সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)

POYGAM.COM
মে ৬, ২০১৭
news-image

নাম আবদুল্লাহ, সিদ্দীক ও আতিক উপাধি। ডাকনাম বা কুনিয়াত আবুবকর। পিতার নাম উসমান, কুনিয়াত আবু কুহাফা। মাতার নাম নাস সালমা, তাঁর কুনিয়াত উম্মুল খায়ের। কুরাইশ বংশের উপর দিকে ষষ্ঠ পুরুষ ‘মুররাতা’য় গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের দু’বছরের কিছু বেশি সময় পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং অনুরূপ সময়ের ব্যবধানে তাঁরা উভয়ে ইন্তেকাল করেন। তাই মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়সের সমান।

তিনি ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, পাতলা ছিপছিপে ও প্রশস্ত ললাট বিশিষ্ট। শেষ বয়সে চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মেহেদীর খিজাব লাগাতেন। অত্যন্ত দয়ালু ও সহনশীল ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্মানিত কুরাইশদের মধ্যে অন্যতম একজন। জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সচ্চরিত্রতার জন্য সর্বসাধারণ মক্কাবাসীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

জাহেলী যুগে মক্কাবাসীদের ‘দিয়াত’ বা রক্তের ক্ষতিপূরণের সমুদয় অর্থ তাঁর কাছে জমা হতো। আরববাসীর নসব বা বংশ সংক্রান্ত জ্ঞানে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ। কাব্য প্রতিভাও ছিল। অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল-ভাষী ছিলেন। বক্তৃতা ও বাগ্মিতায় আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর গোত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও অমায়িক ব্যক্তি।

তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, দানশীল ও চরিত্রবান। জাহেলী যুগেও কখনো শরাব পান করেননি। তাঁর অমায়িক মেলামেশা, পাণ্ডিত্য ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে অনেকেই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্য স্থাপন করতো। তাঁর বাড়িতে প্রতিদিনই মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়মিত বেঠক বসতো।

হযরত আবু বকরের পিতা আবু কুহাফা কুরাইশদের মধ্যে যথেষ্ট মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ ও সচ্ছল। তাঁর গৃহ কবেল ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যই প্রসিদ্ধ ছিল না, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর মতামত অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হতো। মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলামের প্রতি তিনি আকৃষ্ট না হলেও পুত্র আবু বকরকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন— এমন কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অবশ্য হযরত আলীকে (রা.) তিনি দেখলে মাঝে মাঝে বলতেন ‘এই ছোকড়াই আমার ছেলেটার মাথা বিগড়ে দিয়েছে’। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলামের ঘোষণা দেন আবু কুহাফা। হিজরী ১৪ সনে একশ’ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

আবু বকরের মা উম্মুল খায়ের স্বামীর বহু পূর্বে মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার ‘দারুল আরকামে’ ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। স্বামীর মত তিনিও দীর্ঘজীবন লাভ করেন। প্রায় ৯০ বছর বয়সে পুত্রকে খেলাফতের পদে অধিষ্ঠিত রেখে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আবু বকর ছিলেন পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। অত্যন্ত আদর যত্ন ও বিলাসিতার মাঝে পালিত হন তিনি। শৈশব থেকে যৌবনের সূচনা পর্যন্ত পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিশ বছর বয়সে পিতার ব্যবসা বাণিজ্যের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। শৈশব থেকে আবু বকরের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বন্ধুত্ব ছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অধিকাংশ বাণিজ্য সফরের সফর সঙ্গী ছিলেন।

একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়স প্রায় আঠার আর মুহাম্মাদ (সা.)-এর বয়স বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে; বিশ্রামের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি গাছের নীচে বসেন। আবু বকর একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। এক খ্রিস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথা-বার্তা হয়। আলাপের মাঝখানে পাদ্রী জিজ্ঞেস করেন, ওখানে গাছের নীচে কে? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদিল্লাহ।

পাদ্রী বলে উঠল, এ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেঁথে যায়। তখন থেকেই তার অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবী হওয়া সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় হতে থাকে। ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’ বলে উল্লেখ হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুওয়ত লাভের ঘোষণায় মক্কায় হৈ চৈ পড়ে গেল। মক্কার প্রভাবশালী ধনী নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। কেউবা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ‘মাথা খারাপ’, কেউবা ‘জিনে ধরা’ ইত্যাদি বলতে থাকে। নেতৃবৃন্দের ইঙ্গিতে ও তাদের দেখা-দেখি সাধারণ লোকেরাও ইসলাম থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। কুরাইশদের ধনবান ও সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আবু বকর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গ দেন, তাঁকে সাহস দেন এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর নবুওয়তের প্রতি ঈমান আনেন।

এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি।’

এভাবে আবু বকর হলেন বয়স্ক আজাদ লোকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান। মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মক্কার আশপাশের গোত্রসমূহে ইসলামের দাওয়াত দিতন। হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন তাঁবুতে গিয়ে লোকদের দাওয়াত দিতেন। বহিরাগত লোকদের কাছে ইসলামের ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিচয় তুলে ধরতেন। এভাবে আরববাসী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রচারিত দ্বীন সম্পর্কে অবহিত হয়ে তাঁর উপর ঈমান আনে। তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও চেষ্টায় তৎকালীন কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক উসমান, যুবায়ের, আবদুর রহমান, সা‘দ ও তালহার মত ব্যক্তিরাসহ আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন নবুওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন, আবু বকরের নিকট তখন চল্লিশ হাজার দিরহাম। ইসলামের জন্য তিনি তাঁর সকল সম্পদ ওয়াকফ করে দেন। কুরাইশদের যেসব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হচ্ছিল, এ অর্থ দ্বারা তিনি সেইসব দাস-দাসী খরিদ করে আজাদ (মুক্ত) করেন। তেরো বছর পর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন তাঁর কাছে এ অর্থের মাত্র আড়াই হাজার দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। অল্পদিনের মধ্যে অবশিষ্ট দিরহামগুলিও ইসলামের জন্য ব্যয়িত হয়। বিলাল, খাব্বাব, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব, আবু ফুকাইহ প্রমুখ দাস-দাসী তাঁরই অর্থের বিনিময়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন।

তাই পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ (সা বলেছেন, আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি। কিন্তু আবু বকরের ইহসানসমূহ এমন যে, পরিশোধ করতে আমি অক্ষম। তাঁর প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। তাঁর অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্য কারো অর্থ তেমন আসেনি।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মুখে মি‘রাজের কথা শুনে অনেকেই যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দোল খাচ্ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। হযরত হাসান (রা.) বলেন, মি‘রাজের কথা শুনে বহু সংখ্যক মুসলিম ইসলাম ত্যাগ করে।

লোকে আবু বকরের কাছে গিয়ে বলে: আবু বকর, তোমার বন্ধুকে তুমি বিশ্বাস কর? সে বলেছে, সে নাকি গতরাতে বাইতুল মাকদাসে গিয়েছে, সেখানে সে নামায পড়েছে, অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে।

আবু বকর বললেন, তোমরা কি তাঁকে বিশ্বাস কর? তারা বলল: হ্যাঁ, ওইতো মসজিদে বসে লোকজনকে এ কথাই বলেছে। আবু বকর বললেন, আল্লাহর কসম, তিনি যদি এ কথা বলেই থাকেন তাহলে সত্য কথাই বলেছেন। এতে অবাক হাওয়ার কী দেখলে? তিনি তো আমাকে বলে থাকেন, তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওহী আসে। আকাশ থেকে ওহী আসে মাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে। তাঁর সে কথাও আমি বিশ্বাস করি। তোমরা যে ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছো এটা তাঁর চেয়েও বিস্ময়কর।

তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী, আপনি কি জনগণকে বলেছেন যে, আপনি গতরাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমণ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবু বকর বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেল: হে আবু বকর, তুমি সিদ্দিক। এভাবে আবু বকর ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত হন।

মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অভ্যাস ছিল সকাল সন্ধ্যায় আবু বকরের বাড়িতে গমন করা। কোন বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হলে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করা। রাসূল (সা.) দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্যে কোথাও গেলে তিনিও সাধারণত সঙ্গে থাকতেন। মুসলিমদের ওপর মুশরিকদের অত্যাচার চরম আকারে ধারণ করলে একবার তিনি হাবশায় হিজরাত করার ইচ্ছা করেছিলেন কিন্তু ‘ইবনুদ দাগনাহ’ নামক গোত্রপতি তাঁকে এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে। সে কুরাইশদের হাত থেকে এ শর্তে নিরাপত্তা দেয় যে, আবু বকর প্রকাশ্য সালাত আদায় করবেন না।

কিন্তু দীর্ঘদিন এ শর্ত পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ইবনুদ দাগনাহর নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেন এবং অন্যান্য মুসলমান ভাইদের যে অবস্থা হয় সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরাতের সেই কঠিন মুহূর্তে আবু বকরের কুরবানী, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য্য ও বন্ধুত্বের কথা ইতিহাসে চিরদির অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর সাহচর্য্যের কথা তো পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক বলেন, ‘আবু বকর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলতেন, তুমি তাড়াহুড়া করো না। আল্লাহ হয়তো তোমাকে একজন সহযাত্রী জুটিয়ে দেবেন। আবু বকর একথা শুনে ভাবতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) হয়তো নিজের একথাই বলেছেন। তাই তিনি তখন থেকেই দুটো উট কিনে অত্যন্ত যত্ন সহকারে পুষতে থাকতেন। এই আশায় যে, হিজরাতের সময় হয়তো কাজে লাগতে পারে।

উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) দিনে অন্তত একবার আবু বকরের বাড়িতে আসতেন। যেদিন হিজরতের অনুমতি পেলেন সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে আসলেন, এমন সময় কখনো তিনি আসতেন না। তাঁকে দেখামাত্র আবু বকর বলে উঠলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। তা না হলে এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) আসতেন না।

তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলে আবু বকর খাটের এক ধারে সরে বসলেন। আবু বকরের বাড়ীতে তখন আমি ও আমার বোন আসমা ছাড়া আর কেউ ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেনঃ তোমার এখানে অন্য যারা আছে, তাদেরকে আমার কাছ হতে দূরে সরিয়ে দাও। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। আপনার কী হয়েছে?

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহ আমাকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, আমিও কি সঙ্গে যেতে পারব? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ যেতে পারবে। আয়েশা বলেন: সেদিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যেও এত কাঁদতে পারে। আমি আবু বকরকে সেদিন কাঁদতে দেখেছি।

অতঃপর আবু বকর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই দেখুন, আমি এই উট দুটো এ কাজের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি। তাঁরা আবদুল্লাহ ইবন উরায়তকে পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য ভাড়া করে সাথে নিলেন। সে ছিল মুশরিক, তবে বিশ্বাসভাজন। রাতের আঁধারে তাঁরা আবু বকরের বাড়ির পিছন দরজা দিয়ে বের হলেন এবং নিম্নভূমিতে গিয়ে ‘সাওর’ পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন।

হাসান বসরী (রাহ.) ইবন হিশাম হতে বর্ণনা করেন, তাঁরা রাতে ‘সাওর’ পর্বতের গুহায় পৌঁছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রবেশের আগে আবু বকর (রা.) গুহায় প্রবেশ করলেন। সেখানে কোন হিংস্র প্রাণী বা সাপ-বিচ্ছু আছে কিনা তা দেখে নিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিপদমুক্ত রাখার উদ্দশ্যেই তিনি এরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

মক্কায় উম্মুল মোমেনীন হযরত খাদিজার মুত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে যখন আবু বকর (রা.) বিমর্ষ দেখলেন, অত্যন্ত আদব ও নিষ্ঠার সাথে নিজের অল্পবয়স্কা কন্যা আয়েশাকে (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে বিয়ে দেন। মোহরের অর্থও নিজেই পরিশোধ করেন।

হিজরতের পর সকল অভিযানেই তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন, কোন একটি অভিযানেও অংশগ্রহণ হতে বঞ্চিত হননি। তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী। এ অভিযানের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আহবানে সাড়া দিয়ে বাড়িতে যা কিছু অর্থ-সম্পদ ছিল সবই তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে তুলে দেন। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর ছেলে-মেয়েদের জন্য বাড়িতে কিছু রেখেছো কি? জবাবে আবু বকর বললেন, তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই যথেষ্ট।

মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরীতে প্রথম ইসলামি হজ্জ আদায় উপলক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরকে (রা.) ‘আমিরুল হাজ্জ’ নিয়োগ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তিম রোগশয্যায় তাঁরই নির্দেশে মসজিদে নববীর ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন।

মোটকথা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় আবু বকর তাঁর উজির ও উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

‘খলিফাতু রাসূলিল্লাহ’— এ উপাধিটি কেবল তাঁকেই দেয়া হয়। পরবর্তী খলিফাদের ‘আমিরুল মোমেনীন’ উপাধি দেয়া হয়েছে।

ব্যবসা ছিল তাঁর পেশা। ইসলাম-পূর্ব যুগে কুরাইশদের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পরেও জীবিকার তাগিদে এ পেশা চালিয়ে যেতে থাকেন। তবে খলিফা হবার পর খিলাফতের গুরু দায়িত্ব কাঁধে নেয়ায় ব্যবসার পাট চুকাতে বাধ্য হন। হযরত উমর ও আবু উবাইদার পীড়াপিড়িতে মজলিশে শূরার সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রয়োজন অনুপাতে বাইতুলমাল হতে ন্যূনতম ভাতা গ্রহণে স্বীকৃত হন। যার পরিমাণ ছিল বাৎসরিক আড়াই হাজার দিরহাম। তবে মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে বাইতুলমাল হতে গৃহীত সমুদয় অর্থ ফেরত দানের নির্দেশ দিয়ে যান।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের সংবাদে সাহাবাগণ যখন সর্ম্পূর্ণ হতভম্ব, তাঁরা যখন চিন্তাই করতে পারছিলেন না, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত হতে পারে— এমনকি হযরত ‘উমর (রা.) কোষমুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে ঘোষণা করে বসেন— ‘যে বলবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যু হয়েছে তাঁকে হত্যা করবো।’ এমনই এক ভাব-বিহ্বল পরিবেশেও আবু বকর (রা.) ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল। সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে তিনি ঘোষণা করেন, ‘যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদত কর তারা জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব— তাঁর মৃত্যু নেই।’

তারপর এ আয়াত পাঠ করেন: ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছে। তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তাহলে তোমরা কি পেছনে ফিরে যাবে? যারা পেছনে ফিরে যাবে তারা আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শিগগিরই আল্লাহ তাদের প্রতিদান দেবেন।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৪৪)

আবু বকরের মুখে এ আয়াত শুনার সাথে সাথে লোকেরা যেন সম্বিত ফিরে পেল। তাদের কাছে মনে হলো, এ আয়াত যেন তারা এই প্রথম শুনছে। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইনতিকালের সাথে সাথে প্রথম যে মারাত্মক সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের (রা.) দৃঢ় হস্তক্ষেপে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাফন-দাফন তখনো সম্পন্ন হতে পারেনি। এরই মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্তির বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করলো। মদীনায় জনগণ, বিশেষগত আনসাররা ‘সাকীফা বনু সায়েদা’ নামক স্থানে সমবেত হলো। আনসাররা দাবি করলো, যেহেতু আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আশ্রয় দিয়েছি, নিজেদের জান-মালের বিনিময়ে দুর্বল ইসলামকে সবল ও শক্তিশালী করেছি, আমাদের মধ্য থেকে কাউকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত করতে হবে।

মুজাহিরদের কাছে এ দাবি গ্রহণযোগ্য হলো না। তারা বললো, ‌ইসলামের বীজ আমরা বপন করেছি এবং আমরাই তাতে পানি সিঞ্চন করেছি। সুতারাং আমরাই খিলাফতের অধিকতর হকদার। পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নিল। আবু বকরকে (রা.) ডাকা হলো। তিনি তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মরদেহের নিকট। তিনি তখন উপস্থিত হয়ে ধীর-স্থিরভাবে কথা বললেন। তাঁর যুক্তি ও প্রমাণের কাছে আনসাররা নতি স্বীকার করলো।

এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইনতিকালের পর দ্বিতীয় যে সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের (রা.) বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় তারও সুন্দর সমাধান হয়ে যায়। আবু বকর খলীফা নির্বাচিত হলেন।

খলীফা হওয়ার পর সমবেত মুহাজির ও আনসারদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, ‘আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে খলীফা বানানো হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি চাচ্ছিলাম, আপনাদের মধ্য থেকে অন্য কেউ এ দ্বায়িত্ব গ্রহণ করুক। আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনারা যদি চান আমার আচরণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণের মতো হোক, তাহলে আমাকে সেই পর্যায়ে পোঁছার ব্যাপারে অক্ষম মনে করবেন। তিনি ছিলেন নবী। ভুলত্রুটি থেকে ছিলেন পবিত্র। তাঁর মতো আমার কোন বিশেষ মর্যদা নেই। আমি একজন সাধারণ মানুষ। আপনাদের কোন একজন সাধারণ ব্যক্তি থেকেও উত্তম হওয়ার দাবি আমি করতে পারি না।… আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি, আমার সহায়তা করবেন। যদি দেখেন আমি বিপদগামী হচ্ছি, আমাকে সর্তক করে দেবেন।

তাঁর সেই নীতি নির্ধারক সংক্ষিপ্ত প্রথম ভাষণটি চিরকাল বিশ্বের সকল রাষ্ট্র নায়কদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর চরিত্রের সীমাহীন দৃঢ়তার আর এক প্রকাশ ঘটে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইনতিকালের অব্যবহিত পরে উসামা ইবনে যায়িদের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠানোর মাধ্যমে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে মুতা অভিযানে শাহাদাতপ্রাপ্ত যায়িদ ইবনে হারিসা, জাফর ইবনে আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার (রা.) রক্তের বদলা নেয়ার জন্য একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। এ বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করেন নওজোয়ান উসামা ইবন যায়িদকে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে উসামা তাঁর বাহিনীসহ সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁরা মদীনা থেকে বের হতেই রাসূলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁরা মদীনার উপকন্ঠে শিবির স্থাপন করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রোগমুক্তির প্রতীক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু এ রোগেই রাসূল (সা.) ইনতিকাল করেন।

আবু বকর (রা.) খলীফা হলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের সংবাদে আবর উপদ্বীপের বিভিন্ন দিকে নানা অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। কেউবা ইসলাম ত্যাগ করে, কেউবা যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, কেউ বা নুবওয়াত দাবি করে বসে। এমনি এক চরম অবস্থায় অনেকে পরামর্শ দিলেন উসামার বাহিনী পাঠানোর ব্যাপারটি স্থগিত রাখতে। কিন্ত আবু বকর অত্যন্ত কঠোরভাবে এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। তিনি যদি এ বাহিনী পাঠাতে ইতস্ততঃ করতেন বা কালবিলম্ব করতেন তাহলে খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পর এটা হতো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশের প্রথম বিরুদ্ধাচরণ। কারণ অন্তিম রোগশয্যায় তিনি উসামা বাহিনীকে যাত্রার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবু বকর উসামার বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

তখন আনসারদের একটি দল দাবি করলেন— তাহলে অন্তত উসামাকে কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য কোন বয়স্ক সাহাবীকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করা হউক। উল্লেখ্য যে, তখন উসামার বয়স মাত্র বিশ বছর। সকলের পক্ষ হতে প্রস্তাবটি হযরত উমার উপস্থাপন করলেন। প্রস্তাব শুনে আবু বকর রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি উমারের দাড়ি মুট করে ধরে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকে নিয়োগ করেছেন, আবু বকর তাকে অপসারণ করবে? এভাবে এ প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখান করেন।

হযরত উমারও ছিলেন উসামার এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত একজন সৈনিক। অথচ নতুন খলিফার জন্য তখন তাঁর মদীনায় থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। খলিফা ইচ্ছে করলে তাঁকে নিজেই মদীনায় থেকে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি উসামার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ না করে তাঁর কাছে আবেদন জানালেন উমারকে মদীনায় রেখে যাওয়ার জন্য। উসামা খলিফার আবেদন মঞ্জুর করলেন। কারণ আবু বকর (রা) বুঝেছিলেন, উসামার নিয়োগকর্তা খোদ রাসূলুল্লাহ (সা.)। সুতরাং এক্ষেত্রে উসামার ক্ষমতা তাঁর ক্ষমতার উপরে। এভাবে আবু বকর (রা.)রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ যথাযথ বাস্তবায়ন করেন এবং তাঁর সামান্যতম বিরুদ্ধাচারণ থেকেও বিরত থাকেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর আবাস ও জুবইয়ান গোত্রদ্বয় যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বিষয়টি নিয়ে খলিফার দরবারে পরামর্শ হয়। সাহাবীদের অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান না চালানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) অটল। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে উটের যে বাচ্চাটি যাকাত পাঠানো হতো এখন যদি তা কেউ দিতে অস্বীকৃতি করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। কিছু লোক নবুওয়তের মিথ্যা দাবিদার ছিল। আবু বকর (রা.) অসীম সাহস ও দৃঢ়তা সহকারে এসব ভণ্ড নবীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ইসলামের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। ইতিহাসবিদরা এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তার পর আবু বকরের এ দৃঢ়তা যদি না হতো, মুসলিম জাতির ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লিখা হতো।

এমনটি সম্ভব হয়েছে এই জন্য যে, হযরত আবু বকরের (রা) স্বভাবের দুটি পরস্পরবিরোধী গুণের সমাবেশ ঘটেছিল, সীমাহীন দৃঢ়তা ও কোমলতা। এ কারণে তাঁর চরিত্রে সর্বদা একটা ভারসাম্য বিরাজমান ছিল। কোন ব্যক্তির স্বভাবে যদি এ দুটি গুণের কেবল একটি বর্তমান থাকে এবং অন্যটি থাকে অনুপস্থিত, তখন তাঁর চরিত্রের ভারসাম্য বিনষ্ট হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে এ দুটি গুণ তাঁর চরিত্রে সমানভাবে বিদ্যমান ছিল।

হযরত আবু বকর যদিও মুসলমানদের নেতা ও খলিফা ছিলেন, তবুও তাঁর জীবন ছিল অনাড়ম্বর। খলিফা হওয়া সত্ত্বেও মদীনার অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে জনগণের অবস্থা জানতেন এবং তাদের ব্যক্তিগত কাজও সময় সময় নিজ হাতে করে দিতেন। হযরত উমার (রা.) বলেন, আমি প্রতিদিন সকালে এক বৃদ্ধার বাড়িতে তার ঘরের কাজ করে দিতাম। প্রতিদিনের মত একদিন তার বাড়িতে উপস্থিত হলে বৃদ্ধা বললেন, আজ কোন কাজ নেই। এক নেককার ব্যক্তি তোমার আগেই কাজগুলো শেষ করে গেছে। হযরত উমার পরে জানতে পারেন সেই নেককার ব্যক্তিটি হযরত আবু বকর (রা.)। খলিফা হওয়া সত্ত্বেও এভাবে এক অনাথ বৃদ্ধার কাজ করে দিয়ে যেতেন।

হযরত আবু বকর মাত্র আড়াই বছরের মত খেলাফত পরিচালনা করেন। তবে তাঁর এ সময়টুকু ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা। আরবের বিদ্রোহসমূহ নির্মূল করা। রাষ্ট্র ও সরকারকে তিনি এত মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন যে, মুসলমানরা ইরান ও রোমের মত দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সাহসী হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের বহু অঞ্চল দখল করে নেয়।

হযরত আবু বকরের আরেকটি অবদান পবিত্র কুরআনের সংকলন ও সংরক্ষণের পদক্ষেপ। তাঁর খিলাফতকালের প্রথম অধ্যায়ে আরবের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সেইসব বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে কয়েকশ’ হাফেজে কুরআন শাহাদাত বরণ করেন। শুধুমাত্র মুসায়লামা কাজ্জাবের সাথে যে যুদ্ধ হয় তাতেই সাতশ’ হাফেজ শহীদ হন। অতঃপর হযরত উমারের পরামর্শে হযরত আবু বকর (রা.) সম্পূর্ণ কুরআন একস্থানে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন এবং কপিটি নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন। ইতিহাসে কুরআনের এই আদি কপিটি ‘মাসহাফে সিদ্দিকী’ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে হযরত উসমানের যুগে কুরআনের যে কপিগুলো করা হয় তা ‘মাসহাফে সিদ্দিকী’র অনুলিপি মাত্র।

হযরত আবু বকর রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আল্লামা জাহাবী ‘তাজকিরাতুল হুফফাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। অত্যধিক সতর্কতার কারণে তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় অনেক কম। উমার, উসমান, আবদুর রহমান ইবন আউফ, ইবন মাসউদ, ইবন উমার, ইবন ‘আমর, ইবন আব্বাস, হুজাইফা, যায়িদ ইবন সাবিত, উকবা, মা‘কাল, আনাস, আবু হুরাইরা, আবু উমামা, আবু বারাযা, আবু মূসা, তাঁর দু’কন্যা আয়েশা ও আসমা প্রমুখ সাহাবী তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। বিশিষ্ট তাবিয়ীরাও তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

১৩ হিজরীর ৭ই জমাদিউস সানী হযরত আবু বকর (রা.) জ্বরে আক্রান্ত হন। ১৫ দিন রোগাক্রান্ত থাকার পর হিজরী ১৩ সনের ২১শে জমাদিউস সানী মোতাবেক ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ইন্তেকাল করেন। হযরত আয়েশার (রা.) হুজরায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশের একটু পুবদিকে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি দুই বছর তিন মাস দশদিন খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।

সূত্র: অধ্যাপক আবদুল মাবুদ কৃত ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা’