব হবে। মহিলা বলল: আমি চাই আপনি ইফতারের জন্য আমার কাছে কিছুক্ষণ অবস্থান করুন, বা এ জাতীয় কিছু বলেছে। তিনি বললেন: আমি চাই এ নেকি আমার পরিবার ‎হাসিল করুক। ‎[মুসান্নাফ ইবন আবদু রায্‌যাক: ৭৯০৮]

শিক্ষা ও মাসায়েল

এক. আল্লাহ তা‘আলার অসীম অনুগ্রহ যে, তিনি কল্যাণের নানা ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছেন। যেমন তিনি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করার আহ্বান জানিয়ে মহান সওয়াবের ঘোষণা দিয়েছেন। [আরেযাতুল আহওয়াযী: ৪/২১]

দুই. রোযাদারকে ইফতার করানো একটি ফযীলতপূর্ণ আমল, যে রোযাদারকে ইফতার ‎করাবে সে তার মতো নেকী লাভ করবে।

তিন. রোযাদারকে ইফতার করালে তার বদলা আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে প্রদান করেন, রোযাদারের পক্ষ থেকে নয়। অতএব রোযাদারের সামান্য নেকী হ্রাস হবে না, এটা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের আলামত। [ফায়যুল কাদীর: ৬/১৮৭]

চার. এ থেকে বুঝা যায় ইফতারের দাওয়াত গ্রহণ করা বৈধ, বুজুর্গী দেখিয়ে বা ‎‎নেকি কমার আশঙ্কায় তা প্রত্যাখ্যান করা বাড়াবাড়ি। কারণ অপরের নিকট ‎ইফতার করলে রোযাদারের পুণ্য কমে না। তবে শুধু মিসকীনদের জন্য ইফতারের দাওয়াত হলে, সেখানে ধনীদের যাওয়া ঠিক নয়।

পাঁচ. আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচার ও তাদের খুশির জন্য দাওয়াতে সাড়া দেয়া ও ইফতার করা বৈধ, যেন তাদের পুণ্য হাসিল হয়, যেমন আবু হুরায়রা রাদি‘আল্লাহু আনহু করেছেন।

ছয়. যে ইফতার করাবে, সে নেকী ও অপরের প্রতি ইহসানের নিয়ত করবে, বিশেষ করে রোযাদার যদি গরিব হয়।

সাত. রোযাদারকে বাসায় নিয়ে আপ্যায়ন করা, বা খাবার প্রস্তুত করে তার জন্য পাঠিয়ে দেয়া ইফতার করানোর শামিল, তবে অপচয় না করা, বিশেষ করে রকমারি ইফতারের এ যুগে।

আট. কেউ যদি গরিবকে টাকা দেয়, যার কিছু দিয়ে সে ইফতার করল, বাকিটা সংগ্রহে রেখে দিল, বাহ্যত তা ইফতার করানোর হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে, অধিকন্তু সে আর্থিকভাবে উপকৃত হল।

[চলবে]

মূল লেখক: ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-হাকিল
তরজমা: সানাউল্লাহ নজির আহমদ