সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

সিয়ামের মাসআলা-মাসায়েল: চার

POYGAM.COM
জুন ১৩, ২০১৭
news-image

এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মহান আল্লাহর রেজামন্দি লাভের অবারিত সুযোগ নিয়ে আমাদের কাছে এসেছে মাহে রমযান। সহীহ-শুদ্ধভাবে রোযা পালন এবং সিয়ামের মাসের অন্যান্য আমল যাতে সঠিকভাবে জেনে-বুঝে করা যায়, সেজন্য আমাদের এ আয়োজন। পয়গাম পাঠকদের জন্য  ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে রমযানের মাসআলা-মাসায়েল।

৯. রোযাদারের গোসল ও শীতলতা অর্জন করা

আয়েশা রাদি‘আল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:

«كانَ رَسُولُ الله ﷺ يُصْبِحُ جُنُباً ثُم يَغتَسِلُ ثم يَغْدُو إلى المسْجِدِ ورَأسُهُ يَقطُرُ ثم يَصُوم ذَلكَ اليَوم» رواه أحمد.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যূষ করতেন নাপাক অবস্থায়, অতঃপর গোসল করে মসজিদে যেতেন, তখনো তার মাথা থেকে পানি টপকাত, অতঃপর সেদিনের সওম পালন করতেন।  [আহমদ: ৬/৯৯, নাসায়ি ফিল কুবরা: ২৯৮৬, আবু ইয়ালা: ৪৭০৮, বায্‌যার: ১৫৫২, তায়ালিসি: ১৫০৩, তার সনদ সহিহ, হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমে আছে অন্য শব্দে।‎]

আবু বকর ইব্‌ন আবদুর রহমান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:

«كانَ رَسُولُ الله ﷺ يُصْبِحُ جُنُباً ثُم يَغتَسِلُ ثم يَغْدُو إلى المسْجِدِ ورَأسُهُ يَقطُرُ ثم يَصُوم ذَلكَ اليَوم» رواه أحمد.

‎আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরজ নামক স্থানে দেখেছি, তিনি সওম অবস্থায় মাথায় পানি দিচ্ছেন, পিপাসার কারণে অথবা গরমের কারণে। [আবু দাউদ: ২৩৬৫, আহমাদ: ৩/৪৭৫, মুআত্তা মালেক: ১/২৯৪, তার থেকে মুসনাদে শাফি: ১/১৫৭, হাকেম: ১/৫৯৮, হাদীসটি সহীহ বলেছেন ইব্‌ন আবদিল বার, ফিত তামহিদ: ২২/৪৭, হাফেয ফি তাগলিকিত তালিক: ৩/১৫৩, আইনি ফি উমদাতিল কারি: ১১/১১, আলবানি: ফী সহীহ আবু দাউদ]

ইমাম বুখারী (রাহি.) বলেন: ইবনে উমার রাদিআল্লাহু আনহু সওম অবস্থায় কাপড় ভিজিয়ে গায়ে রেখেছেন। ইমাম শাবী রোযা অবস্থায় গোসলখানায় প্রবেশ করেছেন। ইব্‌ন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু‎ বলেন: “সওম অবস্থায় রান্নার ডেগ চেখে দেখা ‎বা কোন বস্তুর স্বাদ পরীক্ষা করা দোষের নয়।” হাসান (রাহি.) বলেন: রোযাদারের কুলি ও শীতলতা অর্জন দোষের নয়। ইব্‌ন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু‎ বলেন: “যখন তোমাদের কারো সওমের দিন হয়, সে ‎‎যেন সকালে তেল দেয় ও চিরুনি করে।” আনাস রাদিআল্লাহু আনহু‎ বলেন: “আমার ছোট একটি হাউজ আছে, তাতে আমি ‎‎সওম অবস্থায় ডুব দেই।” [বুখারী: ২/৬৮১, দেখুন: তাগলিকুত তালিক: ৩/১৫১]

শিক্ষা ও মাসায়েল:

‎এক. রোযাদারের জন্য জায়েয আছে গরম বা তৃষ্ণা হালকা করার জন্য পুরো শরীর বা কোন অংশে পানি দেয়া, এটা ওয়াজিব গোসল, অথবা মোস্তাহাব গোসল অথবা বিনা প্রয়োজনে হতে পারে। [আউনুল মাবুদ: ৬/৩৫২]

‎দুই. রোযাদারের জন্য পানিতে ডুবে থাকা বৈধ, তবে সতর্ক থাকবে পেটে যেন পানি প্রবেশ না ‎করে।‎ [মিরকাতুল মাফাতিহ: ৪/৪৪১]

তিন. ইবাদতকারীর কষ্ট হলে বৈধ উপায়ে তা লাঘব করা দোষের নয়, এটাকে অধৈর্য গণ্য করা হবে না, এর থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়।

‎চার. মানুষ দুর্বল ও অপারগ, তার উচিত কষ্ট দূর করার জন্য বৈধ উপায় গ্রহণ করা।

‎পাঁচ. সওম অবস্থায় গোসলখানায় গরম পানি ব্যবহার করা বৈধ, অনুরূপ সুগন্ধি ও তৈল ব্যবহার করা, চিরনি করা বৈধ, ঘ্রাণ জাতীয় বস্তুর কারণে সওম নষ্ট হয় না, এগুলো রোযাদারের জন্য মাকরুহ নয়।

‎ছয়. রোযাদার ঠাণ্ডা ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য হাউজ, ট্যাংকি, পুকুর ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারবে, এ কারণে সওম নষ্ট হবে না।

সাত. প্রয়োজনে বাবুর্চি খানার স্বাদ পরীক্ষা করতে পারবে, তবে তা যেন পেটে প্রবেশ না করে। ইমাম আহমদ রহ. বলেন: “আমার কাছে ‎পছন্দনীয় হলো সওম অবস্থায় খাবারের স্বাদ পরীক্ষা না করা, তবে কেউ তা করলে সমস্যা নেই।” [আল-মুগনি: (৩/১৯)]

‎সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া পরিষদ সওম অবস্থায় খাবারের স্বাদ চেখে দেখা জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছে। [ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা: ফাতাওয়া নং: ৯৮৪৫; শায়খ উসাইমিন “ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম’-এ তিনি অনুরূপ ফাতাওয়া দিয়েছেন, ফাতাওয়া নং: ৪৮৪ ]

১০. সিয়াম ফরযের ধাপসমূহ

বারা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের অভ্যাস ছিল, তাদের সিয়াম শেষে যখন খানা উপস্থিত হত, আর তারা খানা না খেয়ে যদি ঘুমিয়ে যেতেন, তাহলে সে রাত ও পরবর্তী দিনে তারা খেতেন না। কাইস ইব্‌ন সিরমা আল-আনসারি রাদিআল্লাহু আনহু সাওম শেষে খানার সময় স্ত্রীর কাছে এসে বললেন: তোমার নিকট খাবার আছে? উত্তরে স্ত্রী বলল: নেই, তবে আমি তোমার জন্য ব্যবস্থা করছি। সে ছিল দিনের কর্মক্লান্ত, তার দু’চোখে ঘুম এসে গেল। তার স্ত্রী এসে তাকে দেখে বলল: আফসোস আপনি বঞ্চিত হলেন। পরদিন যখন দুপুর হলো, তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিষয়টি অবগত করানো হল। অতঃপর আল্লাহ ‎তা‘আলা নাযিল করলেন:

أُحِلَّ لَكُمۡ لَيۡلَةَ ٱلصِّيَامِ ٱلرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَآئِكُمۡۚ ١٨٧

সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের ‎‎স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। [সূরা বাকারা: ১৮৭]

তারা এ আয়াতের কারণে খুব খুশি হলেন, অতঃপর নাযিল হলো:

وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ 

“আর আহার কর ও পান কর ‎যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা ‎‎থেকে স্পষ্ট হয়।” [সূরা বাকারা: ১৮৭] ও [বুখারী: ১৮১৬, আবু দাউদ: ২৩১৪, তিরমিযী: ২৯৬৮, আহমাদ: ৪/২৯৫]

মুয়ায ইবন জাবাল রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: “সালাতের তিনটি ধাপ অতিক্রম করেছে, অনুরূপ সিয়ামের তিনটি ধাপ অতিক্রম করেছে… তিনি সালাতের তিন ধাপ উল্লেখ করেন। অতঃপর সিয়ামের ব্যাপারে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক মাসের তিন দিন ও আশুরার সওম পালন করতেন। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন:

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ إِلى قَولِه: طَعَامُ مِسۡكِينٖۖ

“‎হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয ‎করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল ‎‎তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা ‎তাকওয়া অবলম্বন কর.. ‎একজন দরিদ্রকে খাবার প্রদান করা।” [সূরা বাকারা: ১৮৩‎]

তখন যার ইচ্ছা সওম পালন করত, যার ইচ্ছা ইফতার করত ও প্রত্যেক দিনের বিনিময়ে একজন মিসকীনকে খাদ্য দিত। এটা তখন হালাল ছিল, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন:

شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ……….  إِلى أَيَّامٍ أُخَرَۗ

“রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা ‎হয়েছে.. অন্যান্য ‎দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে।” [সূরা বাকারা: ১৮৫‎]

‘এরপর থেকে যে রমযান পায়, তার ওপর সওম ওয়াজিব হয়, মুসাফির সফর শেষে কাযা করবে, যারা বৃদ্ধ— সওম পালনে অক্ষম, তাদের ব্যাপারে ফিদিয়া তথা খাদ্যদান বহাল থাকে।’ [আবু দাউদ: ৫০৭, আহমাদ: ৫/২৪৬, তাবরানি ফিল কাবির: ২০/১৩২, হাদীস নং: ২৭০, হাকেম: ২/৩০১, তিনি হাদীসটি সহীহ বলেছেন, আর ইমাম যাহাবী তার সমর্থন করেছেন। দ্বিতীয় বর্ণনা আহমাদ থেকে নেয়া, হাকেম তা সহীহ বলেছেন ও ইমাম যাহাবী তার সমর্থন করেছেন, কিন্তু তাতে দুর্বলতা রয়েছে, তবে তার অন্যন্য শাহেদ হাদীস আছে]

মুসনাদে আহমাদের অপর বর্ণনায় আছে: আর সিয়ামের ধাপ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করে প্রত্যেক মাসে তিন দিন সওম পালন আরম্ভ করেন। ইয়াযিদ ইব্‌ন হারুন বলেন: তিনি নয় মাস তথা রবিউল আউয়াল থেকে রমযান পর্যন্ত প্রত্যেক মাসে তিন দিন ও আশুরার সওম পালন করেন। অতঃপর আল্লাহ তার উপর সিয়ামের ফরয নাযিল করেন:

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ…. هَذِهِ الآيةِ:   وَعَلَى ٱلَّذِينَ يُطِيقُونَهُۥ فِدۡيَةٞ طَعَامُ مِسۡكِينٖۖ

“‎হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয ‎করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল ‎‎তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর… আর ‎যাদের জন্য তা কষ্টকর হবে, তাদের কর্তব্য ফিদিয়া তথা ‎একজন দরিদ্রকে খাবার প্রদান করা।” [সূরা বাকারা: ১৮৩‎]

তিনি বলেন: তখন যার ইচ্ছা সওম পালন করত, যার ইচ্ছা খাদ্য প্রদান করত, খাদ্যদান যথেষ্ট ছিল। তিনি বলেন: অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা অপর আয়াত নাযিল করেন:

شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ إِلى قَوْلِهِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ

“রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা ‎হয়েছে… সুতরাং তোমাদের ‎মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন ‎তাতে সিয়াম পালন করে।” [সূরা বাকারা: ১৮৫‎]

তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা মুকিম ও সুস্থ ব্যক্তির উপর সিয়াম জরুরী করে দেন, অসুস্থ ও মুসাফিরকে তাতে শিথিলতা প্রদান করেন। আর যে সিয়াম পালনে অক্ষম, তার ব্যাপারে খাদ্যদান বহাল থাকে। এ হল দুটি ধাপ।

তিনি বলেন: তারা ঘুমের আগ পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রীগমন করত, যখন তারা ঘুমাইত তা থেকে বিরত থাকত। তিনি বলেন: কায়েস ইবন সিরমাহ নামক জনৈক আনসারি সওম অবস্থায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন, অতঃপর স্ত্রীর নিকট এসে এশার সালাত আদায় করেন। অতঃপর পানাহার না করে ঘুমিয়ে পড়েন, অবশেষে সকালে উঠেন ও সওম রাখেন।

তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখেন যে, সে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে। তিনি বললেন: কি হয়েছে, তোমাকে এতো ক্লান্ত দেখছি কেন? সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমি গতকাল কাজ করেছি, অতঃপর বাড়িতে এসে শুয়ে পড়ি ও ঘুমিয়ে যাই, যখন ভোর করেছি, সওম অবস্থায় ভোর করেছি। তিনি বলেন: উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীগমন করে ছিলেন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলেন: অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন:

أُحِلَّ لَكُمۡ لَيۡلَةَ ٱلصِّيَامِ ٱلرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَآئِكُمۡۚ إِلى قَوْلِه:  ثُمَّ أَتِمُّواْ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيۡلِۚ

“সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের ‎‎স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে… অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর।” [সূরা বাকারা: ১৮৭]

শিক্ষা ও মাসায়েল:

‎এক. ইবাদতের এ সহজ রূপ বান্দার উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, কারণ সিয়াম ফরযের ধাপগুলোতে দেখা যায়: সূর্যাস্তের পর যে ঘুমিয়ে পড়ত অথবা এশা থেকে ফারেগ হত, সে আগামীকালের সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকত, এ জন্য তারা খুব কষ্ট ও ক্লান্তির সম্মুখীন হত, যেমন উপরে এক সাহাবির ঘটনা থেকে জানলাম। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা রমযানের রাতে পানাহার ও স্ত্রীগমন বৈধ করে তাদের ওপর সহজ করলেন, সূর্যাস্তের পর ঘুমিয়ে যাক বা জাগ্রত থাক। এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে রুখসত। সকল প্রশংসা আল্লাহর।

দুই. স্বামীর খেদমত করা একজন ভাল স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য ও একান্ত হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়ার আলামত।‎

‎তিন. এতে সাহাবীদের ধর্মপরায়ণতা, আল্লাহর আদেশের কাছে নতি স্বীকার করা, তাঁর ‎বিরোধিতাকে ভয় করা এবং প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহকে স্মরণ করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। কতক বর্ণনায় এসেছে: “স্ত্রী আসতে দেরী করেন, ফলে সে ঘুমিয়ে যায়। স্ত্রী এসে তাকে জাগ্রত করেন, কিন্তু সে আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানী অপছন্দ করে খানা থেকে বিরত থাকেন ও সওম অবস্থায় সকাল করেন।” [তাবারী: ২/১৬৭]

অপর বর্ণনায় আছে: “তিনি মাথা রেখে তন্দ্রায় যান, তার স্ত্রী খানা নিয়ে এসে বলে: খান, সে বলে: আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম। সে বলল: আপনি ঘুমাননি। অতঃপর সে অভুক্ত অবস্থায় প্রত্যূষ করে।” [তাবারি: ২/১৬৮]

‎চার. আল্লাহর পক্ষ থেকে রুখসত তথা শিথিল বিধান পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করা বৈধ, এটা আযীমতের বিপরীত নয়, কারণ উভয় আল্লাহর পক্ষ থেকে, তিনি যেরূপ রুখসত পছন্দ করেন, অনুরূপ আযীমত পছন্দ করেন।

পাঁচ. আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর রহমত যে, তিনি তাদের জন্য এমন ইবাদত রচনা করেন, যাতে রয়েছে তাদের অন্তর ও আত্মার পরিশুদ্ধতা।

ছয়. আল্লাহ অনভ্যস্ত বিষয়ে বিধান দানে বিভিন্ন ধাপ গ্রহণ করেন, যেমন তিনি সালাত ও সিয়াম তিন ধাপে ফরয করেন। অনুরূপ মদ নিষেধাজ্ঞার বিধান বিভিন্ন ধাপে এসেছে, যেন তারা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়।

সাত. রোযা ক্রমান্বয়ে ফরয হয়েছে, কারণ ইসলামের সূচনাকালে তারা রোযায় অভ্যস্ত ছিল ‎না। যেমন মুয়ায থেকে বর্ণিত হাদীসের দ্বিতীয় বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন: “তারা সিয়ামে অভ্যস্ত ছিল না, তাদের উপর সিয়াম খুব কষ্টকর ছিল।” [আবু দাউদ: ৫০৬, বায়হাকি ফিস সুনান: ৪/২০১, ফাযায়েলুল আওকাত: ৩০, আলবানী সহীহ আবু দাউদে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।] ‎

‎আট. তিন ধাপে সিয়াম ফরয হয়েছে:‎

১. প্রতিমাসে তিন দিন ও আশুরার রোযা।

২. রমযানে রোযা পালন বা খাদ্যদান— সিয়াম পালনে অনিচ্ছুকদের কোন একটি বেছে নেয়ার ইখতিয়ার।

৩. রমযানের রোযা সুস্থ ব্যক্তির ওপর ফরয; রোযার পরিবর্তে খাদ্য দানের বিধান শুধু বৃদ্ধ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য; যে রোযা পালনে সক্ষম নয়, সে রোগী এর অন্তর্ভুক্ত, যার আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা নেই।

[চলবে]

মূল লেখক: ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-হাকিল
তরজমা: সানাউল্লাহ নজির আহমদ

এ জাতীয় আরও খবর