রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮

Beta Version

আরবীয় ডোনাল্ড ট্রাম্প

POYGAM.COM
মে ২৪, ২০১৭
news-image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় সামনে আসা ট্রাম্পের ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী মনোভাবের বিষয়টি মনে রেখে যারা ধরে নিয়েছিলেন, তিনি রিয়াদে উড়ে গিয়ে আমন্ত্রণকারী সৌদি আরবকে অপমান করবেন, তাদের হতাশ হতে হয়েছে।

এ প্রেসিডেন্টই নাইন ইলেভেনের জন্য একসময় সৌদি আরবকে দোষারোপ করলেও তিনি এখন দেশটিকে ‘মহৎ’ ও ‘পবিত্র ভূমি’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। তাকে কিং সালমানের সঙ্গে কৌতুক ও কফি পান করতে বেশ স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে। তাকে সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী নাচ আরদাহতেও শরীর দোলাতে দেখা গেছে।

টিভি ও টুইটারে এসব ছবি দেখে মনে হয়েছে, এটি যেন ঠিক মাইকেল মুরের আজীবন লালিত স্বপ্ন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পও সৌদি রাজার সামনে নতজানু হয়ে একটি পুরস্কার গ্রহণ করায় ডেমোক্র্যাটদের প্যানপ্যানানি বন্ধ হচ্ছে না।

এসব আয়োজন অসাধারণ ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ট্রাম্পের সর্তকতার সঙ্গে দেয়া ভাষণ। ট্রাম্প আমেরিকা ও আরব বিশ্বের সুন্নি একনায়কদের সঙ্গে নতুন জোটের ঘোষণা দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ইরানের শিয়ারা।

ট্রাম্প বুশের মতো ‘স্বাধীনতার’ জয়গান গাননি কিংবা ওবামার মতো ইতিহাসের সঠিক পক্ষে থাকার জন্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেননি, বরং তিনি আমেরিকার আঞ্চলিক সহযোগীদের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা তুলে ধরেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন, সন্ত্রাসকে পরাজিত করা এখন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য।

ট্রাম্প তার ভাষণে এক জায়গায় বলেন, এ যুদ্ধ হচ্ছে ভালো আর মন্দের মধ্যে। এর সঙ্গে ২০০১ সালে দেয়া বুশের বিখ্যাত ভাষণের বেশ মিল পাওয়া যায়। বুশ বলেছিলেন, হয় তুমি আমাদের সঙ্গে আছো, নয় তো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। আরেক জায়গায় ট্রাম্প দাবি করছেন, তার শ্রোতারা সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের বের করে দেবে। বের করে দেয়ার কথাটায় জোর দেয়ার জন্য এটি তিনি বেশ কয়েকবার বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ‘বিদ্বেষপূর্ণ মতাদর্শ’ ও ‘মন্দের পদাতিক  সৈন্যদের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এ প্রবাদগুলো মার্কিন লেখক ডেভিড ফ্রুমের নোটপ্যাডে পাওয়া যেতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্পের ভাষণে বুশের প্রথম দিককার একটি ভাষণের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। যেটা বুশ তার প্রশাসনকে দিয়েছিলেন ইরাকের পুনর্নির্মাণের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার যুক্তি দেখানোর জন্য। এবং ‘ফ্রিডম এজেন্ডা’ তো বুশের দ্বিতীয় মেয়াদের বৈদেশিক নীতির প্রকাশ্য সংগঠন নীতি হয়ে দাঁড়ায়।

ট্রাম্প শুধু ইসলামের মৌলিক, সাম্প্রদায়িক সংস্করণের প্রচারে উপসাগরীয় আরব শাসনের সহায়তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তবে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধে এ শাসকরা যে নতুন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু তিনি ওই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসের জন্য ইরানের নিন্দা বেশ উঁচুস্বরে করেছেন। দেশটি সৌদি আরবের পরম শত্রু।

ট্রাম্প বলেন, ইরান শান্তির একজন অংশীদার না হওয়া পর্যন্ত বিবেকবান সব দেশকে অবশ্যই ইরানকে একঘরে করে রাখার জন্য একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। এটি অস্বীকারের অর্থ হবে সন্ত্রাসের জন্য অর্থায়ন এবং প্রার্থনা করতে হবে সেদিনের জন্য, যেদিন ইরানের জনগণ তাদের যোগ্য ও নীতিনিষ্ঠ সরকার খুঁজে পাবে।

তার ভাষণে চার কোটি ইরানির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার কোনো প্রচেষ্টা ছিল না, যারা এই তো সেদিন ভোট দিয়ে হাসান রুহানিকে নির্বাচিত করেছে। সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও বিশ্বে ইরানকে আরো উন্মুক্ত করা হবে— এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন এ কর্মতত্পর প্রেসিডেন্ট।

মিসরের আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসির মতো সুন্নি রাজতান্ত্রিক ও সামরিক একনায়কতন্ত্র নিয়ে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে এদের ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন। ট্রাম্প বলেন, আমাদের জোট মৌলিক ঐক্য নাশ করে নয়, বরং স্থিতিশীলতার মাধ্যমে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে। এবং যখনই সম্ভব হবে আকস্মিক হস্তক্ষেপের বদলে ক্রমান্বয়ে সংস্কার করার সুযোগ খুঁজব।

ওবামার শাসনামলে ঠিক একই ধরনের সুর শুনেছেন সুন্নি শাসকরা। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরানের সমালোচনা করত, যখন নিজ জনগণের দাবি শোনার জন্য আরব নেতাদের ওপর চাপ দিত।

ট্রাম্প যেসব কথা বলেছেন, তার পূর্বসূরিরা প্রায় একই ধরনের কথা বলে গেছেন। কিন্তু যে বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল তা হলো, কেন ট্রাম্প ভাবছেন যে, সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটছে এবং তিনি এটি মোকাবেলা করার জন্য কী পরিকল্পনা করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাসবাদ কেন বাড়ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা তিনি দেননি। তার কাছে এ নিয়ে কোনো তত্ত্ব নেই এবং এজন্য বাড়তে থাকা সন্ত্রাসবাদ রুখতে কী করা যেতে পারে, তা নিয়ে তিনি কোনো পরামর্শ দিতে পারেননি।

বুশ মনে করতেন, স্বাধীনতার অভাব ও মানবাধিকারের ঘাটতি আরব বিশ্বে চরম বিদ্বেষ তৈরি করেছে, যা প্রকাশ পেয়েছে ধর্মীয় চরম পন্থা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে। ওবামাও এমনটা মনে করতেন। কিন্তু বুশ যেখানে ইসলামিক মতাদর্শকে পরাজিত করার কথা বলতেন, সেখানে ওবামা নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী দলগুলোকে দমন করার কথা বলতেন।

তবে ট্রাম্প বলছেন, এর কোনোটাই এখন আর কাজে লাগবে না বা খুব কমই কাজে লাগবে। তিনি নতুন অভিজ্ঞতা ও বিচারের আলোকে নতুন পদ্ধতি নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সেই সঙ্গে তিনি এও জানিয়ে দিয়েছেন, সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ দেবে না বা ঝামেলা নেবে না। যদিও একসময় তিনি দম্ভভরে বলতেন, সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা কোনো ব্যাপার না। ট্রাম্প বলছেন, আমেরিকান শক্তি এসে তাদের শত্রুদের ধ্বংস করবে— এমন প্রত্যাশায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বসে থাকতে পারে না। নিজেদের জন্য, দেশের জন্য ও সন্তানদের জন্য তারা কেমন ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করবে— তা তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সংক্ষেপে ট্রাম্প যেটা বলতে চাইছেন তা হলো, আদর্শবাদের ভণ্ডামি ছাড়াই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সৌদি আরবের মতো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে একটি শক্তিশালী ভণ্ডামির গন্ধ রয়েছে। এজন্যই বোধহয় ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমরা এখানে লেকচার দিতে আসিনি’, তখন তাতে অকপটতার ছোঁয়া পাওয়া যায়।

আরব সমাজকে যুক্তরাষ্ট্র বদলে দেবে— এমন আশা করা হবে ভুল, যখন এর একটি দেশ ১১০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র কেনে। ভাষণে এসব কথা বলা হয় বিদেশীদের জন্য নয়, বরং আমাদের কান ভরানোর জন্য। কারণ বিদেশী শ্রোতারা জানে আসলটা কী। উভয় দলের প্রেসিডেন্ট সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন।

ওবামার সাবেক স্পিচরাইটার বেন রোডস এক টুইটার বার্তায় অভিযোগ করেছেন, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে ইরানের মানবাধিকার নিয়ে সমালোচনা করে সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন বোকামির পরিচয় দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সৌদি আরবের রেকর্ড ঢের বেশি খারাপ। তিনি লিখেছেন, ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমরা যখন মানবাধিকারের ইস্যু টেনে আনি, তখন সত্যিকারভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ টুইটারের নিচে একজন লিখেছেন, তিন লাখ সিরীয় কমেন্ট করার জন্য অনুপস্থিত রয়েছে।

লেখক: ব্লেক হানশেল, এডিটর ইন চিফ, পলিটিকো ম্যাগাজিন

এ জাতীয় আরও খবর