সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Beta Version

ভাষাশহীদ রফিকের বাড়িতে একদিন

POYGAM.COM
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৭
news-image

উত্তর-পূর্বে ধলেশ্বরী, দক্ষিণ-পশ্চিমে কালীগঙ্গা— এরই মাঝে সবুজ-শ্যামল দ্বীপের মতো জনপদ সিংগাইর। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় বলধারা ইউনিয়নের পারিল গ্রামেই জন্ম হয় ভাষাশহীদ রফিকের। পারিল গ্রামটি খুব সুন্দর সবুজ ফসলী একটি গ্রাম, যে গ্রামে সারা বৎসর ধান, পাট ও সবজির আবাদ হয়।

রফিকউদ্দিনের পিতার নাম আবদুল লতিফ ও মাতার নাম রাফিজা খাতুন। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী, তিনি কলকাতায় ব্যবসা করতেন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রফিক ছিলেন পিতা-মাতার প্রথম সন্তান। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রফিকউদ্দিনের পিতা ঢাকায় চলে আসেন। বাবুবাজারে আকমল খাঁ রোডে ‘পারিল প্রিন্টিং প্রেস’ নামে তাঁর পিতা একটি ছাপাখানা চালু করেন।

শহীদ রফিক তার বাড়ী থেকে ৭ মাইল দূরে অবস্থিত বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশ পাশ করেন। এরপর রফিকউদ্দিন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। বাবার প্রিন্টিং ব্যবসা দেখাশুনার জন্য পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫২ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। এ সময়ে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ছাত্র-জনতা। সেই বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন শহীদ রফিক। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণও ছিল মিছিলের পদভারে প্রকম্পিত। উত্তাল ছিল পুরো রাজপথ। এসময় র্নিবিচারে ছাত্র-জনতার উপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। একটি গুলি রফিকউদ্দিনের মাথায় বিদ্ধ হয়ে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে় ঘটনাস্থলেই শহীদ হন রফিক। পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে আরো কয়েকজন শহীদ ও ভাষাসৈনিকের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ।

মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ছয়-সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় ঢাকার আজিমপুর গোরস্থানে শহীদ রফিকের লাশ দাফন করা হয়। কিন্তু তাঁর কবরের কোন চিহ্ন রাখা হয়নি। ফলে আজিমপুর কবরস্থানে হাজারো কবরের মাঝে ভাষা শহীদ রফিকের কবরটি অচিহ্নিতই থেকে গেছে।

এই মহান শহীদের নামে মানিকগঞ্জের প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয় শহীদ রফিক সড়ক এবং মানিকগঞ্জ-হেমায়েতপুর ভায়া সিংগাইর সড়কে বংশী নদীর উপর ধল্লায় নির্মিত সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে শহীদ রফিক উদ্দিন সেতু। এছাড়া এই ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পারিল গ্রামের নামকরণ করা হয় রফিকনগর। তাঁর নিজ গ্রামে, এই স্থানটিতেই ২০০৮ সালে ৪২ শতাংশ জমির উপর ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদ নির্মাণ করে একটি পাঠাগার ও জাদুঘর। ২০০৯ সালে এই পাঠাগার উদ্বোধন করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্মৃতি জাদুঘর ও শহীদ রফিকের বাড়িতে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক দর্শনার্থী আসেন। এ ছাড়া আশপাশের কয়েকটি গ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণেরা এখানে নিয়মিত বই ও পত্রিকা পড়তে আসেন। স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলে আমরা জানতে পারলাম, শহীদ রফিকসহ অন্যান্য ভাষা শহীদদের সম্পর্কে জানতে তারা বেশ আগ্রহী। এখানে এসে বিভিন্ন বই-পুস্তক অধ্যয়নের মাধ্যমে তারা তাদের জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে।

এই যাদুঘর থেকে প্রায় ২৫০ গজ দূরেই ৩৭ শতাংশ জমির ওপর ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিনের পৈতৃক ভিটা।

মাতৃভাষা রক্ষায় তার এই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে ২০১৬ সালে তাঁর নিজ বাড়ির আঙিনায় বৃহৎ পরিসরে নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হয়।

শহীদ রফিকের ছোটভাই মরহুম আবদুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম বাস করছেন এখানে। বাড়ির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে রফিকের ছোট ভাইয়ের ছেলে শাহজালাল ওরফে বাবু, তার স্ত্রী ও গোলেনূর বেগম আজো এখানেই রয়ে গেছেন। রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম মানিকগঞ্জ সদরে সরকারি বরাদ্দকৃত বাড়িতে থাকেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা থাকেন ঢাকায়।

শহীদ রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে তার বর্তমান বাড়িটি তৈরি করে দিয়েছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকা। এখানেই ছিল পুরনো সেই পাঠাগারটি। নতুন পাঠাগার ভবন নির্মাণের পর সকল বই পুস্তক সেখানে স্থানান্তর করা হয়।

রফিকউদ্দিন ও অন্যান্য ভাষা শহীদ— সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরের মহান আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাভাষা ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এমন অনেক আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের ফসল আমাদের এই মাতৃভাষা বাংলা। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষাসৈনিক রফিক উদ্দিন আহমদকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

আমাদের সব ভালবাসা আর উচ্ছ্বাস যেন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব না হয়। আসুন, বাংলাকে ধারণ করি আমাদের মনে, প্রাণে এবং চেতনায়; আমাদের হৃদয়ের গভীরে। আর আমাদের মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করি যথাযথ সম্মানের স্থানে। তবেই ভাষা শহীদদের আত্মদানের প্রতি প্রদর্শন করা হবে প্রকৃত সম্মান।

গ্রন্থনা : শাফায়াত তৌসিফ